দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে বিশ্বজয়: রোনালদোর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনার শেষ বাঁশি বাজতেই সম্প্রচারকারীদের ক্যামেরা খুঁজে নিল তাকে। কোচিং স্টাফের একজন সদস্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন তিনি। এই কান্নার দৃশ্য বিশ্ব ফুটবলের খুব চেনা। ঠিক চার বছর আগে প্যারিসের স্তাদ দে ফ্রান্সেও একইভাবে কেঁদেছিলেন তিনি। তবে সেই কান্নায় ছিল রাজ্যের হতাশা, এক বুক হাহাকার আর স্বপ্নভঙ্গের তীব্র বেদনা। কিন্তু ইয়োকোহামা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ২০০২ সালের ৩০ জুনের এই অশ্রু একেবারেই ভিন্ন। এই কান্না আনন্দের, এই কান্না অসীম স্বস্তির, এই কান্না ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার ভীতিকে পাল্টা চোখ রাঙিয়ে বিশ্বজয়ের— এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের।
'আমার লড়াই আর প্রত্যাবর্তনের চূড়ান্ত স্বীকৃতি হলো এই বিশ্বকাপ জয়। আজ আমি কেবল উদযাপন করতে চাই। আমি ভীষণ আনন্দিত। কাজটা খুব কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা দারুণ একটা কাজ করেছি। দল যা অর্জন করে, তার চেয়ে বড় কোনো ব্যক্তিগত অর্জন হতে পারে না,' স্বপ্নের ট্রফিতে হাত রেখে বলেছিলেন রোনালদো।
গল্পটা পুরোপুরি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৯৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোলে যখন ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিওর পেনাল্টি মিসে ব্রাজিল তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ নিশ্চিত করল, সাইডলাইনে থাকা ১৭ বছরের এক কিশোর আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে স্বদেশি ক্লাব ক্রুজেইরোর হয়ে ৪৭ ম্যাচে ৪৪ গোল করলেও সেবারের বিশ্বকাপে এক মিনিটও মাঠে নামা হয়নি তার। বেঞ্চে বসে রোমারিও-বেবেতোদের কাছ থেকে কেবল দেখেই শিখেছিলেন তিনি।
এরপর সতীর্থ রোমারিওর পরামর্শেই ইউরোপে পাড়ি জমানো, যোগ দেন ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোফেনে। পরবর্তী চার বছরে বিশ্ব দেখল এক জাদুকরী ফুটবলারের উত্থান। শারীরিক শক্তির সাথে কাব্যিক ছোঁয়ার এমন নিখুঁত ও ভয়ংকর সুন্দর মিশ্রণ আগে কোনো স্ট্রাইকারের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বার্সেলোনা থেকে ইন্টার মিলান— গোলের বন্যা বইয়ে এক অপ্রতিরোধ্য দানবে পরিণত হলেন তিনি।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে খেলতে যখন ফ্রান্সে পা রাখলেন, ২১ বছর বয়সী সেই তরুণ তখন আর কেবল সম্ভাবনাময় কেউ নন। তিনি তখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। তাকে লোকে চেনে 'ও ফেনোমেনো' নামে। প্রত্যাশার পারদ আকাশ ছুঁয়েছিল, রোনালদোও হতাশ করেননি। টুর্নামেন্টে চার গোল করে, অবিশ্বাস্য গতি আর পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে ব্রাজিলকে তোলেন টানা দ্বিতীয় ফাইনালে।
কিন্তু এরপরই ঘটল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ঘটনা। ফাইনালের দিন দুপুরে টিম হোটেলে আচমকা খিঁচুনি শুরু হয় রোনালদোর। মিনিট কয়েকের জন্য জ্ঞানও হারান তিনি। তড়িঘড়ি করে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেটা কি মানসিক চাপ ছিল, নাকি শারীরিক কোনো অসুস্থতা— তা আজও অজানা। দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে ছাড়া সেলেসাওদের ডেরায় নেমে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো দলের ভেতর। কিন্তু ম্যাচের ঠিক আগে সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি ফিরলেন, চিকিৎসকদের রাজি করিয়ে শুরুর একাদশে নিজের নাম লেখান। কিন্তু সেদিন মাঠে যে রোনালদো ছিলেন, তিনি ছিলেন আসলে এক বিবর্ণ ছায়া। পুরো ম্যাচ যেন ঘোরের মধ্যে খেললেন। তিনি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতলেও ফ্রান্সের কাছে ব্রাজিল বিধ্বস্ত হয় ৩-০ গোলে।
শুরু হলো অন্তহীন বিতর্ক। জন্ম নিল হাজারো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। ফ্রান্সে সেই হারের পর ব্রাজিলে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিশন পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল। সেখানে রোনালদোকে সাক্ষ্য দিতেও ডাকা হয়।
ফ্রান্সের ওই দুঃস্বপ্ন যেন এক দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপের শুরু মাত্র। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ইতালিয়ান পরাশক্তি ইন্টারের হয়ে খেলার সময় রোনালদোর ডান হাঁটুর টেন্ডন ছিঁড়ে যায়। অস্ত্রোপচারের কোনো বিকল্প ছিল না। পাঁচ মাস পর ২০০০ সালের এপ্রিলে কোপা ইতালিয়ার ফাইনালে লাৎসিওর বিপক্ষে মাঠে তিনি ফিরলেন ঠিকই, তবে তা স্থায়ী হলো মাত্র ছয় মিনিট।
বল পায়ে তার সেই ট্রেডমার্ক স্টেপ ওভার করতে গেলেন, আর তখনই পা ঘুরে গেল। ডান হাঁটুর নি-ক্যাপ পুরোপুরি ছিঁড়ে উরুর পেশির দিকে উঠে গেল। নীল-কালো জার্সিতে থাকা সতীর্থরা মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মাঠে লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে লাগলেন ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকার। হাঁটু বিস্ফোরিত হওয়ার সেই বিকট শব্দ নাকি আশেপাশের খেলোয়াড়রাও শুনতে পেয়েছিলেন। রোনালদোর ফিজিওথেরাপিস্ট নিলতন পেত্রোনে বলেছিলেন, সেটা ছিল তার দেখা 'সবচেয়ে বাজে চোট'। মাঠে ফিরতে তাই অলৌকিক কিছুর দরকার ছিল।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। আট মাস পরও রোনালদো তার হাঁটু ৯০ ডিগ্রির বেশি বাঁকা করতে পারতেন না। তিনি নিজেও সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন যে, তাকে সারিয়ে তোলার মতো কোনো চিকিৎসার অস্তিত্ব আদৌ আছে কি না। সমাধানের খোঁজে তাই চষে বেড়ান গোটা বিশ্ব। ফরাসি সার্জন জেরার সাইয়ান তার হাঁটুতে দুবার অস্ত্রোপচার করলেন। এরপর শুরু হয় দিনে প্রায় নয় ঘণ্টার একটি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, রোনালদোর ভাষায় যা ছিল 'অন্তহীন এক নির্যাতন'।
দীর্ঘ ১৫ মাস পর যখন তিনি মাঠে ফেরেন, ২০০২ সালের বিশ্বকাপের তখন মাত্র বছরখানেক বাকি। তার ফিটনেস আর ফর্ম নিয়ে বিশ্বজুড়ে তখন শুধুই সংশয়। কিন্তু ব্রাজিলের কোচ লুইজ ফেলিপে স্কোলারি জানতেন, এই একটি মানুষ ফিট থাকলে কী জাদুকরী ঘটনা ঘটতে পারে! তার আস্থার প্রতিদান রোনালদো দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ইন্টারের হয়ে শেষ পাঁচ ম্যাচে চার গোল করে জানান দেন— তিনি প্রস্তুত।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বসে এশিয়ার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের আসর। সেলেসাওদের আক্রমণভাগে রিভালদো আর রোনালদিনিয়োর মতো তারকা থাকলেও সবার নজর ছিল সেই ৯ নম্বর জার্সির দিকে। টুর্নামেন্টের শুরুতেই রোনালদো প্রমাণ দিলেন নিজের সীমাহীন সামর্থ্যের, তুরস্কের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে গোল করলেন। ছন্দ বজায় রেখে ফাইনালে ওঠার আগ পর্যন্ত আরও পাঁচবার জাল কাঁপালেন। তিনি হয়ে উঠলেন প্রতিপক্ষের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। গ্রুপ পর্বে তুরস্কের পর চীন ও কোস্টারিকা এবং নকআউট পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে বেলজিয়াম ও সেমিফাইনালে ফের তুরস্ক পুড়ল তার গোলায়। কেবল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল পাননি।
ফাইনালের মঞ্চে প্রতিপক্ষ জার্মানি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দুই দলের প্রথম দেখা— ব্রাজিল চারবারের চ্যাম্পিয়ন, জার্মানি তিনবারের। একদিকে টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করা গোলরক্ষক অলিভার কান, অন্যদিকে ভস্ম থেকে জন্ম নেওয়া এক ফিনিক্স পাখি। ফাইনালের আগে যদিও অবধারিতভাবেই ফিরে আসছিল চার বছর আগের স্তাদ দে ফ্রান্সের স্মৃতি, কিন্তু রোনালদো ছিলেন শান্ত জলের মতো।
ফাইনালে নামার আগে বলেছিলেন, 'সবাই আমাকে বারবার ১৯৯৮ সালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আমি জানি না কেন। আমি ওটা ভুলে গেছি এবং ওটা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু একটা ভালো ম্যাচ খেলার এবং ব্রাজিলের জন্য শিরোপা জেতার মতো মানসিক প্রশান্তি খুঁজছি।'
ম্যাচের প্রথমার্ধে তিনবার কানকে ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে পেলেও তাকে পরাস্ত করতে পারেননি রোনালদো। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট বদলে গেল। ৬৭তম মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জার্মান মিডফিল্ডার ডিটমার হামানের কাছ থেকে গায়ের জোরে বল কেড়ে নিয়ে রিভালদোকে পাস দিলেন রোনালদো। রিভালদোর দূরপাল্লার জোরালো শট আটকাতে পারলেও গ্লাভসবন্দি করতে পারলেন না কান। বল ছিটকে এল সামনে, আর শিকারি চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় সেখানে পৌঁছে আলতো টোকায় বল জালে জড়ালেন রোনালদো।
দ্বিতীয় গোলটি ছিল এক নিখুঁত শিল্পের প্রদর্শনী। ৭৯তম মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে ক্লেবারসনের দুর্দান্ত দৌড়, ডি-বক্সের মাথায় রিভালদোর সেই বিখ্যাত ডামি, আর বল পেয়ে রোনালদোর সেই মায়াবী প্রথম স্পর্শ। এরপর জায়গা বানিয়ে ডান পায়ের নিখুঁত প্লেসিংয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন জালে, আবার পরাস্ত হলেন কান। টুর্নামেন্টে অষ্টম গোলের স্বাদ নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মাননা গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করলেন রোনালদো।
ডাগআউটের দিকে দুহাত প্রসারিত করে দৌড়াতে থাকেন তিনি। মাথায় সেই বিখ্যাত 'অর্ধচন্দ্রাকার' হেয়ারকাট। কোচ ও সতীর্থদের আলিঙ্গনে যখন আবদ্ধ হন, ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছে ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপা। শেষ বাঁশির পর অধিনায়ক কাফু যখন সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন, সেই উদযাপনের মাঝেও রোনালদো হয়তো তখন ফিরে তাকাচ্ছিলেন গত চার বছরে তার ফেলে আসা রক্ত, ঘাম আর কান্নার দিকে। ইয়োকোহামার মাঠ ছাড়ার সময় বলেছিলেন, 'ঘোর কল্পনাতেও ভাবিনি যে এমন কিছু ঘটবে। আমার মনে হয়নি যে কাউকে কিছু প্রমাণ করার আছে। কিন্তু এটা আমার মনের ওপর একটা বড় বোঝা হয়ে ছিল।'
অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। বিপরীতে রোনালদো টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা ব্রাজিলের স্কোয়াডে ছিলেন। তবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটিকে পুরোপুরি নিজের করে নেওয়ার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে, তাকে লড়তে হয়েছে নিজের শরীর, ভাগ্য আর সমালোচকদের সাথে। সেই অপেক্ষা আর লড়াইয়ে জয়ী হয়ে রোনালদো পুনরুদ্ধার করেছিলেন তার হারানো সিংহাসন। ফুটবল বিশ্ব সেদিন দেখেছিল দুঃসহ অন্ধকার ছাপিয়ে এক জাদুকরের সত্যিকারের পুনর্জন্ম।