মুকুটহীন মহারাজার কান্না
রাত তখন গভীর হয়ে এসেছে। আল-থুমামা স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে সবুজ মাঠে তখনও উৎসবের আগুন জ্বলছে মরক্কোর লাল জার্সিতে। কিন্তু সেই আলোর বিপরীত দিকে, টানেলের মুখে, পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ফুটবলার একা হেঁটে যাচ্ছেন অন্ধকারের দিকে। পেছনে ফেলে যাচ্ছেন আলো, উত্তাপ, গর্জন।
আর তারপর, ক্যামেরার শেষ ফ্রেমে ধরা পড়ল সেই দৃশ্য। বুকে হাত চেপে, মুখ ঢেকে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো কাঁদছেন। সেই কান্না কোনো সাধারণ হারের কান্না নয়। সেটা ছিল একটা জীবনের সবচেয়ে বড় না-পাওয়াকে শেষবারের মতো বুকে আঁকড়ে ধরার শব্দ।
২০২২ বিশ্বকাপের কিছুদিন আগের কথা মনে করুন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ড্রেসিং রুম তখন রণক্ষেত্র। রোনালদো একটি সাক্ষাৎকারে ক্লাবের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দাগালেন। ম্যানেজার এরিক টেন হাগকে নিয়ে, ক্লাবের পরিকাঠামো নিয়ে, সব কিছু নিয়ে। শব্দগুলো বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল, ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে, চুক্তি ছিন্ন হলো। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হলো তাকে। একা, ক্লান্ত এবং বিতর্কের আগুনে ঝলসানো।
এই অবস্থায় বিশ্বকাপে নামা সহজ কথা নয়। মাথার ভেতর তখন একটা ক্লাবের পতন, একটা সম্পর্কের তিক্ত সমাপ্তি, এবং সেই সঙ্গে নিজের বয়সের হিসাব। ৩৭ বছর বয়সে কতটুকু বাকি থাকে আর? কতটুকু দেওয়ার ক্ষমতা থাকে সেই পেশিতে, যে পেশি একসময় মাধ্যাকর্ষণকেও হার মানিয়েছিল?
গ্রুপ পর্বে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন, বিশ্বকাপে পাঁচটি আসরে গোল করার অনন্য রেকর্ড। মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুললেন, সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে। কিন্তু চোখ দেখলে বোঝা যেত, এবারের আগুনটা একটু অন্যরকম, একটু বেশি মরিয়া, একটু বেশি কাঁপছে।
তারপর এলো সেই সিদ্ধান্ত, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিল।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে কোচ ফার্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে রাখলেন বেঞ্চে। পরিবর্তে মাঠে গনসালো রামোস, ২১ বছরের এক তরুণ, যার নাম দুনিয়ার অনেকে তখনও জানত না। রামোস হ্যাটট্রিক করলেন। পর্তুগাল জিতল ৬-১ গোলে।
মাঠে তখন আনন্দের ঢেউ। আর বেঞ্চে বসে রোনালদো সেই দৃশ্য দেখছিলেন। ক্যামেরা বারবার তার মুখে ঘুরে যাচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী জানতে চাইছিল, এই মুহূর্তে তার ভেতরে কী চলছে। কিন্তু রোনালদোর চোখে তখন সেই চেনা আগুন নেই। আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। নিজের দল গোল করছে, তবু সেই গোলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি দর্শক, পৃথিবীর অন্যতম বড় তারকা সেদিন ছিলেন নিছক একজন দর্শক।
পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে রোনালদো ছিলেন গ্রিক পুরাণের সেই আটলাস, যিনি একা নিজের কাঁধে বহন করে এসেছেন পর্তুগালের সব ভার। ইউরো ২০১৬-এ মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পরও বেঞ্চ থেকে দাঁড়িয়ে কোচের ভূমিকায় টিমমেটদের উজ্জীবিত করেছিলেন, সেই রোনালদো। যে রোনালদো বিশ্বাস করতেন, তার উপস্থিতিই যথেষ্ট।
কিন্তু ২০২২-এ এসে সেই আটলাসের শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। একটু একটু করে যে সর্বশক্তিমান ভাবমূর্তি তিনি গড়েছিলেন, তা ভেঙে পড়ছিল। একজন অতিমানব ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার ট্র্যাজেডি, এর চেয়ে বড় মর্মান্তিক দৃশ্য ফুটবল মাঠে কমই দেখা গেছে।
মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও তিনি শুরু করলেন বেঞ্চ থেকে। দ্বিতীয়ার্ধে নামলেন বটে, কিন্তু ততক্ষণে মরক্কো এগিয়ে। তিনি চাইছিলেন, শরীর চাইছিল না। পা চলছিল না সেই গতিতে, লাফ উঠছিল না সেই উচ্চতায়। একটা গোলের জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটছিলেন, কিন্তু বল যেন তাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল।
শেষ বাঁশি বাজল।
মরক্কো জিতেছে। পর্তুগাল বিশ্বকাপ থেকে বিদায়। আর রোনালদোর জন্য, সম্ভবত শেষবারের মতো বিশ্বকাপে কিছু করে দেখানোর সুযোগ শেষ।
তিনি মাঝমাঠে লুটিয়ে পড়লেন না। চিৎকার করলেন না। শুধু একা, দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলেন টানেলের দিকে। পেছনে পড়ে রইল আলো, ক্যামেরার ঝলকানি, মরক্কোর উদযাপন। সামনে টানেলের অন্ধকার। সেই হাঁটা ছিল যেন নিজের নিয়তিকে মেনে নেওয়ার হাঁটা। ধীরে নয়, দ্রুতগতিতে, যেন অন্ধকারটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুকে টেনে নিতে চাইছেন।
টানেলে ঢোকার পরপরই ভাঙল সেই দেওয়াল।
বুকে হাত চেপে, মুখ ঢেকে রোনালদো কাঁদলেন। সেই কান্না সারা পৃথিবী দেখল। যে মানুষকে ফুটবল বিশ্ব চিনত এক সাইবর্গ হিসেবে, যার রক্তনালিতে বইত কেবল জয়ের তৃষ্ণা, সেই মানুষের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। এক মিথ ভেঙে পড়ছে, আর তার ভাঙার শব্দ পুরো পৃথিবী শুনল। কিন্তু শব্দে নয়, নিঃশব্দে।
সেটা কেবল একটা হারের কান্না ছিল না। সেটা ছিল তিল তিল করে গড়া আজীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নকে হাতের মুঠো থেকে চিরতরে সরে যেতে দেখার কান্না। বিশ্বকাপ, যে ট্রফির জন্য তিনি সবকিছু দিয়েছিলেন, সেটা আর কোনোদিন আসবে না। অন্তত ২০২২-এ সেটাই মনে হয়েছিল।
রবার্তো ব্যাজ্জিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পর যেভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ছবি ফুটবল ইতিহাস কখনো মুছতে পারবে না। তেমনই আল-থুমামার টানেলে রোনালদোর সেই অশ্রুসিক্ত মুখটা থেকে যাবে, একজন লড়াকু মানুষের চূড়ান্ত অসহায়ত্বের কবিতা হিসেবে।
ট্রফি না পেলেও ইতিহাস তাকে মনে রাখবে। কারণ মুকুটের চেয়ে বড় কিছু থাকে। থাকে সেই জেদ, সেই অদম্য চাওয়া, সেই না-পেয়েও বারবার ফিরে আসার সাহস।
কিন্তু গল্প শেষ হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপ আসছে। আর ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো আসছেন তার সঙ্গে।
৪১ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামবেন তিনি। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে পর্তুগালের জার্সিতে তিনি আবার সেই স্বপ্নটাকে বুকে নিয়ে নামবেন, যেটা আল-থুমামার টানেলে কাঁদতে কাঁদতেও ছাড়েননি।
হয়তো এবার হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু রোনালদো মাঠে থাকলে সম্ভাবনা সবসময় থাকে, এটাই তার সবচেয়ে বড় সত্য।
আর যদি না-ও হয়, টানেলের সেই কান্নার পর আবার উঠে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসাটাই তো এক অর্থে জয়। মুকুটহীন এই মহারাজার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট নয় কি?