এস্তেভাওয়ের চোটে কি নেইমারের বিশ্বকাপ দরজা খুলবে?
বিশ্বকাপের আগে শেষ আন্তর্জাতিক বিরতিটা ব্রাজিলের জন্য ছিল কিছুটা মিশ্র অভিজ্ঞতার। কার্লো আনচেলত্তির দল ম্যাসাচুসেটসে ১০ জনের ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হারলেও, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। তবে এর চেয়েও বড় স্বস্তি ছিল দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে কোচের স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া। কিন্তু হঠাৎ করেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত চোট ব্রাজিলের বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় বড় এক ধাক্কা দিয়েছে, আর সেই সঙ্গে উসকে দিয়েছে পুরনো এক জল্পনা, নেইমার কি ফিরছেন?
প্রীতি ম্যাচগুলোর পর ব্রাজিলের ফুটবল মহলে একটা সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, আনচেলত্তি হয়তো তার ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডের ২২ জনের নাম এরই মধ্যে ঠিক করে ফেলেছেন। নটিংহ্যাম ফরেস্টের সাবেক ও বর্তমান বোতাফোগো মিডফিল্ডার দানিলো এতটাই ভালো করেছেন যে তার জায়গা প্রায় নিশ্চিত। জুভেন্টাসের ব্রেমার এবং জেনিতের ডগলাস সান্তোসও নিজেদের জায়গা পাকা করেছেন। এনদ্রিক ও ইগর থিয়াগোও আনচেলত্তির খাতায় প্রায় চূড়ান্ত ছিলেন।
কিন্তু তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আনচেলত্তির সামনে এসে দাঁড়ায় এক কঠিন সমীকরণ। চেলসির দুর্দান্ত ফর্মে থাকা উইঙ্গার এস্তেভাও হ্যামস্ট্রিংয়ে গুরুতর চোট পেয়েছেন। তার বিশ্বকাপের স্বপ্ন এখন বলতে গেলে সুতোর ওপর ঝুলছে। মার্চে এসিএল চোটে রদ্রিগোকে হারানোটা এক ধাক্কা হলেও, এস্তেভাওয়ের শূন্যতা পূরণ করা আনচেলত্তির জন্য অনেক বেশি কঠিন। গত এক বছরে এই ১৮ বছর বয়সী তরুণ ব্রাজিলের ডান প্রান্তে রীতিমতো জাদু দেখিয়েছেন, আনচেলত্তির অধীনে দলের সর্বোচ্চ ৫টি গোলও তার।
এস্তেভাওয়ের এই অনুপস্থিতি আনচেলত্তিকে তার শুরুর একাদশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। হয়তো রাফিনিয়াকে ডান দিকে সরিয়ে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বামে এবং জোয়াও পেদ্রোকে সামনে খেলানো হতে পারে। বিকল্প হিসেবে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি বা জেনিতের লুইজ হেনরিকও বিবেচনায় থাকবেন। আর স্কোয়াডে সরাসরি এস্তেভাওয়ের বদলি হিসেবে বোর্নমাউথের রায়ান, লুকাস পাকেতা কিংবা রিচার্লিসনের নামও উঠে আসছে।
তবে এসব ছাপিয়ে অবধারিতভাবেই যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, সেটি হলো নেইমার। এস্তেভাওয়ের চোট যেন সেই দরজাটি আবারও সামান্য খুলে দিয়েছে, যেখান দিয়ে নেইমারের ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ১৮ মে আনচেলত্তি স্কোয়াড ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই আলোচনা যে থামবে না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে নিজের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুমটা খুব একটা খারাপ কাটাননি নেইমার। চোটের কারণে বেশ কিছু ম্যাচ মিস করলেও দলকে অবনমন থেকে বাঁচাতে কিছু জাদুকরী পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের পর এ বছর তিনি সান্তোসের হয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়ান এই বলে যে, তিনি এখনো অপূর্ণ স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে দেখতে চান। তবে মাঠে তার ধারাবাহিকতার বেশ অভাব রয়েছে। কিছু ম্যাচে তিনি দারুণ ঝলক দেখালেও, অনেক ম্যাচেই তাকে বেশ ধীরগতির ও ছন্দহীন মনে হয়েছে।
বয়স যে তার ছাপ ফেলে যাচ্ছে, সেটা এখন স্পষ্ট। আগের মতো সেই চটপটে ড্রিবলিং বা মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো তার আগের মতো নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঠ ও মাঠের বাইরের চিরচেনা বিতর্কগুলো। দর্শকদের সাথে বাদানুবাদ, রেফারির সাথে তর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার কড়া জবাব, সব মিলিয়ে নেইমারকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পারদ সব সময়ই উঁচুতে থাকছে।
তবে ফর্ম বা ফিটনেস যাই হোক না কেন, ব্রাজিলের মানুষের কাছে নেইমারের আবেদন এখনো ফুরোয়নি। অরল্যান্ডোতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন দর্শকরা তার নামে স্লোগান দিয়েছে। খোদ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাও আনচেলত্তির সাথে নেইমারকে নিয়ে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় অর্ধেক ব্রাজিলিয়ান এখনো জাতীয় দলে নেইমারকে দেখতে চান। গাব্রিয়েল জেসুসের মতো সতীর্থরাও স্বীকার করেন, টেকনিক্যালি নেইমার এখনো দলের সেরা এবং এক মুহূর্তেই ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য তার আছে।
তবে কাফু বা জিকোর মতো কিংবদন্তিরা কিছুটা সন্দিহান। তাদের মতে, নেইমারের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও, বিশ্বকাপে খেলার জন্য তার ধারাবাহিকতা এবং ফিটনেস অত্যন্ত জরুরি। আর কোচ আনচেলত্তি এ বিষয়ে একেবারে স্পষ্ট। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট না হলে কাউকে দলে সুযোগ দেওয়া হবে না।
আশার কথা হলো, সম্প্রতি সান্তোসের হয়ে ১১ দিনে চারটি ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিটই খেলেছেন নেইমার। বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণার আগে ক্লাব পর্যায়ে আর সর্বোচ্চ ছয়টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন তিনি। সময়টা খুব বেশি নয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এস্তেভাও যদি চোট না পেতেন, হয়তো নেইমারের ফেরার এই অধ্যায়টা চিরতরে বন্ধ বলেই ধরে নেওয়া যেত। তবে এখন দরজাটা সামান্য হলেও খোলা। সেই দরজা দিয়ে নেইমার স্বপ্নের বিশ্বকাপে পা রাখতে পারবেন কি না, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে তার নিজেরই ওপর।