আবুধাবি থেকে

কোচ জয়াসুরিয়ার প্রভাব ও বাংলাদেশের যেখানে ঘাটতি 

একুশ তাপাদার
একুশ তাপাদার

শ্রীলঙ্কার বর্তমান দলে সবচেয়ে বড় তারকা কে? ভানিন্দু হাসারাঙ্গা, কুশল মেন্ডিসদের তারকাখ্যাতি আছে বটে। তবে ১৪ বছর আগে খেলা ছেড়ে দেওয়া একজনের কাছে এখনো তাদের আবেদন কিছুটা ম্লান। লঙ্কান দল যেদিকে যায় তাদের কোচ সনাৎ জয়াসুরিয়াকে নিয়ে লোকের আগ্রহ থাকে বেশি। দল ভালো করুক কিংবা মন্দ, টিভি ক্যামেরাও খুঁজে নেয় মাতারা হ্যারিকেন নামের এই কিংবদন্তিকে।

তবে কেবল তারকাখ্যাতি, নামের ভারের জৌলুসই নয়, শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব পুরোপুরি বুঝে নেওয়ার পর কৌশলগত দিক থেকে ইতিবাচক প্রভাবও তৈরি করতে পেরেছেন তিনি। গত বছর অক্টোবরে প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন দেশটির বিশ্বকাপজয়ী তারকা। আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই পদে কাজ করবেন।

শ্রীলঙ্কার সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সেরা এক প্রতিনিধি জয়াসুরিয়া। তাদের পরে কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনেদের প্রজন্ম আরও কিছু বছর লঙ্কান ক্রিকেট টেনে নিয়ে গেছেন। তারাও থামার পর বিশ্ব মাতানো তারকার অভাবে ভুগেছে দলটি। ফলে বিশ্ব আসরে তার হোঁচট খেয়েছে বারবার। গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও খেলা হয়নি তাদের। যদিও এশিয়া কাপে আবার সাফল্য অধরা নয়, টি-টোয়েন্টি সংস্করণের সর্বশেষ আসরে চ্যাম্পিয়ন তারা, ওয়ানডে আসরে রানার্সআপ। তবে সাদা বলে শ্রীলঙ্কা সেরা শক্তির দলগুলো থেকে স্পষ্ট পিছিয়ে, হারানো গৌরবের ধারা ফেরাতেই দায়িত্বে এসেছেন জয়াসুরিয়া।

খেলোয়াড়ী জীবনে জয়াসুরিয়ার ব্যাটিং মানেই ছিলো উত্তাল পরিস্থিতি। ওয়ানডেতে পাওয়ার প্লের আদর্শ ব্যবহার শিখিয়েছিলেনই তিনিই। ব্যাটার জয়াসুরিয়া যতটা আগ্রাসী ছিলেন, কোচ জয়াসুরিয়া নাকি ততটাই স্থিতধি। এই ভূমিকায় হিসেব নিকেশের ছক ধরে এগুতে পছন্দ করেন তিনি। একটা ফাদার ফিগার হয়ে উঠে ভয়ডরহীন মানসিকতা পুঁতে দিতে পেরেছেন দলের ভেতরে। শ্রীলঙ্কা দলের শরীরী ভাষা দেখলে অন্তত সেটাই মনে হবে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩২ বলে ৪৬ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলা কামিল মিশারা জানান জয়াসুরিয়া আসায় তাদের খেলার স্বাধীনতা, দলের আবহে এসেছে ইতিবাচক বদল, 'তিনি সব সময় শান্ত থাকেন। আমাদেরকে বলেন নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে, নিজেদের সামর্থ্যের উপর আস্থা রাখতে বলেন। পরিবেশটাই তিনি অনেকটা বদলে দিয়েছেন, আমাদেরকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমরা তার অধীনে বেশ স্বস্তি বোধ করি ড্রেসিংরুমে। তিনি একটা গুড ফিলিং ভাইব নিয়ে এসেছেন। '

শ্রীলঙ্কার সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেকেই কোচিংয়ে এসে বিশ্ব কাতারে প্রভাব রেখেছেন। আইপিএলে জয়াবর্ধনে, সাঙ্গাকারাদের কদর বিস্তর। এমনকি চণ্ডিকা হাথুরুসিংহেও বাংলাদেশের মতন আন্তর্জাতিক দলে বেশ কিছু সাফল্য এনে গেছেন। শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং কোচ থিলান কান্দাম্বির মতে উপমহাদেশীয় ক্রিকেটারদের জন্য স্বদেশী কোচ থাকা সুবিধাজনক। তাতে ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত সুবিধা পাওয়া যায়, 'দেখেন ভারতীয় দল অনেক বছর ধরেই নিজেদের কোচ দিয়ে সাফল্য পাচ্ছে। স্বদেশী কোচ থাকলে তরুণদের ভাষা ও মনোজগতের কাছাকাছি যাওয়া যায় বেশি।'

তবে স্বদেশী কেউ উঁচু মানের না থাকলে তো কিছু করার নেই। অন্যের দ্বারস্থ হতেই হবে। বাংলাদেশ দলে প্রধান সহকারী কোচ হিসেবে আছেন মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। ঘরোয়া ক্রিকেটে সুনাম আছে তার। তবে জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করে এখনো সেরকম প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষত ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ভোগান্তি থেকে উত্তরণ দেখা যাচ্ছে না।

এর আগে এই পর্যায়ে কোচ হিসেবে দেখা গেছে খালেদ মাহমুদ সুজন, সারোওয়ার ইমরানকে। তাদের সবারই আছে সীমাবদ্ধতা। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো নিজেদের কাউকে আন্তর্জাতিক মানের কোচ হিসেবে পায়নি। সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যে এই পর্যায়ে আসার ঝোঁক এখনো প্রবল না, যাদের ইচ্ছা আছে তাদের দক্ষতা নিয়ে আছে প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সাবেক খেলোয়াড়দের অনেকেরই কোচ হওয়ার চেয়ে ক্রিকেট প্রশাসন বা রাজনীতিতে আগ্রহ বেশি। পঞ্চপাণ্ডব বলে পরিচিত বাংলাদেশের পাঁচ তারকা ক্রিকেটারের মধ্যে কোচিংয়ে আগ্রহী দেখা যাচ্ছে কেবল মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে। সম্প্রতি তিনি বিসিবি আয়োজিত লেভেল-থ্রি কোচিং কোর্স করেছেন। আগামীতে তিনি এই জায়গায় কতদূর যান দেখার বিষয়।

একটা উন্নত ক্রিকেট সংস্কৃতিতে কেবল খেলোয়াড় নয়, বিশ্বমানের কোচও প্রয়োজন। লঙ্কানদের সঙ্গে ক্রিকেট মাঠে টক্কর দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও ক্রিকেট নলেজের দিক থেকে এখনো সেই অবস্থা তৈরি হয়নি।