তৃতীয় ইউরোপিয়ান শিরোপা: কোচিংয়ের মহানায়কদের কাতারে এনরিকে
টাইব্রেকারের চরম নাটকীয়তা, আর্সেনালের স্বপ্নভঙ্গ আর বুদাপেস্টের বুকে পিএসজির শিরোপা উল্লাস— সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল লুইস এনরিকের জন্য হয়ে রইল এক অমর কাব্য। শনিবার রাতে এই স্নায়ুক্ষয়ী জয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট তিনবার অর্জনের বিরল কীর্তি গড়লেন তিনি। ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম কোচ হিসেবে এই স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড জায়গা করে নিলেন সেই মহানায়কদের কাতারে, যেখানে কেবল সর্বকালের সেরা কোচদেরই রাজত্ব।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২১ জন কোচ একাধিকবার ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৯২ সাল পর্যন্ত এই নামে পরিচিত ছিল) বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন। তবে তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচজন কোচ এই শিরোপা দুইবারের বেশি জিততে পেরেছেন। পেপ গার্দিওলা, বব পেইসলি, জিনেদিন জিদান ও কার্লো আনচেলত্তির পর এই বিশেষ তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছেন এনরিকে।
২০১৫ সালে বার্সেলোনার হয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিলেন এনরিকে। এরপর ঠিক ১২ মাস আগে পিএসজিকে তাদের ক্লাব ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতান। আর এবার তাদের হয়ে টানা দ্বিতীয় ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগটি নিশ্চিত করেছেন তিনি।
আরেকটি দারুণ কীর্তিও গড়েছেন এনরিকে। একাধিক ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা কোচদের ছোট্ট তালিকাতেও তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন কোচ আছেন মাত্র সাতজন। এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় এনরিকের সঙ্গীরা হলেন— আর্নস্ট হ্যাপেল, ইয়ুপ হেইঙ্কেস, ওটমার হিটজফেল্ড, জোসে মরিনহো, আনচেলত্তি ও গার্দিওলা। শুধু তা-ই নয়, খেলোয়াড় ও কোচ— উভয় ভূমিকাতেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা মাত্র সাতজনের একটি দলেও আনচেলত্তি ও গার্দিওলা রয়েছেন। বাকিরা হলেন ইয়োহান ক্রুইফ, মিগেল মুনোজ, ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড, জিওভান্নি ত্রাপাত্তোনি ও জিনেদিন জিদান।
কোন কোচ সবচেয়ে বেশিবার ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন?
কার্লো আনচেলত্তি (ইতালি)— এসি মিলান (২০০৩, ২০০৭) ও রিয়াল মাদ্রিদ (২০১৪, ২০২২, ২০২৪)
ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানের হয়ে একজন দুর্দান্ত মিডফিল্ডার হিসেবে দুইবার ইউরোপিয়ান কাপের শিরোপা জেতা আনচেলত্তি খুব সহজেই কোচিং পেশায় মানিয়ে নেন। তিনি ২০০৩ সালে (ইউভেন্তাসের বিপক্ষে) ও ২০০৭ সালে (লিভারপুলের বিপক্ষে) মিলানকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা এনে দেন। মাঝখানে কেবল 'মিরাকল অফ ইস্তানবুল'-এর কারণেই (লিভারপুলের বিপক্ষে) তার আরেকটি শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল। এরপর ২০১৪ সালে রিয়ালের হয়ে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনাল জিতে তিনি তার তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলেন। ২০২২ সালে তিনি প্রথম কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পাঁচটি ফাইনালে খেলার এবং প্রথম কোচ হিসেবে চারটি শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়েন। দুই বছর পর তিনি তার এই দুটি রেকর্ডকেই আরও সমৃদ্ধ করেন।
বব পেইসলি (ইংল্যান্ড)– লিভারপুল (১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮১)
১৯৭৪ সালে বিল শ্যাঙ্কলির কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার সময় পেইসলি খুব বিনয়ের সাথে বলেছিলেন যে, তিনি তার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। নয় বছর পর যখন তিনি অবসর নেন, ততদিনে লিভারপুলকে ছয়টি ইংলিশ লিগ, একটি উয়েফা কাপ, তিনটি লিগ কাপ ও তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে (বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখের বিপক্ষে) ও ১৯৭৮ সালে (ক্লাব ব্রুজের বিপক্ষে) জয়ের পর ১৯৮১ সালে প্যারিসে রিয়ালকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে মাত্র পাঁচ মৌসুমের মধ্যে তিনি তিনটি শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়েন।
জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)– রিয়াল মাদ্রিদ (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮)
ফুটবল কিংবদন্তি জিদান তার বুট জোড়া তুলে রাখার আগে খেলোয়াড় হিসেবে মাত্র একবারই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিলেন। ২০০২ সালের ফাইনালে বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে রিয়ালের হয়ে তার জাদুকরী ভলিটি সেই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এরপর কোচিংয়ে নাম লিখিয়ে ২০১৪ সালে আনচেলত্তির সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। আর রিয়ালের প্রধান কোচ হিসেবে নিজের প্রথম তিন মৌসুমেই তিনি তার খেলোয়াড়ি জীবনের শিরোপা সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যান। তিনি প্রথম কোচ হিসেবে কোনো দলকে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতানোর অনন্য রেকর্ড গড়েন।
পেপ গার্দিওলা (স্পেন)– বার্সেলোনা (২০০৯, ২০১১) ও ম্যানচেস্টার সিটি (২০২৩)
১৯৯২ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছিলেন মিডফিল্ডার গার্দিওলা। কোচ হিসেবে নিজের পুরোনো ক্লাবের হয়ে প্রথম মেয়াদেই তিনি দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতেন। এরপর তিনি দেশের বাইরে গিয়ে প্রথমে বায়ার্ন মিউনিখ ও পরে ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্ব নেন। ২০২১ সালে তিনি ইংলিশ দলটিকে ফাইনালে তুলেছিলেন। তবে প্রিমিয়ার লিগের প্রতিদ্বন্দ্বী চেলসির কাছে হেরে যান। অবশেষে ২০২৩ সালে ইস্তানবুলে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ম্যান সিটি ইন্টার মিলানকে হারালে কোচ হিসেবে তার তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।
লুইস এনরিকে (স্পেন)– বার্সেলোনা (২০১৫) ও পিএসজি (২০২৫, ২০২৬)
বার্সেলোনার আরেকজন সাবেক তারকা মিডফিল্ডার এনরিকে খেলোয়াড় হিসেবে কখনোই ইউরোপিয়ান কাপের ছোঁয়া পাননি। তবে কোচ হিসেবে ইতোমধ্যেই তিনি তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতে নিয়েছেন। তার প্রথমটি আসে ২০১৫ সালে বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই। এক দশক পর পিএসজির হয়ে নিজের দ্বিতীয় মৌসুমে তিনি ফরাসি দলটিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়ে সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করেন। ঠিক ১২ মাস পর তিনি পিএসজির টানা দ্বিতীয় ও নিজের তৃতীয় শিরোপাটি নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যুগে জিদানের পর তিনি দ্বিতীয় কোচ হিসেবে সফলভাবে শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি গড়েন।