কোচ এনরিকেই আর্সেনালের সামনে পিএসজির সবচেয়ে বড় শক্তি
ফাইনাল ম্যাচের আগে অনেক কোচ চাপের কথা বলেন। অনেক দল কৌশল বদলায়। অনেক খেলোয়াড়ের চোখে ভেসে ওঠে দ্বিধা। কিন্তু লুইস এনরিকের দলগুলো যেন ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। যত বড় মঞ্চ, তত বেশি নির্দয় হয়ে ওঠেন তারা। যেন ফাইনাল কোনো ভয় নয়, বরং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার সবচেয়ে উপযুক্ত রাত।
শনিবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আর্সেনালের মুখোমুখি হবে পিএসজি। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে আবারও দাঁড়িয়ে আছেন লুইস এনরিকে। একজন কোচ, যিনি গত এক দশকে ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর ফাইনাল বিশেষজ্ঞদের একজন হয়ে উঠেছেন।
এক ম্যাচের ক্লাব ফাইনালে এখন পর্যন্ত ১২টির মধ্যে ১১টিতেই জিতেছেন এই স্প্যানিয়ার্ড। দুই ভিন্ন যুগ, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন এবং দুই ধরনের দল নিয়েও তিনি একই ফল এনে দিয়েছেন।
বার্সেলোনায় তার প্রথম রাজত্ব এসেছিল তারকাখচিত আক্রমণভাগকে কেন্দ্র করে। লিওনেল মেসি, নেইমার ও লুইস সুয়ারেজের সেই বিধ্বংসী ত্রয়ীকে নিয়ে এনরিকে ইউরোপ কাঁপিয়েছিলেন। ২০১৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জুভেন্তাসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বার্সেলোনাকে ট্রেবল জেতান তিনি।
সেই বছরই উয়েফা সুপার কাপে সেভিয়ার বিপক্ষে ৫-৪ গোলের উন্মাদনায় ভরা ম্যাচে জয় তুলে নেয় তার দল। এরপর আসে কোপা দেল রে, ক্লাব বিশ্বকাপ একটার পর একটা শিরোপা। এনরিকের বার্সেলোনা যেন সবসময় সামনের দিকে ছুটে চলা এক ঝড় ছিল।
কিন্তু পিএসজিতে এসে তার ফুটবলের রূপ বদলেছে। এই দল আগের মতো শুধুই সৌন্দর্যের নয়, বরং অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, অনেক বেশি শ্বাসরোধী। বল ছাড়া প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা, দ্রুত ট্রানজিশনে আঘাত হানা এবং নিরন্তর চাপ তৈরি করাই এখন তাদের পরিচয়।
গত বছর মিউনিখে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিল পিএসজি। সেটি কোনো টানটান ইউরোপীয় ফাইনালের মতো লাগেনি, বরং শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল ম্যাচটি একদিকেই যাবে। পিএসজির চাপ, গতি আর নিখুঁত আক্রমণ ইন্টারকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
এনরিকের রেকর্ডে একমাত্র দাগ আসে কিছু সপ্তাহ পর ক্লাব বিশ্বকাপে। সেখানে চেলসির কাছে ৩-০ গোলে হারতে হয় পিএসজিকে। তবে সেই পরাজয়ও এসেছিল এক ক্লান্তিকর মৌসুমের শেষে, যখন সব প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল দলটি।
বরং সেই হার যেন এনরিকের ব্যক্তিত্বকে আরও বাস্তব করে তোলে। কারণ এই মৌসুমে তিনি আবারও একই দলকে নতুন শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন, যে দলটিকে শীতের মাঝামাঝি সময় ক্লান্ত ও নিস্তেজ মনে হচ্ছিল।
এবার আবারও আরেকটি ফাইনাল সামনে। এনরিকে সাংবাদিকদের বলেছেন, বল ছাড়া বিশ্বের সেরা দল আর্সেনাল। আর নিজের খেলোয়াড়দের বলেছেন, বল নিয়ে বিশ্বের সেরা দল তারাই।
পিএসজি সাধারণত ম্যাচে বলের দখল নিজেদের কাছেই রাখে। তবে তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক সম্ভবত ট্রানজিশন। মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে উঠে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা আছে তাদের।
আর্সেনালের জন্য তাই এই ম্যাচ শুধু কৌশলগত নয়, মানসিক পরীক্ষাও। কারণ তাদের সামনে এমন এক দল, যারা লুইস এনরিকের অধীনে ফাইনালকে প্রায় নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করেছে।
আর গত এক দশক ধরে একটি সত্য বারবার ফিরে এসেছে, দল বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, ফুটবলের ধরন বদলেছে; কিন্তু লুইস এনরিকে যখন কোনো এক ম্যাচের ক্লাব ফাইনালে পৌঁছান, তখন সাধারণত ট্রফিটাও তার হাতেই ওঠে।