সীমানা ছাড়িয়ে নতুন দিগন্ত

দীর্ঘ অনেক বছর ধরে বাংলাদেশে ক্রিকেটের সঙ্গে নারীদের সম্পর্ক ছিল কেবল মাঠের খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে সম্প্রতি একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে। নারীরা এখন আম্পায়ারিং বা ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে তাদের অবদান মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর যেতে পারে।

এই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে ২০২২ সালের শেষের দিকে, যখন দেশে নারী আম্পায়ারদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই আন্দোলনের মূলে রয়েছেন সাথিরা জাকির জেসি। তাকে বাংলাদেশে নারী আম্পায়ারিংয়ের পথপ্রদর্শক বলা হয়। সাবেক এই ক্রিকেটার এমন এক সময়ে আম্পায়ারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যখন খুব কম নারীই একে ক্যারিয়ার হিসেবে ভাবতেন।

তার উন্নতি হয়েছে চোখের পলকে। জেসি ইতোমধ্যে আইসিসি নারী বিশ্বকাপ, আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং এশিয়া কাপের মতো বড় বড় টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিং করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি পুরুষদের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ম্যাচেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রথম বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

জেসি মনে করেন, ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্তদের জন্য আম্পায়ারিং এক দারুণ সুযোগ। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি নারী আম্পায়ারিং খুব সম্মানজনক একটি পেশা। সত্যি বলতে, এটি খেলার চেয়েও ভালো। কারণ খেলোয়াড় হিসেবে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত খেলা যায়, কিন্তু আম্পায়ারিংয়ে অভিজ্ঞতা যত বাড়ে, আপনার গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পায়।'

তিনি আরও জানান যে, এই পেশায় টিকে থাকতে হলে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। জেসি বলেন, 'প্রথমত, আপনাকে মানসিকভাবে খুব শক্ত হতে হবে। পুরুষ বা নারী—যেকোনো ম্যাচ পরিচালনার জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। আপনি যদি দুর্বল হন বা আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে, তবে এখানে ভালো করা সম্ভব নয়।'

পাশাপাশি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তিনি তুলে ধরেন। তিনি যোগ করেন, 'শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা খুব জরুরি, বিশেষ করে ইংরেজিতে দখল। কারণ ক্রিকেটের সব নিয়মকানুন এবং শর্তাবলি ইংরেজিতে লেখা থাকে।'

জেসি-র এই সাফল্য দেখে এখন অন্য নারী ক্রিকেটাররাও অবসর নেওয়ার পর আম্পায়ারিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে ভাবছেন। জাতীয় দলের ক্রিকেটার শারমিন আক্তার সুপ্তা এবং রুমানা আহমেদের মতো তারকারা ইতোমধ্যে আম্পায়ারিং কোর্স শেষ করেছেন। আরও অনেকেই এখন এই পথে আসার কথা ভাবছেন।

এই পথে সফলভাবে এগিয়ে চলছেন মিশু চৌধুরীও। তিনি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিং করেছেন। তিনি মনে করেন, যারা আগে ক্রিকেট খেলেছেন, তাদের জন্য আম্পায়ার হওয়া অনেক সহজ। কারণ তারা খেলার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্রুত বুঝতে পারেন।

এই নতুন পথ তৈরিতে বিসিবি-র (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) ভূমিকাও অনেক। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ২০২৫ সাল থেকে চারজন নারী আম্পায়ারকে নিয়মিত বেতনের আওতায় এনেছে বিসিবি।

বিসিবির আম্পায়ারস কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার রহমান মিঠু জানান, তাদের এই উদ্যোগ কাজে দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমরা তিন বছর আগে তাদের সুযোগ দিয়েছিলাম। আর এখন তারা বিশ্বকাপ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করছেন।'

প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আম্পায়ারিং এখন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে ক্রিকেটে তাদের ভূমিকা কেবল ব্যাটে-বলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এখন সীমানা ছাড়িয়ে নতুন দিগন্তে পৌঁছেছে।