ক্রীড়াসুলভ মনোভাব কি আদতে সালমান দেখিয়েছিলেন?

একুশ তাপাদার
একুশ তাপাদার

ক্রিকেটে নিয়ম মেনে কোনো আউট হওয়ার পরও যখন একদল শোরগোল তোলেন—‘ক্রীড়া চেতনা লঙ্ঘিত হয়েছে’, তখন প্রশ্ন জাগে, ক্রীড়া চেতনার সংজ্ঞা আসলে কী? ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ নিয়ে আবেগপ্রবণ বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ–পাকিস্তান দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সালমান আলি আঘার আউটকে ঘিরে সেই পুরনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে সবকিছুর সঙ্গে ‘চেতনা’র প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে নিয়মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কতটা যৌক্তিক?

আসলে ক্রীড়া চেতনার মূল ভিত্তি প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা, নিয়ম মেনে খেলা এবং পরাজয়কে মার্জিতভাবে মেনে নেওয়া। বাংলাদেশের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ওই মুহূর্তে কেবল ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত নিয়মের মধ্যেই ছিলেন। অন্যদিকে, নিয়ম অনুযায়ী আউট হয়েও মেজাজ হারিয়ে ক্ষিপ্ত হওয়া এবং অশোভন আচরণ করাটা বরং খেলোয়াড়সুলভ আচরণের পরিপন্থী। ঘটনাটির পর সালমানকে হেলমেট ছুঁড়ে ফেলা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা দেখাননি আসলে কে?

এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ওপেনার লিটন দাস দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্রথমত, কেউ এখানে চ্যারিটি লিগ খেলতে আসেনি—এটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। যেহেতু নিয়মে আউট আছে, আমি কোনো দিক থেকেই দেখি না যে এখানে স্পোর্টসম্যানশিপ নষ্ট হয়েছে। যে যার ব্যক্তিগত মতামত দিতেই পারেন। খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের কাছে আউট তো আউটই।’

লিটনের এই সোজাসাপ্টা কথাই পেশাদার ক্রিকেটের বাস্তবতা তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিটি রান ও প্রতিটি উইকেট মূল্যবান। সেখানে নিয়মের মধ্যে থেকে সুযোগ নেওয়াকে অপরাধ বলা যায় না।

বাংলাদেশের স্পিন বোলিং কোচ এবং সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার মুশতাক আহমেদও এতে মিরাজের কোনো ভুল দেখেননি। তার মতে, ‘মিরাজের জন্য বলটি তুলে রানআউটের চেষ্টা করা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, কারণ ব্যাটার তখন ক্রিজের বাইরে ছিলেন।’

নিয়ম অনুযায়ী তিনি আউট—এটি অস্বীকার করেননি সালমানও। তবে মিরাজের জায়গায় থাকলে তিনি ভিন্নভাবে ভাবতেন বলে জানান। তার ভাষায়, ‘দেখুন, এটি নিয়মের মধ্যেই আছে। আমি সব সময় নিয়ম মেনে চলতে চাই। কিন্তু যখন খেলোয়াড়ি মনোভাবের প্রশ্ন আসে, তখন আমার মনে হয় সেটিকে আরও উপরে রাখা উচিত। আপনি যদি আমার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চান, আমি ভিন্নভাবে কাজ করতাম।’

যদিও সালমানেরই পূর্বসূরি রশিদ লতিফ ২০০৩ সালে মাটি থেকে ক্যাচ তুলে আম্পায়ারের চোখ ফাঁকি দিয়ে আলোক কাপালিকে আউট করেছিলেন। পরে ওই ঘটনার জন্য তাকে শাস্তিও পেতে হয়েছিল।

সালমানের রানআউটের ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তানের ইনিংসের ৩৯তম ওভারে। মিরাজের বল ফ্লিক করে সোজা মেরেছিলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। বলটি ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে মিরাজ দেখেন সালমান ক্রিজ ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছেন। সালমানের সঙ্গে মৃদ্যু সংঘর্ষের ফাঁকেও তিনি পা দিয়ে বলটি থামিয়ে দেন, পরে সেটা কুড়িয়ে দ্রুত স্টাম্পে ছুড়ে মারেন। সালমান তখন ক্রিজের বাইরে ছিলেন এবং সক্রিয় বলটি হাত দিয়ে ধরতে চেয়েছিলেন—(যা ধরলেও ‘অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ড’ নিয়মে আউট হতেন)। আম্পায়ার নিয়ম মেনেই আউটের সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু সালমান সেটি সহজভাবে নিতে পারেননি, তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। নিজের ইকুইপমেন্ট ছুঁড়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে থাকেন। 

ক্রিকেটে ‘স্পিরিট’ নিয়ে এই বিতর্কের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৪৭ সালে ভিনু মানকড় যখন অস্ট্রেলিয়ার বিল ব্রাউনকে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে রানআউট করেছিলেন, তখন থেকেই এই আলোচনা শুরু। কিন্তু পরে এমসিসি স্পষ্ট করে দেয়—এটি খেলার চেতনার পরিপন্থী নয়; এটি কেবল একটি সাধারণ বৈধ রানআউট। একজন ব্যাটার যদি বোলার বল ছাড়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে চান, তবে সেটিও কি পরোক্ষভাবে ক্রীড়া চেতনার পরিপন্থী নয়?

পরিস্থিতি যদি এমন হতো যে সালমান পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন বা মিরাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ভারসাম্য হারিয়েছেন, তাহলে তাকে আউট না করাটা হতে পারত মহানুভবতার পরিচয়। কিন্তু তখন তিনি সুস্থ ও সচল ছিলেন। মিরাজ বল আটকাতে না পারলে তিনি রান নেওয়ার চেষ্টা করতেন, সংবাদ সম্মেলনে তিনি সেটি অস্বীকার করলেও ক্রিকেটে নন-স্ট্রাইকারদের এই কৌশলী সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়।

সালমান হয়তো মুহূর্তের অসতর্কতায় বা 'ব্রেইন ফেইড'-এর কারণে ক্রিজে ফিরতে ভুলে গিয়েছিলেন। ক্রিকেটে এমন ভুলের উদাহরণ আরও আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজহার আলির সেই বিখ্যাত রানআউটের কথা মনে করা যেতে পারে, যেখানে তিনি বাউন্ডারি হয়েছে ভেবে ক্রিজের মাঝপথে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন। চতুর অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ডাররা সেই সুযোগে তাকে রানআউট করে দেন। এসব ক্ষেত্রে ব্যাটারের নিজস্ব অসতর্কতাই দায়ী। নিজের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে ‘ক্রীড়া চেতনা’র ধোয়া তোলা তাই কতটা যৌক্তিক? 

একসময় ক্রিকেটে এত প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না। অনেক সিদ্ধান্ত দুই দলের খেলোয়াড়দের সমঝোতার ভিত্তিতে মীমাংসা হয়ে যেত। কিন্তু আজকের যুগে সেই প্রয়োজনীয়তা আর নেই। তাই ‘ক্রীড়া চেতনা’ কোন ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এবং কোথায় নয়—সেটি নতুন করে ভাবার সময় হয়তো এসেছে।