রাষ্ট্র পরিচালনায় জনসংযোগ ঘাটতি: নীতির সঙ্গে বয়ানও কেন গুরুত্বপূর্ণ
সম্প্রতি অন্তত দুটি আলোচিত ঘটনায় সরকারের জনসংযোগ ও সংকটকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি অতি স্পষ্ট হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ পরে সংশ্লিষ্ট পোস্ট বা বক্তব্য সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ততক্ষণে জনমনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এর একটি হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি পোস্ট, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ পোস্টটিকে সতর্কতামূলক বার্তা হিসেবে না দেখে বরং হুমকি হিসেবে নিয়েছেন। ফলে প্রশাসনিক সতর্কবার্তাটি খুব দ্রুতই জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
অপরটি জুলাই সংক্রান্ত একটি প্রামাণ্যচিত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। সেটিও সরকারি জনসংযোগ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতাকে সামনে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। একই বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন বা পরস্পরবিরোধী বার্তা আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এতে শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হয়নি, বরং সরকারের সামগ্রিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখানেই ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। কোনো সংকটের মুহূর্তে মানুষের কাছে প্রথম যে বার্তাটি পৌঁছায়, সেটিই অনেক সময় পুরো পরিস্থিতি বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। পরে দেওয়া ব্যাখ্যা বা সংশোধন ক্ষতি কিছুটা কমাতে পারলেও শুরুতেই তৈরি হওয়া আস্থার সংকট সবসময় পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না।
একই ধরনের সমস্যা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ইস্যুতেও দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার একই বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। যোগাযোগের ভাষায় এটিই মেসেজ ডিসিপ্লিনের ঘাটতি।
একটি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যদি একই ঘটনা বা নীতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে সরকারের অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে যায়। আর সেই অস্পষ্টতা ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলে। সেজন্যই রাষ্ট্র পরিচালনায় জনসংযোগ বা যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব। একটি নীতি কতটা কার্যকর, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি সেই নীতির উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাব জনগণের কাছে কীভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন এখন সরকার, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়। সেই সিদ্ধান্তের ভাষা, সময়, প্রেক্ষাপট ও উপস্থাপনার ধরনও মানুষের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
অনেক সময় একটি ভালো নীতিও দুর্বল যোগাযোগ কৌশলের কারণে মানুষের কাছে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। আবার একটি জটিল সিদ্ধান্তও সঠিক ভাষা ও যথাযথ তথ্যের মাধ্যমে মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। অর্থাৎ নীতি প্রণয়ন ও নীতির যোগাযোগ একে অপরের থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়। বরং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় দুটিকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হয়।
এই বাস্তবতার কারণেই বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব বাড়ছে। করপোরেট হাউজ, বহুজাতিক কোম্পানি, এসএমই, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, রাজনৈতিক সংগঠন ও কূটনৈতিক মিশনগুলো এখন জনসংযোগ ও কৌশলগত যোগাযোগে বিশেষজ্ঞদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ পেশায় কর্মসংস্থান প্রায় ৬ শতাংশ বাড়তে পারে, যা অনেক পেশার গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত। একইভাবে লিংকডইনের বৈশ্বিক চাকরির প্রবণতাতেও স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্সের মতো দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে।
তবে এই কাজ কেবল প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা বা সংবাদমাধ্যমে তথ্য পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন দক্ষ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞকে জনমত বিশ্লেষণ করতে হয়, বিভিন্ন অংশীজনের মনোভাব বুঝতে হয়, সম্ভাব্য সংকট আগে থেকে শনাক্ত করতে হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর বয়ান তৈরি করতে হয়। কোথাও প্রচলিত ভুল ধারণা ভেঙে দিতে হয়, কোথাও পাল্টা যুক্তি তৈরি করতে হয়। একইসঙ্গে মিডিয়া রিলেশন, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, বিজনেস টু বিজনেস বা বিটুবি, বিজনেস টু গভর্নমেন্ট বা বিটুজি, ক্রাইসিস কমিউনিকেশন ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের মতো ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতেও এই পরিবর্তন এখন স্পষ্ট। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন, করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এবং পাবলিক রিলেশনস বিভাগকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন, পাবলিক রিলেশনস, করপোরেট কমিউনিকেশন এবং ডিজিটাল মিডিয়ার ওপর বিভিন্ন একাডেমিক ও পেশাগত কোর্স চালু হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এখনো এই পেশাদার কাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। ফলে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রায়ই কমিউনিকেশন ঘাটতি চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও জনগণের কাছে সেটা সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারলে মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল রাষ্ট্রগুলো অবশ্য অনেক আগেই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝেছে। যুক্তরাজ্যের গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশন সার্ভিস (জিসিএস) বিশ্বের অন্যতম সুসংগঠিত সরকারি যোগাযোগ কাঠামো হিসেবে পরিচিত। সেখানে পেশাদার কমিউনিকেশন কর্মকর্তারা নীতি প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই যুক্ত থাকেন। ক্রাইসিস কমিউনিকেশন, আচরণগত বিশ্লেষণ, ডিজিটাল প্রচার ও জনমত মূল্যায়নের জন্যও বিশেষজ্ঞ দল কাজ করে।
সিঙ্গাপুরের সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও একইভাবে সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ফলে, সেখানে শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, নীতির উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তাও জনগণের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও এখন সরকারি যোগাযোগকে কেবল তথ্য প্রকাশের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কৌশলগত সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রশিক্ষিত স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন টিম, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত মেসেজিং ব্যবস্থা, জনমত বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মনিটরিং এবং সংকটকালীন যোগাযোগের সুস্পষ্ট প্রটোকল থাকা জরুরি। একইসঙ্গে বড় জাতীয় ইস্যুতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত বার্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেননা, ভালো নীতি একটি সরকারের সক্ষমতার পরিচয় দেয়, কিন্তু সেই নীতিকে মানুষের কাছে বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলাও বড় দায়িত্ব। জনগণ যদি কোনো সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য বুঝতেই না পারে, তাহলে একটি ভালো উদ্যোগও ভুল ব্যাখ্যা, বিভ্রান্তি বা বিতর্কের কারণে কাঙ্ক্ষিত গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।
সাজ্জাদ সাব্বির: কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি); করপোরেট কমিউনিকেশনসে কর্মরত।