যেভাবে তথ্য সুরক্ষিত করেও ব্যাংকিং কাজ সহজ করবে এআই

রকিবুল হাসান
রকিবুল হাসান

এআই থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে কারা? এন্টারপ্রাইজ আর ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউট, বিশেষ করে ব্যাংকগুলো। কারণ, তাদের কাছে আছে বিশাল তথ্যভাণ্ডার, একই ধরনের কাজ বারবার করার প্রক্রিয়া আর কমপ্লায়েন্সের চাপ। এআই বসালে এসব কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।

কিন্তু এখানেই ঝামেলা দেখা দিচ্ছে। সেটা হচ্ছে নিরাপত্তায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ক্লাউডবেজড প্লাটফর্ম যেমন-তেমনভাবে ব্যবহার করা যায় না। গ্রাহকের ডেটা বাইরে যাবে—এটা মেনে নেওয়া কঠিন। তাই ব্যাংকগুলো চাইলেও ওপেনএআই বা ক্লডের মতো ক্লাউড সার্ভিস সরাসরি কোর সিস্টেমের সঙ্গে জুড়তে পারে না।

এর মধ্যে আবার নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে এমসিপি। এমসিপি মানে এআই মডেলকে বাইরের টুল আর ডেটার সঙ্গে সংযুক্ত করার একটা প্রোটোকল। সমস্যা হলো, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমগুলোর মধ্যে ইন্টার কানেক্টেড সলিউশন ব্যবহার করার এমসিপি সার্ভারগুলো থাকে প্রাইভেট নেটওয়ার্কের ভেতরে। এগুলোকে ইন্টারনেটে এক্সপোজ করা মানেই বিপদ ডেকে আনা।

এই সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশের না, পুরো বিশ্বই একই জিনিসে আটকে আছে। সম্প্রতি ওপেনএআই এই সমস্যার একটা সমাধান নিয়ে এসেছে। নাম দিয়েছে ‘সিকিউর এমসিপি টানেল’।

আইডিয়াটা সহজ। সাধারণত প্রাইভেট সার্ভিস পাবলিক করতে হলে তিনটা রাস্তা থাকে। পাবলিক এন্ডপয়েন্ট খুলে দেওয়া, থার্ড পার্টি টানেল ব্যবহার করা, অথবা ভিপিএন দিয়ে নেটওয়ার্ক জুড়ে দেওয়া। তিনটাতেই ঝুঁকি আছে। পাবলিক এন্ডপয়েন্ট মানে ঘরের সদর দরজা খোলা রাখা। থার্ড পার্টি টানেল মানে আরেকটা ভেন্ডরকে বিশ্বাস করা। ভিপিএন মানে দরকারের চেয়ে বেশি অ্যাক্সেস দিয়ে ফেলা।

ওপেনএআই এখানে উল্টো পথে হেঁটেছে। ওরা বলছে, প্রাইভেট সার্ভারকে বাইরে আনতে হবে না। বরং একটা ছোট্ট ক্লায়েন্ট প্রোগ্রাম কাস্টমারের নিজের নেটওয়ার্কের ভেতরে বসিয়ে দাও। সেই ক্লায়েন্ট নিজেই আউটবাউন্ড কানেকশন খুলে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। মানে দরজা ভেতর থেকে খোলা হচ্ছে ঠিকই, তবে বাইরে থেকে না।

এই মডেলটা ব্যাংকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে নেটওয়ার্কের সিকিউরিটি বাউন্ডারি ভাঙতে হবে না। কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, কাস্টমার ডেটাবেস এসব এখনো ভেতরেই থাকবে। শুধু একটা ছোট ক্লায়েন্ট দিয়ে দরকার মতো রিকোয়েস্ট পাস হবে। আর ক্লায়েন্টটা ওপেন সোর্স। মানে সিকিউরিটি টিম চাইলে কোডটা চেক করে দেখতে পারবে, কোন ডেটা কোথায় যাচ্ছে।

আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য এটা একটা মডেল হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেশন মেনেও এআই ব্যবহার করা সম্ভব, যদি এরকম আর্কিটেকচার ফলো করা হয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক এই ধরনের টেকনিক্যাল সলিউশনকে কতটা বুঝবেন, আর কতটা দ্রুত সেগুলো গ্রহণ করতে সাহায্য করবেন।

আসলে এআই ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধা টেকনোলজি না, বরং সনাতন বিশ্বাস আর নিয়মকানুন। প্রযুক্তি অনেক আগেই প্রস্তুত। আমরা শুধু নিয়মের মধ্যে সেগুলোকে গুছিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় আছি।


রকিবুল হাসান: টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক