ডিজিটাল আসক্তির ফাঁদে যুবসমাজ: সংকট, বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ

মো. তরিকুল ইসলাম
মো. তরিকুল ইসলাম

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি অদৃশ্য এক সংকটও তৈরি করেছে—ডিজিটাল আসক্তি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই আসক্তির সবচেয়ে বড় শিকার। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম—এসব এখন আর শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং অনেকের কাছে এগুলো হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ইন্টারনেটে থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনলাইন নির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবারে বসে থেকেও যেন সবাই আলাদা এক জগতে বন্দি।

ডিজিটাল আসক্তির অন্যতম বড় সমস্যা হলো সময়ের অপচয়। একজন শিক্ষার্থী দিনে ৫-৬ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করলে তার পড়াশোনা, শারীরিক ব্যায়াম এবং সৃজনশীল কাজের জন্য সময় কমে যায়। ফলে তার সামগ্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শুধু তাই নয়, অনলাইন গেম বা শর্ট ভিডিও কনটেন্টের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি একজন তরুণকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনের ‘সাজানো’ সাফল্য দেখে অনেক তরুণ নিজেদেরকে পিছিয়ে মনে করে। এতে করে তৈরি হয় হতাশা, উদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট। অনেক ক্ষেত্রে এই চাপ আত্মঘাতী প্রবণতাও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।

ডিজিটাল আসক্তির পেছনে কিছু কাঠামোগত কারণও রয়েছে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো না হওয়া এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক অভিভাবক নিজেরাই প্রযুক্তিতে আসক্ত হওয়ায় সন্তানদের জন্য সঠিক উদাহরণ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে এবং তা শুরু করতে হবে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র তিন স্তর থেকেই।

প্রথমত, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি জরুরি। তরুণদের বুঝতে হবে যে প্রযুক্তি একটি টুল, জীবনের বিকল্প নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করা, নিয়মিত বই পড়া, খেলাধুলা ও বাস্তব সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা এবং তাদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকা। শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বিকল্প বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যেমন: খেলাধুলা, ভ্রমণ, পারিবারিক সময় ইত্যাদি। পরিবার যদি সচেতন হয়, তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। স্কুল-কলেজে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বিষয়ে আলাদা পাঠ্যক্রম চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কিভাবে প্রযুক্তিকে জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে সময় ব্যবস্থাপনা করতে হয়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শিশু ও কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সময়সীমা নির্ধারণে সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে, যাতে আসক্ত তরুণরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারে।

সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়, কিন্তু এর অপব্যবহার সবচেয়ে বড় সমস্যা। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ভারসাম্যহীন সমাজে বড় হবে, যেখানে মানবিকতা, সম্পর্ক এবং বাস্তবতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।

তাই সময় এসেছে থেমে ভাবার—আমরা কি স্ক্রিনের দাস হয়ে যাচ্ছি, নাকি এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ আছে? সঠিক সিদ্ধান্ত আজই নিতে হবে, কারণ আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের বর্তমান সচেতনতার উপর।


মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mtislam.ca@gmail.com