জামিনের পরও ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ অতীতের মতোই আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করছে

David Bergman
ডেভিড বার্গম্যান

নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন কীভাবে হবে?’ তার উত্তর ছিল সরল, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে।’

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীত্বের এক মাস না যেতেই আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ মামলার ওপর সরকারের অব্যাহত নির্ভরতা ইঙ্গিত দেয়, তারেক রহমানের কথাগুলো কেবল কথা হয়েই রয়ে গেছে। এ ধরনের আটকাদেশের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার আইনের শাসনের বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

সরকার যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলতে পারে এবং বলছেও যে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অবিচারের সমাধান করতে তাদের সময় প্রয়োজন। কিন্তু নতুন করে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং এর তীব্র সমালোচনা হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে আইন একেবারেই স্পষ্ট। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(এ) ধারা অনুযায়ী, ইতোমধ্যে অন্য মামলায় আটক থাকা কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবশ্যই মামলার ডায়েরি পর্যালোচনা করে এবং শুনানির সুযোগ দিয়ে ‘যৌক্তিক কারণ’ সন্তোষজনক মনে হলে তবেই অনুমোদন দেবেন।

অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি এই বিধানটি যুক্ত করেছে এবং এর উদ্দেশ্যই ছিল ‘শোন অ্যারেস্ট’ মামলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পথ বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে সেটা প্রায় কখনোই প্রয়োগ করা হয় না। হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জামিনের পর ‘শোন অ্যারেস্ট’ মামলাগুলোর কোনো প্রমাণিক ভিত্তি দেখা যায় না। এগুলো মূলত উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও যেন কেউ মুক্তি না পায়, সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। ফলে তাদের ইচ্ছামতো ও বেআইনিভাবে আটকে রাখা সম্ভব হয়। এর ফলে জামিন কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপট বোঝাতে ১১ মার্চের ঘটনাটি সহজ উদাহরণ হতে পারে। হাইকোর্ট সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলায় চূড়ান্ত জামিন দেন। কিন্তু তারপরও তার মুক্তির প্রক্রিয়া থমকে যায়। কারণ, পুলিশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আরেকটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। অথচ, সেই মামলার মূল এফআইআরেও তার নাম ছিল না। বিষয়টি পুরোপুরি মনগড়া অভিযোগ বলেই মনে হয়েছে।

কোনো স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। বরং সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক স্তর থেকে আসারই সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। হতে পারে সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতর থেকেই।

বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রশাসনিক কাঠামোয় গ্রেপ্তারকৃত হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের বিষয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ছাড়া নেওয়া হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা সাধারণত নির্বাহী বিভাগের ইশারা বা সরাসরি নির্দেশনায় কাজ করেন।

প্রশ্ন হলো, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে কী বলবেন? তিনি নিজেও একসময় বেআইনি আটক ও গুমের শিকার হয়েছেন। তাহলে কি এখন তার অধীনেও এমন বেআইনি আটক হতে দেবেন?

সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে ফৌজদারি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু পুলিশের এমন উদ্যোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরবতা ঠিক উল্টো বার্তাই দেয়।

এক্ষেত্রে আশা করা যেতে পারে যে পুলিশ যদি প্রমাণ ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আইনের অপব্যবহার করতে চায়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে হস্তক্ষেপ করবেন এবং এই ধরনের গ্রেপ্তারের অনুমোদন দেবেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।

নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর সাম্প্রতিক ঘটনাই এর একটি উদাহরণ। সম্প্রতি তিনি পাঁচটি মামলায় জামিন পান। কিন্তু পুলিশের আবেদনের পর তাকে আবারও অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেটাও স্পষ্টতই মনগড়া বলে মনে হয়েছে। বিষয়টি যখন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আসে, তখন আদালত কি স্বাধীনভাবে তা যাচাই করেছে যে আবেদনটি ‘যৌক্তিক’ কি না? না।

এই ধারা বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। ম্যাজিস্ট্রেটরা আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তারা প্রায়শই স্বাধীন বিচারিক ভূমিকায় নয়, বরং নির্বাহী বিভাগের একটি অংশ হিসেবে কাজ করেন। এখন দেখতে হবে, খায়রুল হকের মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কী সিদ্ধান্ত দেন। আশাবাদী মনে হলেও এখনো প্রত্যাশা করা যায় যে আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

কিন্তু বিষয়টি কেবল প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত না। কেননা, প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করার অধিকার রয়েছে।

তবে সেটা করতে হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকেও এগিয়ে আসতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে। বিচারকদের আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়—সরকারের তরফে স্পষ্টভাবে এমন বার্তা না এলে ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাহী বিভাগের প্রতি নির্ভরশীলই থেকে যাবেন। সরকারকে বলতে হবে যে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী বিভাগের ‘রাবার স্ট্যাম্প’ না, বরং স্বাধীন বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।

এ কারণেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বিচারিক আচরণ দীর্ঘদিন ধরে নির্বাহী বিভাগের ইশারায় প্রভাবিত হয়েছে। পুলিশের মতোই ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকরাও প্রায়ই সরাসরি রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী অথবা সরকারের ইশারার ভিত্তিতে কাজ করেন।

যদি ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রমাণ ছাড়া ‘শোন অ্যারেস্ট’ আবেদনের অনুমোদন দিতে থাকেন, তাহলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হবে না যে সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে ফৌজদারি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার মেনে নিচ্ছে, এমনকি উৎসাহ দিচ্ছে। দীর্ঘদিন মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এবং এর নির্বাহী কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করা আসাদুজ্জামানের মতো ব্যক্তির সবচেয়ে ভালো বোঝা উচিত যে আইনের শাসনের জন্য এমন চর্চা কতটা বিপজ্জনক।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে অনেকেই আছেন যারা আইনের শাসন বা যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে খুব একটা ভাবেন না। তাদের কাছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সবাই আটক, দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তাতে তারা প্রকৃত অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকুক আর না থাকুক। এমন দাবি যারা করেন তাদের অনেকেই তুলনামূলক তরুণ এবং ন্যায্য বিচারব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়। তাদের কাছে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে যায় এমন প্রায় সব কাজই অপরাধ বলে মনে হয়। যদি সেই সরকারের পক্ষে কিছু নাও করে থাকে, তারপরও দলের সমর্থন করার কারণেও যেকোনো অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হলেই তারা সন্তুষ্ট।

এই মানসিকতা শুধু স্বৈরাচারী শাসনামলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তী সময়েও সেটা প্রায়শই দেখা গেছে। পরিবর্তিত সময়ে জবাবদিহির জন্য জনমতের প্রবল দাবি তৈরি হলেও তা সহজেই সমষ্টিগত শাস্তির দিকে গড়াতে পারে—যা বর্তমানে দেশে ঘটছে বলেই মনে হচ্ছে। এই মানসিকতা যদি চলতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ আবারও সেই একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধাঁচে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরগুলোতে দেখা যেতো।

তাছাড়া, জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া শুধু মনগড়া, হয়রানিমূলক ও বেআইনি কাজই নয়, শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর অসম্মানও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও ন্যায়সঙ্গত বিচারের ভিত্তিতে প্রকৃত ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারী। তাদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করলে তাদের আত্মদান বিফলে যাবে এবং জবাবদিহির প্রত্যাশাকে আরেকটি অন্যায্যতার চক্রে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হবে।

 

বহু বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন ডেভিড বার্গম্যান। এক্সে তার হ্যান্ডল @TheDavidBergman