বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বিভাজনে ইকোচেম্বারের প্রভাব
ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদির মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধান লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর ভিউ, লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার বাড়ানো। এ জন্য প্ল্যাটফর্মকে জানতে হয় ব্যবহারকারী কোন ধরনের লেখা, ভিডিও বা মতামত পছন্দ করেন। প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং ইতিহাস, তার বন্ধু তালিকা, তিনি কাকে ফলো করেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তার আগ্রহের প্রকৃতি নির্ধারণ করে।
ব্যবহারকারীর রুচি ও আগ্রহ শনাক্ত করার পর প্ল্যাটফর্মটি তাকে বারবার এমন কনটেন্ট দেখায়, যা তার পছন্দের সঙ্গে মেলে এবং তার বিদ্যমান বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে।
একইসঙ্গে অনুরূপ চিন্তা ও রুচিসম্পন্ন মানুষদের ফলো করা বা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। এর ফলে ব্যবহারকারী ধীরে ধীরে এক ধরনের তথ্য-প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যেখানে ভিন্নমতের কোনো তথ্য আর তার কাছে পৌঁছায় না। প্রযুক্তিগত ভাষায় এই পরিস্থিতিকেই ‘ইকোচেম্বার’ বলা হয়।
এই অবস্থায় ব্যক্তি নিজের মতাদর্শকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে। ফলে ভিন্নমত গ্রহণ বা সহ্য করার সক্ষমতা ক্রমশ কমে যায়। কারণ, ইকোচেম্বারের দেয়াল ভেদ করে বিরোধী মতামত তার কাছে আর পৌঁছায় না। যদি কখনও কোনো ভিন্নমত তার টাইমলাইনে এসেও পড়ে, তখন তিনি তা বিরক্তি বা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইকোচেম্বারে নিমজ্জিত ব্যক্তির মধ্যে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও মতভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে।
মার্কিন লেখক ও প্রযুক্তি-সমালোচক এলি পেরিসার, বলেছেন, ইকোচেম্বারের অ্যালগোরিদম আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করে। আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের সাংস্কৃতিক বা মতাদর্শিক বুদবুদের ভেতরে আবদ্ধ হয়ে যাই।
তিনি সতর্ক করেছেন, অ্যালগোরিদম আমাদের দেখা দুনিয়াকে পরিবর্তন করছে। চিন্তা না করেই আমরা বিভাজনের দিকে এগোচ্ছি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় ইকোচেম্বারের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যুতে। জাতীয় নির্বাচন, কোটা আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল, কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক—প্রতিটি বিষয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত এমনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে যে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই ব্যক্তিকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘রাজাকার’, ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘নাস্তিক’ কিংবা ‘উগ্রবাদী’ তকমা দেওয়া হয়। ফলে যুক্তিনির্ভর আলোচনা দ্রুত ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ঘৃণার ভাষায় রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক ধর্মীয় উত্তেজনার ক্ষেত্রেও ইকোচেম্বারের ভূমিকা লক্ষ করা গেছে। ফেসবুকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর পোস্ট, বিকৃত স্ক্রিনশট কিংবা পুরোনো ঘটনার ছবি নতুন ঘটনার নামে প্রচার করে মুহূর্তের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ উসকে দেওয়া হয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীরা কেবল নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্যই শেয়ার করেছেন। তথ্যের সত্যতা যাচাই করার কোনো প্রচেষ্টা তাদের ছিল না।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুকের এনগেজমেন্ট-নির্ভর অ্যালগোরিদম মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ইথিওপিয়া ও ভারতে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষকে উল্লেখযোগ্যভাবে উসকে দিয়েছে। যার ফলে এসব দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা তীব্র হয়েছে। সমাজকে বিশৃঙ্খলার প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজনিত এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ইকোচেম্বার প্রভাব শিক্ষিত ও শহুরে শ্রেণীতেও সমানভাবে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী কিংবা সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যেও অনেক সময় দেখা যায়, তারা ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে নিজেদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক বলয়ের নিরাপদ গণ্ডির মধ্যেই অবস্থান করছেন।
ফলে সমাজে এমন এক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে সত্যের চেয়ে ‘আমাদের পক্ষের সত্য’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু মত প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং সামাজিক বিভাজন গভীর করার একটি শক্তিশালী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই বিভাজন পরিবার, বন্ধুত্ব, পেশাগত সম্পর্ক এমনকি বৈবাহিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। যা একটি সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
রাজনীতি ও ধর্মের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা অপরিহার্য। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ইকোচেম্বারের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা জরুরি। তা না হলে সামাজিক বিভাজন ক্রমেই গভীরতর হবে, যা যেকোনো দেশের জন্যই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ইকোচেম্বার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেই ব্যবহারকারী এই সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে।
এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের ২০১৮–২০২২ সালের একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইকোচেম্বার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্যবহারকারীদের অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্ককে সচেতনভাবে বহুমুখী করা অত্যন্ত জরুরি।
এ গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ব্যবহারকারীকে নিজের পরিচিত সামাজিক পরিসরের বাইরে থাকা মানুষদের অনুসরণ করতে হবে এবং ভিন্ন মতাদর্শ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে।
যেভাবে আমরা স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে একটি ব্যালান্সড ডায়েট তৈরি করি, তেমনই অনলাইনেও বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেমন: আন্তর্জাতিক সংবাদ, স্থানীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতধারার বক্তব্য।
কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মাধ্যমে তা যাচাই করা জরুরি। যাতে ভুয়া খবর ভাইরাল হয়ে সমাজের বড় ধরনের ক্ষতি করতে না পারে।
মূলধারার গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো, জনগণের সামনে তথ্য ও মতামতকে নিরপেক্ষ, বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা। যাতে সমাজে বিভাজন নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংলাপের পরিবেশ তৈরি হয়।
মতবিরোধকে শত্রুতা হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক ও সুস্থ বিতর্কের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে তুলে ধরাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক নীতি। পক্ষপাতদুষ্ট ও একচোখা সাংবাদিকতা কেবল পেশাগত নৈতিকতারই পরিপন্থী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
দেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা নিয়মিত টকশো করেন বা নিজস্ব পোর্টালে বক্তব্য প্রকাশ করেন, তাদের উচিত হবে দল, ব্যক্তি বা মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য এবং ভিউ–লাইক–শেয়ারের লোভ থেকে বিরত থাকা। সত্যকে নিরপেক্ষ, নির্মোহ ও সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করাই একজন বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায়িত্ব।
যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী বা প্ল্যাটফর্ম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ও ভুয়া তথ্য ছড়ায়, সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত আইনানুগ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেই বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি দেওয়া কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি, যেসব ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে সংগঠিতভাবে বিভ্রান্তিমূলক বা সমাজবিরোধী প্রোপাগান্ডা পরিচালিত হয়, সেসব ক্ষেত্রে সরকার সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে পারে।
একই সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি, ফ্যাক্ট–চেকিং উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।
ইকোচেম্বারে আটকে পড়া ব্যক্তি মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতার এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকেন। এই মানসিক বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হতে হলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে মিলিতভাবে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
সাইফুর রহমান, সার্টিফাইড প্রফেশনাল অস্ট্রেলিয়ান কম্পিউটার সোসাইটি, অস্ট্রেলিয়ান পাবলিক সার্ভিসে জ্যেষ্ঠ তথ্য প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কর্মরত