যেভাবে সাধারণ ছবি থেকে বিশ্বসেরা হলো ‘মোনালিসা’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম হিসেবে পরিচিত। এর রহস্যময় হাসি বা শৈল্পিক উৎকর্ষের কথা আজ সবার মুখে মুখে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি সবসময় এতটা জনপ্রিয় ছিল না।

শত বছর আগে ঘটে যাওয়া এক দুঃসাহসিক চুরিই এই সাধারণ পোর্ট্রেটটিকে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে এবং আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে।

চুরির সেই অভিনব ঘটনা

দিনটি ছিল ১৯১১ সালের ২০ আগস্ট, রোববার সন্ধ্যা। প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখন বেশ দুর্বল ছিল। ভিনসেঞ্জো পেরুজা নামের ২৯ বছর বয়সী একজন ইতালীয় হ্যান্ডিম্যান মিউজিয়ামের একটি সাপ্লাই ক্লোজেটে লুকিয়ে ছিলেন। মোনালিসাসহ মিউজিয়ামের অন্যান্য বিখ্যাত চিত্রকর্মের সুরক্ষায় কাঁচের বাক্স বসানোর কাজ করতেন তিনি। ফলে মিউজিয়ামের ভেতরের অনেক কিছুই তার নখদর্পণে ছিল।

চুরিতে অভিযুক্ত ভিনসেঞ্জো পেরুজা। ছবি: সংগৃহীত

পরের দিন সকালে মিউজিয়াম যখন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল, তখন পেরুজা তার সাদা কাজের পোশাক পরে বেরিয়ে আসেন। চারপাশের অবস্থা বুঝে তিনি মোনালিসাকে দেয়াল থেকে নামিয়ে নেন, সিঁড়ির কাছে গিয়ে এর ফ্রেমটি খুলে ফেলেন এবং কাঠের প্যানেলটি নিজের পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখেন।

পালানোর সময় একটি দরজা বন্ধ থাকায় তিনি কিছুটা বিপাকে পড়েন। কিন্তু একজন প্লাম্বার তাকে আটকে পড়া সহকর্মী ভেবে দরজাটি খুলে দেন। এরপর তিনি নির্বিঘ্নে মোনালিসাকে নিয়ে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে যান।

খোঁজ খোঁজ রব এবং পিকাসো যখন সন্দেহভাজন

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ল্যুভর কর্তৃপক্ষ টেরই পায়নি যে চিত্রকর্মটি চুরি গেছে। ছবি পরিষ্কার করা বা ছবি তোলার জন্য প্রায়ই চিত্রকর্ম দেয়াল থেকে নামানো হতো, তাই ফাঁকা দেয়াল দেখে কেউ মাথা ঘামায়নি। মঙ্গলবার দুপুরে লুই বেরো নামের একজন চিত্রকর ছবিটি স্কেচ করতে এসে দেখেন দেয়ালটি ফাঁকা।

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো। ছবি: সংগৃহীত

এরপরেই শুরু হয় হুলস্থুল। চুরির খবরটি সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয় এবং প্যারিসজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তদন্তের জন্য ৬০ জন গোয়েন্দাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। চুরির সন্দেহে বিখ্যাত ফরাসি কবি গিয়ম অ্যাপোলিনেয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার সূত্র ধরে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যদিও প্রমাণের অভাবে পরে তাদের দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

ফাঁকা দেয়াল দেখতেই মানুষের ঢল

এই চুরির ঘটনাটি সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা হতে থাকে। চুরির আগে মোনালিসা ল্যুভরের হাজার হাজার চিত্রকর্মের মধ্যে কেবলই একটি সাধারণ ছবি ছিল, দর্শনার্থীরা বেশিরভাগ সময় না দেখেই পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কিন্তু চুরির পর এটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। মানুষ শুধু সেই ফাঁকা দেয়ালটি দেখার জন্যই ল্যুভরের বাইরে লাইন ধরতে শুরু করে।

শিল্প ইতিহাসবিদ নোয়া চার্নির মতে, অন্য কোনো চিত্রকর্ম চুরি গেলে সেটিই হয়তো আজ বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম হতো।

উদ্ধার হওয়া মোনালিসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। ছবি: সংগৃহীত

চিত্রকর্ম উদ্ধার ও চোরের পরিণতি

প্রায় দুই বছর ধরে পেরুজা মোনালিসাকে তার প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টের একটি কাঠের ট্রাঙ্কে পুরোনো কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন। অবশেষে ১৯১৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্সের একজন আর্ট ডিলার আলফ্রেডো জেরির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ছবিটি বিক্রি করার চেষ্টা করেন।

পেরুজা দাবি করেছিলেন যে, নেপোলিয়ন ছবিটি ইতালি থেকে চুরি করেছিলেন এবং একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে ইতালির সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। যদিও আদালতে প্রসিকিউশন প্রমাণ করেছিল যে তিনি মূলত আর্থিক লাভের আশায় ছবিটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। শেষমেশ পেরুজাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে ৭ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ইতালির অনেক মানুষ তাকে জাতীয় বীর হিসেবেই সম্মান জানিয়েছিল।

বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'মোনালিসা'। ছবি: সংগৃহীত

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে মোনালিসা সগৌরবে ল্যুভরে ফিরে আসে। ফিরে আসার প্রথম দুইদিনেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ছবিটি দেখতে ভিড় করে। মূলত ভিনসেঞ্জো পেরুজার সেই দুঃসাহসিক চুরিই একটি সাধারণ মাস্টারপিসকে আজকের এই তুমুল জনপ্রিয় গ্লোবাল আইকনে রূপান্তরিত করেছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, এবিসি নিউজ, হিস্টোরি