৪ হাজার কোটি টাকার এক্সপ্রেসওয়ে, অথচ পুলিশের ডিউটি চলে তাঁবুর নিচে
লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা—চট্টগ্রাম মহানগরের মাথার ওপর দিয়ে সাড়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। অথচ চার হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জন্য নেই ন্যূনতম কোনো সুবিধা বা অবকাঠামো।
লোহার ফ্রেমের ওপর মোটা ত্রিপলের ছাউনি, তার নিচে কাঠের বেঞ্চ। চেকপোস্ট ও ওয়াশরুমের সুবিধা ছাড়াই অস্থায়ী এ তাঁবুর নিচে বসে প্রখর রোদ কিংবা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের।
চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বাস্তবতা এটিই। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উদ্বোধনের পর গাড়ির বেপরোয়া চলাচল, দুর্ঘটনা রোধ ও অপরাধমূলক কার্যক্রম ঠেকাতে এখানকার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বসানো হয় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, গত ছয় মাসে এখানকার কিছু পয়েন্টে ট্রাফিক ও থানা পুলিশের কয়েকটি দল মোতায়েন করা হয়েছে। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপরাধমূলক কার্যক্রম দমন করতে নিয়মমাফিক কমপক্ষে তিনটি—নিমতলা বিশ্বরোড, ফকিরহাট ও টাইগারপাস পয়েন্টে পুলিশ সদস্যরা ডিউটি করছেন।
প্রতিদিন যানবাহনের নিরাপত্তা ও তদারকির দায়িত্ব পালন করলেও তাদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী চেকপোস্ট, বিশ্রামাগার কিংবা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে আট ঘণ্টার রোটেশন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। এতে মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন এখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।
চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্টে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। তাই তিন দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বর্ধিত করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে মূল অংশে পরীক্ষামূলকভাবে গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে। আনুষ্ঠানিকভাবে টোল পরিশোধের মাধ্যমে গাড়ি চলাচল করছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে।
নিমতলা-বিশ্বরোড এলাকায় ডিউটিরত সার্জেন্ট তানবীর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রাস্তার ওপর অনেক গরম। এখানে কোনো টয়লেট সুবিধা নেই। প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে নিচে নেমে তারপর ফ্রেশ হতে হয়। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে ডিউটি করা লাগে। স্থায়ী চেকপোস্ট থাকলে জনগণকে আরও ভালোভাবে সেবা দিতে পারতাম আমরা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দর বিভাগের এক পুলিশ সার্জেন্ট বলেন, ‘রাতের বেলা ডিউটি করতে গেলে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। রোদ কিংবা প্রবল বৃষ্টিতে এখান থেকে নামার কোনো উপায় নেই। বিষয়গুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন, কিন্তু এগুলো নিয়ে তারা কথা বলতে চান না।’
‘টয়লেট সুবিধা নেই। এমনকি আপনি পানি খাবেন সেটিও নিচে নেমে অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে আনতে হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, তিন বছর মেয়াদি ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। দুই দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর এখন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
তবে এখনো ১০টি সংযোগ র্যাম চালু না করতে পারায় এর পুরোপুরি সুফল ভোগ করতে পারছেন না নগরবাসী। তবুও ত্রিপলের নিচে বসেই এখানকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বন্দর থানার সামনে নিমতলা-বিশ্বরোড এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে লালখান বাজারমুখী রাস্তায় অস্থায়ী তাঁবুতে দায়িত্ব পালন করছেন থানা ও ট্রাফিক পুলিশের ছয় সদস্য। এছাড়া ফকিরহাট পয়েন্টে পতেঙ্গামুখী রাস্তায় তাঁবুর নিচে ডিউটি করছেন আরও ছয়জন। টাইগারপাস এলাকায় দেখা গেছে আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যকে।
তীব্র গরমে সেখানে হাঁসফাঁস করছিলেন তারা।
যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি স্বীকার করেন সিএমপি বন্দর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) কবির আহমেদ।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জোনে দুইটি পয়েন্টে অস্থায়ীভাবে এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে এখনো কোনো চিঠি পাঠাইনি। একেকটি দল আট ঘণ্টা করে পয়েন্টগুলোতে দায়িত্ব পালন করছে।’
‘আপনি যে বিষয়টি নজরে এনেছেন, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ যোগ করেন ডিসি কবির।