আইসিইউ সংকটে চমেক হাসপাতাল, হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় অভিভাবক
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড এবং আইসিইউর সামনে এক মন খারাপ করা নীরবতা। ভেতরে হাম আক্রান্ত শিশু, বাইরে উদ্বিগ্ন স্বজনরা।
একটু পরপর চিকিৎসকরা যখন বাইরে এসে কোনো শিশুর অবস্থার অবনতির কথা জানাচ্ছেন, তখন পুরো করিডোর ভরে যায় স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর হাহাকারে।
তাদেরই একজন চট্টগ্রামের দুর্গম বাঁশখালী উপজেলা থেকে আসা দিনমজুর আবুল কালাম। তার এক বছর বয়সী মেয়ে তানহার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান চিকিৎসক। এ খবর শুনতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কালাম।
গতকাল বিকেলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, বেশ জ্বর নিয়ে এক সপ্তাহ আগে তানহাকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউতে বেড খালি না থাকায় সাধারণ ওয়ার্ডেই কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়।
‘তানহা আমার দুই মেয়ের মধ্যে ছোট। গরিব বলে সময়মতো মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারিনি। বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার নেই। যদি মেয়েটাকে একটু আগে আইসিইউতে নিতে পারতাম, তাহলে হয়তো তার অবস্থা এত খারাপ হতো না,’ বলেন কালাম।
পাশেই শিশু আইসিইউর বাইরে কাঁদছিলেন নাসিমা বেগম। ভেতরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল তার সাড়ে ৩ বছর বয়সী ভাগ্নি। তীব্র জ্বর নিয়ে সন্দ্বীপ থেকে তাকে আনা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেলে। গত এক সপ্তাহ ধরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
দুপুরে সাড়ে ১২টার দিকে নাসিমা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ডাক্তাররা এইমাত্র জানিয়েছেন মেয়েটির অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে।’
কিছুক্ষণ পর এক মাকে ছুটতে দেখা যায় তার ৩ মাস বয়সী ছেলে ফায়জানকে নিয়ে। জরুরি পরীক্ষার জন্য আইসিইউ থেকে রেডিওলজি ল্যাবের দিকে ছুটছিলেন তিনি। ফায়জান শ্বাস নিচ্ছিল পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডারের মাধ্যমে।
মা ইশরাত ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ওর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে রাউজান থেকে এসেছি। ডাক্তাররা কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন।’
ছেলেকে ট্রলিতে করে তাড়াহুড়ো করে চলে যান ইশরাত।
বেড সংকটের কারণে অনেক শিশুই পাচ্ছে না আইসিইউ সুবিধা। তার ওপর এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে আশপাশের জেলার রোগীরা।
নোয়াখালীর মাইজদী থেকে ১১ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে এসেছেন রিজিয়া বেগম। তিনি জানান, তার নাতি তানিমের ৩ দিন আগে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও এখনো বেড পাওয়া যায়নি।
রিজিয়া বলেন, ‘সাধারণ ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা তাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু ওর জন্য আইসিইউ বেড খুব দরকার।’
চমেক হাসপাতালে আইসিইউর বেড সংখ্যা ২০টি। কিন্তু হাম আক্রান্ত শিশুর জন্য সেখানে সংকুলান হচ্ছে না।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তাসলিম উদ্দিন ডেইলি স্টারকে জানান, হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘আইসিইউর ২০টি বেডের মধ্যে ১৫টিই হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। রোগীর চাপ সামলাতে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডও চালু করা হয়েছে।’
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মুসা মিয়া জানান, শুধু মঙ্গলবার হামের লক্ষণ নিয়ে এ ওয়ার্ডে ১২১ শিশু ভর্তি হয়েছে।
ভর্তি শিশুদের মধ্যে একটি বিশেষ বিষয় দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, অনেক শিশু কয়েক সপ্তাহ আগে হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার কিছুদিন পরই তাদের আবার অনেক জ্বর আসে এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে তাদের আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।
এই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘হাম মূলত শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। যখন কোনো শিশু হাম আক্রান্ত হয়, তখন তার শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। প্রাথমিকভাবে সুস্থ হলেও কয়েকমাস রোগপ্রতিরোধ দুর্বল থাকতে পারে।’
তার পরামর্শ, ‘হাম সেরে গেলেও অভিভাবকদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে শিশুদের প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং অন্য অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।’