তোফায়েল আহমেদ: চড়াই-উতরাইয়ের রাজনৈতিক জীবন
ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল অগ্রভাগ থেকে শুরু করে নিজের সব সম্পদ দান করে দেওয়া তোফায়েল আহমেদের জীবন কেবল পদ-পদবি আর বক্তৃতার ইতিহাস নয়। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি কখনোই বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস হারাননি।
তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও জাতিসত্তার আন্দোলন গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিরলসভাবে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন।
১৯৭০ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের (মুজিব বাহিনী) প্রধান নেতাদের একজন ছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন; পরবর্তী সময়ে তিনবার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন এবং একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব করেন।
তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজজীবন থেকেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬২ সালে ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ১৯৬৪ সালে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি হিসেবে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন এবং পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারামুক্ত হওয়ার পর এক জনসভায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৬৯ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরের বছর আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক কমান্ডারের একজন। তিনি ১৯৭১ সালের গণপরিষদ ও ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৩ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেপ্টেম্বরে তোফায়েল আহমেদ গ্রেপ্তার হন এবং ৩৩ মাস কারাবন্দি থাকেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি আরও অন্তত সাতবার কারাবরণ করেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এইচ এম এরশাদের শাসনামলে চারবার এবং ১৯৯৫ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে হওয়া আন্দোলনেও কারাবন্দি হন। ২০০২ সালেও তাকে কারাগারে যেতে হয়।
১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় আওয়ামী লীগে সংস্কার আনার প্রস্তাব দেওয়া অল্প কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মধ্যে তিনি ছিলেন। ওই প্রস্তাবের মধ্যে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর বিষয়টিও ছিল বলে জানা যায়।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে। কিন্তু, তোফায়েল আহমেদকে মন্ত্রিসভা, এমনকি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে প্রেসিডিয়াম সদস্যও করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তোফায়েল আহমেদের অবস্থানের কারণেই তাকে দলে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।
২০১৩-১৪ সালে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
২০২১ সালে তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা দেন, তিনি তার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তোফায়েল আহমেদ ফাউন্ডেশনে দান করবেন। প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে।
কয়েক বছর আগে স্ট্রোক করার পর তার শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যায় এবং এরপর থেকে তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হতো।
মৃত্যুকালে তোফায়েল আহমেদ এক কন্যা, জামাতা এবং অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তার সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমেদ ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর মারা যান।
সোমবার মাগরিবের নামাজের পর ঢাকার ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তোফায়েল আহমেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ রাখা হয় স্কয়ার হাসপাতাল মর্গে।
মঙ্গলবার হেলিকপ্টারে অথবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে তার মরদেহ ভোলায় নিয়ে যাওয়া হবে। জোহরের নামাজের পর সেখানে আরেকটি জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হবে।