অধ্যাদেশ বাতিলে সরকারের ব্যাখ্যা আইনগতভাবে সঠিক নয়: জামায়াত

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

গুম ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যায় আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শিশির মনির।

তার ভাষ্য, এ বিষয়ে সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যা ‘আইনগতভাবে সঠিক নয়’।

আজ সোমবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

এতে আরও বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ও আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।

শিশির মনির বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর অংশ হলেও তা বিচারযোগ্য হতে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হতে হয়। একক কোনো গুমের ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না—ফলে গুম অধ্যাদেশ ও ট্রাইব্যুনাল আইনের সংজ্ঞা এক নয়। মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্ত, সময়সীমা ও ক্ষতিপূরণ–সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই—সরকারের এমন বক্তব্যও খণ্ডন করেন তিনি। বলেন, সংশ্লিষ্ট ধারায় ৩০ দিনের সময়সীমা, তদন্ত প্রক্রিয়া ও ক্ষতিপূরণের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের দায়ও সরকারের। বৈধতা স্বীকার করে তা বাস্তবায়ন না করা হলে দায় সরকারকেই নিতে হবে।

বিচারকদের শোকজ নোটিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে—তাই এ ধরনের নোটিশ ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’।

এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করে আগের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আরও বলেন, এতে আর্থিক খাতে অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(ডি) অনুচ্ছেদের সময়সীমা শেষে ১১৭টি পাস, সাতটি রহিত ও ১৬টি ল্যাপস হয়।

তার মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ল্যাপস বা বাতিল হওয়ায় জনআকাঙ্ক্ষা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

তিনি জানান, ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ অনুযায়ী মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও বিতর্কিত বিষয় আলোচনার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে তারা দুই দফা ওয়াকআউট করেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সদস্যের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত না করাকেও তিনি গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে মোমেন বলেন, এ কারণেই প্রথম ওয়াকআউট করা হয়; পরে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির প্রতিবাদে আবারও ওয়াকআউট করা হয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারা সংযোজন করে আগের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তাদের একটা ইতিহাস আছে—গত ১৬ বছর ধরে তারা বলে আসছে, ঈদের পর আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ আর আসে না। এখন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও বিচার বিভাগের সচিবালয়-সংক্রান্ত বিল সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু কবে তা আনা হবে—আবারও কি দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, জনগণ যদি অধিকার আদায়ে সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে রাজপথে নামে, তার দায় সরকার ও সরকারদলীয় সদস্যদেরই নিতে হবে।