সংবিধান সংস্কার পরিষদের ব্যাপারে সাড়া নেই বিএনপিতে, আইনি জটিলতার আশঙ্কা

সাজ্জাদ হোসেন
সাজ্জাদ হোসেন

সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে রাজপথে নামার যে হুঁশিয়ারি জামায়াতে ইসলামী দিয়েছে, তা নিয়ে মোটেও বিচলিত নয় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। কারণ, সংস্কার পরিষদ গঠন এখন তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে দ্য ডেইলি স্টার। তারা জানিয়েছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোকে সংসদের কাঠামোর বাইরে গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সংসদ সদস্য খোলাখুলিভাবেই বলেন, ‘বিরোধী দল বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্চ করলেও তারা সাংবিধানিক ভিত্তিতে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করছে না।’

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট হুমকি দিয়েছে, আজ রোববারের মধ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা না হলে তারা রাজপথে নামবে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, প্রতিপক্ষ দলগুলোর এই চাপ বিএনপির সংবিধান সংস্কারের ভাবনা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দলের পছন্দমতো সময়সূচি মেনে নিতে বাধ্য করতেই এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, কেউ যদি রাজপথে নামতে চায়, নামতে পারে—সেটা তাদের স্বাধীনতা।

বিএনপি নেতারা বলেন, সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলো সংসদে আলোচনা ও পাস হওয়া উচিত, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা অংশগ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘আমরা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই সামনের দিকে এগোব।’

জুলাই সনদ আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের আইনপ্রণেতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করার কথা। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লেখিত ৪৮টি সাংবিধানিক বিধান নিয়ে এই পরিষদের কাজ করার কথা। এ জন্য সংসদ সদস্যদের দুটি আলাদা শপথ নিতে বলা হয়েছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি পরিষদের সদস্য হিসেবে।

তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় প্রস্তাবিত এই পরিষদ গঠন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিএনপি ও তাদের মিত্রদের এবং তারা কেউই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত জোটের ৭৭ জন সদস্য দুটি শপথ গ্রহণ করেছেন।

এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে যখন জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবি জানায়। ওই আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ ক্যালেন্ডার দিবসের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশনের মতোই সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হয়।

তবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করার সময় রাষ্ট্রপতি সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেননি।

জামায়াতের দাবি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি এবং সে হিসেবেই শপথ নিয়েছি। রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকেননি। তাই সংবিধান অনুযায়ী যে অধিবেশন ডাকা হয়েছে, আমরা সেখানেই অংশ নিচ্ছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নীতিনির্ধারক জানান, সংসদের কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবিত এই পরিষদ কাজ করলে তা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার সময় যেসব সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত পোষণ করেনি, কেবল সেই প্রস্তাবগুলোই তারা সমর্থন ও বাস্তবায়ন করবেন।