দেশে ইলিশ আহরণে ধসের নেপথ্যে কী

পিনাকী রায়
পিনাকী রায়

টানা দুই দশক উৎপাদন বাড়ার পর এখন দেশে ইলিশের আহরণ কমতে শুরু করেছে। ইলিশের অভয়াশ্রমের কাছে থাকা তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানিদূষণ, নদীতে পলি জমা এবং অতিরিক্ত মাছ ধরাকে এর প্রধান কারণ মনে করা হচ্ছে। এতে জাতীয় মাছের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এর দাম রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কয়েক দশক ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা করেছেন আনিসুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক। তার ভাষ্য, ইলিশের সংখ্যা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ লাখ টন। আগের বছরের তুলনায় এটা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম।

দেশের বড় নদীগুলোতে ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণের কথা বেশি উল্লেখ করা হলেও পটুয়াখালী ও বরগুনায় থাকা তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ইলিশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিক্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ওই এলাকায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও টিকে থাকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আনা নেওয়ার জন্য জাহাজ চলাচল করে। এতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া পোড়া কয়লার ছাই এবং কেন্দ্র থেকে বের হওয়া তরল বর্জ্য ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় প্ল্যাঙ্কটনসমৃদ্ধ পানির পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার আগের সময়ের তুলনায় ওই এলাকার পানির তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছে।

খোরশেদ আলম বলেন, এই দূষণের কারণে সেখানে গত তিন বছরে ইলিশের আহরণ ৪৫ শতাংশ কমেছে।

বেসরকারি সংস্থা ক্লিনের প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদীও দীর্ঘদিন ধরে ইলিশের অভয়াশ্রমের মধ্যে থাকা তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। এগুলো হলো পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামনাবাদ চ্যানেলের তীরে থাকা পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিষখালী নদীর তীরে তালতলীতে থাকা বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র।

তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নদীতে বর্জ্য ও গরম পানি ফেলছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পর ইলিশ কমে যেতে দেখেছি।

পদ্মার নাব্যতা কমে যাওয়াও ইলিশের জন্য ভালো হচ্ছে না। ইলিশ সাগর থেকে দেশের ভেতরের নদীতে আসে। এ সময় একে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে এগোতে হয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের এই যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বিএফআরআইয়ের সাবেক পরিচালক আনিসুর বলেন, ইলিশ যখন দেশের ভেতরের নদীতে আসে, তখন তার জন্য স্রোত ও পানির গভীরতা দুটোই দরকার। নদীতে অন্তত ১০ মিটার গভীর পানি থাকা দরকার। কিন্তু এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না।

এ কারণেই শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বরের জেলে পূর্ণ দাস এখন আর আগের মতো ইলিশ ধরতে পারছেন না। অথচ শরীয়তপুরের পদ্মার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।

৭০ বছর বয়সী পূর্ণ দাস ৩০ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। একসময় পদ্মায় প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৬০টি মাছ পেতেন তিনি।

তিনি বলেন, এখন তো কোনো মাছই নেই। গত দুই দিন জাল ফেলেও মাত্র দুটো ইলিশ আর অন্য একটি মাছ পেয়েছি।

শরীয়তপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, গত পাঁচ বছরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নদীতে ডুবোচর তৈরি হওয়া এবং পানিদূষণ এর অন্যতম কারণ।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, উপকূলজুড়ে ইলিশের চলাচলের পথে বিভিন্ন ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় ব্যাপকভাবে অবৈধ জাল ব্যবহার করাও এর বড় কারণ।

হাতিয়া ও ভোলার কাছে মেঘনা, রাবনাবাদ, রাঙ্গাবালী ও তালতলী এলাকা এবং পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীতে নাব্যতার তীব্র সংকট ইলিশের চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

তিনি বলেন, উপকূলজুড়ে এ ধরনের শতাধিক বাধা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ জালই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে।

বরিশাল মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা, পায়রা, বলেশ্বর, বিষখালী, আন্ধারমানিক, তেঁতুলিয়া, সুগন্ধা ও গজারিয়াসহ ২০টি জায়গায় এখন ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কোথাও কোথাও পানির গভীরতা কমে ১৮ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। অথচ ইলিশের প্রজননের জন্য ৭৫ থেকে ৮০ ফুট গভীরতা প্রয়োজন। চাঁদপুর থেকে মনপুরা পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন চ্যানেলেও এখন বালুচর তৈরি হয়েছে। ফলে নৌযান চলাচলের জন্য সরু কিছু পথই শুধু খোলা আছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বরগুনার তালতলী, পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও ভোলার বিভিন্ন নদীর মোহনায় পলি জমে যাচ্ছে। এতে ইলিশের নদীতে ঢোকার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আনিসুর রহমান বলেন, পানির স্তর কমে গেলে তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং পানির গুণগত মানও বদলে যায়। এতে ইলিশের খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এই ভারসাম্য আরও নষ্ট হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের আজাদ বলেন, নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াও ইলিশের উৎপাদন কমাচ্ছে। তবে নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াই মাছটির জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে পানির তাপমাত্রা বাড়ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আমি গবেষণা করিনি, তাই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বড় মাছের ডিম থেকে ভালো প্রজনন হচ্ছে না। নদীতে বড় মাছের সংখ্যা কমে গেলে পরের বছর ইলিশের সংখ্যায় তার প্রভাব পড়বে।

ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার অর্থ হলো, খুব শিগগিরই এই মাছ বেশিরভাগ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

কারওয়ান বাজারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আরশাদ মিয়া বলেন, এবার ইলিশের দামই জানতে চাইনি। এত বেশি দাম যে কেনার সামর্থ্য নেই।

ধানমন্ডির মাছ বিক্রেতা আফজালও বলেন, এই মৌসুমে তার নিয়মিত ৮০ শতাংশ ক্রেতারই ইলিশ কেনার সামর্থ্য নেই। গত বছরের তুলনায় দাম অনেক বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, গত বছর এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। এ বছর একই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ টাকায়।

বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে শুধু বাংলাদেশ মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আহরণ করে। দেশে প্রায় ৭ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ ধরার সঙ্গে যুক্ত। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এই মাছের অবদান প্রায় ১ শতাংশ।

 

(বরিশাল, পটুয়াখালী ও শরীয়তপুরের সংবাদদাতা এই প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন)