টানাটানির সংসারে ফ্যামিলি কার্ডে স্বস্তি

রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন
আহসান হাবিব
আহসান হাবিব
সোহরাব হোসেন
সোহরাব হোসেন

পটুয়াখালীর একটি চরে থাকেন ৩২ বছর বয়সী তানজিলা বেগম। তাদের সংসারের আয়-রোজগারের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। স্বামী আশেপাশের তরমুজ খেতে দিনমজুরি করেন। কিন্তু জোয়ারের পানি বা ঝোড়ো আবহাওয়ায় প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তখন স্বামীর কাজ বন্ধ থাকে, আর সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

তানজিলা বলেন, ‘আমাদের নিজেদের কোনো জমিজমা নেই। স্বামী দিনমজুরি করেন, আর আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করি। কিন্তু সব দিন তো কাজ মেলে না, তাই সংসার চালানো খুব কষ্টের।’

তবে এখন দিন কিছুটা বদলেছে। তানজিলা প্রতি মাসে সরাসরি নিজের ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে ২ হাজার ৫০০ টাকা পান। এখান থেকে ৫০০ টাকা তিনি দুর্যোগের দিনের জন্য জমিয়ে রাখেন, আর বাকি ২ হাজার টাকা দিয়ে সংসারের খাবার-দাবার ও ছোট ছেলের পড়াশোনার খরচ চালান। 

গলাচিপা উপজেলায় সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পাইলট প্রকল্পে যে প্রথম ৮০৮ জন এই সুবিধা পাচ্ছেন, তানজিলা তাদেরই একজন।

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজার মো. ইজাজুল হক বলেন, এই উপকূলীয় এলাকার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র। তাদের আয়ের প্রধান উৎস মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। বিশেষ করে তরমুজ চাষের ওপর অনেক পরিবার নির্ভরশীল।

প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনায় রেখে সরকার এই কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একটি ব্যবস্থার আওতায় আনা। বর্তমানে এসব কর্মসূচি অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে কর্মসূচিটির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে কর্মসূচিটিকে সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

দেশজুড়ে জরিপ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য কর্মসূচিতে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ‘সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইনক্লুশন, রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ কর্মসূচি থেকে আসবে ৯০০ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেবে সরকার।

আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচিটির উদ্বোধন হবে। এরপর জরিপের সাফল্য ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে ধীরে ধীরে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে এটি সম্প্রসারণ করা হবে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এই সম্প্রসারণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচিটির উদ্বোধন করবেন। এর আগে কিশোরগঞ্জের লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পরিবারগুলোর মধ্যে জরিপের তথ্যভাণ্ডার থেকে তৈরি নতুন সফটওয়্যার ও অ্যাপের পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হবে।

সরকার আগামী কয়েক বছরে ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি করতে চায়।

মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেওয়া এক উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় আসবে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে ৮১ লাখ হবে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ পরিবারকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পুনর্গঠিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিটি যোগ্য পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক নারী সদস্যের নামে টাকা দেওয়া হবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবারের পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও বাড়বে।

একই পরিবারের সদস্যরা যাতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় একাধিকবার নিবন্ধিত হতে না পারেন, সে জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের কারিগরি দল একটি সমন্বিত ডিজিটাল পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করছে। এতে পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য যুক্ত করা হবে।

টাকা দেওয়া হবে টাকাপের সঙ্গে যুক্ত দ্বৈত-ইন্টারফেসের স্মার্ট চিপ কার্ডের মাধ্যমে। টাকাপে বাংলাদেশের জাতীয় খুচরা লেনদেন ব্যবস্থা।

সুবিধাভোগীরা দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের টার্মিনাল ও এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারবেন।

টাকা বিতরণের জন্য তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৩ হাজার ৭২টি শাখা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংক তিনটি হলো সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক।

কারা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন, তা নির্ধারণ করা হবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ নামের একটি পদ্ধতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে এই স্কোর নির্ধারণ করা হবে।

এই ব্যবস্থায় পরিবারগুলোকে আয়ের ভিত্তিতে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে নিচের তিন স্তরের পরিবারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসূচির জন্য নির্বাচন করা হবে।

তবে কোনো পরিবারের সদস্য সরকারি পেনশন পেলে, নিয়মিত সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে কিংবা আয়কর দিলে সেই পরিবার এই সুবিধা পাবে না।

এ ছাড়া কোনো পরিবারের সদস্যের ৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সঞ্চয়পত্র থাকলে, নিবন্ধিত চার চাকার যানবাহন থাকলে অথবা আধা একরের বেশি আবাদি বা বাণিজ্যিক জমি থাকলেও ওই পরিবারকে অযোগ্য বিবেচনা করা হবে।

প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশজুড়ে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের তদারকির জন্য থাকবেন ৬ হাজার ৬৮১ জন মাঠপর্যায়ের সুপারভাইজার।

তথ্য সংগ্রহকারীর চাকরিতে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। দেশের ৫৮৩টি সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে এই পদে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ১০৩টি আবেদন জমা পড়েছে।

প্রতিটি পরিবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য একজন তথ্য সংগ্রহকারী ১৬৫ টাকা পাবেন। আর সুপারভাইজাররা প্রতিটি তথ্যের জন্য পাবেন ৩০ টাকা।

গলাচিপায় আবেদন যাচাইয়ের কাজ চলছে। উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে ১০৩ জন তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ দেওয়া হবে।

সাধারণ জনশুমারির মতো শুধু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালিত হবে না। ফ্যামিলি কার্ডের জরিপে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারাও প্রতিটি স্তরে যুক্ত থাকবেন।

মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি করবেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও কাজটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

তথ্য সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া হবে কাগজবিহীন। মাঠকর্মীরা মোবাইলভিত্তিক একটি ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ করবেন। সেখানে ঘটনাস্থলের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে। পরিবারের বসবাসের পরিস্থিতির ছবি তুলতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাক্ষরও নেওয়া হবে।

পটুয়াখালী সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, তথ্য সংগ্রহের সময় এসব ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে।

সংগ্রহ করা তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি সফটওয়্যার দিয়ে যাচাই করা হবে। পরিবারের দেওয়া আয়ের তথ্যের সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রের কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, সফটওয়্যারটি তা শনাক্ত করবে।

এরপর তদারককারী দল জরিপ করা পরিবারের ৫ থেকে ১০ শতাংশের তথ্য আবার যাচাই করবে।

এই জরিপের মাধ্যমে দেশের ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।

গত মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি চালু করা হয়। তখন দেশের নির্বাচিত কিছু এলাকায় ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

প্রাথমিক যাচাইয়ে প্রায় ৭৭ হাজার পরিবারকে যোগ্য হিসেবে পাওয়া যায়। তবে পরে প্রায় ৬ হাজার পরিবারকে বাদ দেওয়া হয়। কারণ এসব পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি পেনশন পান, সরকারি চাকরি করেন বা অন্য কোনো অযোগ্যতার শর্তে পড়েন।

সব মিলিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্পে নির্বাচিত পরিবারের প্রায় ৯২ শতাংশের তথ্য সফলভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে।

উপকূলের জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তানজিলা ও তার মতো অনেক নারীর কাছে মাসিক এই অর্থ এখন অনিশ্চিত জীবনের একটি নির্ভরযোগ্য সহায়তা হয়ে উঠেছে।

তানজিলা বলেন, ‘আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের টাকা অনেক বড় নিরাপত্তা। আমরা এই টাকা জরুরি সংসার খরচে ব্যবহার করি। প্রতি মাসে ৫০০ টাকা জমিয়ে রাখি। ঝড় বা বন্যার কারণে যখন কাজ করা সম্ভব হয় না, তখন ওই টাকা কাজে লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ছেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। তার পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্যও আমরা কিছু টাকা জমিয়ে রাখি।’