এক্সপ্লেইনার

ফ্যামিলি কার্ড: কী, কেন ও কীভাবে পাবেন?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হবে, যার মাধ্যমে দেশের ১৪টি উপজেলায় (প্রতিটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে) প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবার প্রথমে এই সুবিধা পাবে।এই চার মাসের পাইলট প্রকল্প সফল হলে ধাপে ধাপে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।

কী এই ফ্যামিলি কার্ড? কারা এটি পাওয়ার যোগ্য? এই কার্ডে কী সুবিধা পাওয়া যাবে? আবেদন করার প্রক্রিয়াই বা কী?

ফ্যামিলি কার্ড কী?

ফ্যামিলি কার্ড হলো একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এর মূল লক্ষ্য সমাজের প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।

এই প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ তৈরি করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্পের আর্থিক ও নীতিগত দিক তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কারা পাবেন এই কার্ড?

এই কার্ড সবার জন্য নয়। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা মূলত এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। তবে আপাতত হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে এই কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হবে। কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনা রাখা হবে না। 

সরকারি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যের পরিবার, হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার ও শূন্য দশমিক ৫ একর বা তার কম জমির মালিকরা এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যকে এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবার হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারী বা মা এই কার্ড পাবেন এবং একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না।

তবে সরকারি চাকরিজীবী বা নিয়মিত পেনশনভোগীরা এর আওতাভুক্ত হবেন না। এছাড়া, বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী, নিজস্ব গাড়ি বা বিলাসবহুল সম্পদের মালিক ও যাদের বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা রয়েছে, তারাও এই সুবিধা পাবেন না।

এই কার্ডের সুবিধাগুলো কী কী?

২০২৬ সালের নতুন পাইলট প্রজেক্ট অনুযায়ী, কার্ডধারীরা দুই ধরনের সুবিধা পাবেন—নগদ অর্থ সহায়তা ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য।

প্রতিটি কার্ডধারী পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এই টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (যেমন বিকাশ বা অন্যান্য বৈধ চ্যানেল) মাধ্যমে পৌঁছে যাবে।

আরেকটি হলো এই কার্ডের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও চিনি কেনা যাবে।

কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া

কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিনিধিরা নির্বাচিত ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যোগ্য পরিবার বাছাই করবেন। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও’র নেতৃত্বে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কোনো তদবিরের প্রয়োজন হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। 

এরপর মাঠ পর্যায়ের তথ্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের আইসিটি এবং সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসারদের মাধ্যমে কয়েক স্তরে যাচাই করা হবে।

নিবন্ধিত তথ্য নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেজের সাথে যাচাই করা হবে, যাতে কোনো দ্বৈত সুবিধাভোগী না থাকে। চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হবে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার সুপারিশে।

আবেদন প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু না হলেও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি ও নিবন্ধিত সচল একটি মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক নম্বর রাখতে হবে।

পরের ধাপে স্থানীয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও সরকারের অনলাইন পোর্টাল থেকে আবেদন ফরম পাওয়া যাবে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন কিনা, সরকার তা তদারক করবে।