যে কারণে শিশুদের মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা, স্থূলতা-ডায়াবেটিস ঝুঁকি বাড়ছে
‘আগে মোবাইল দাও! তারপর খাব’ কিংবা ‘মোবাইল না দিলে আমি খাব না’—এমনভাবে ৬ বছর বয়সী ছোট্ট শিশুটি আবদার করলে কেউ-ই না করতে পারে না। মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজন যেই থাকুক, শিশুর হাতে তুলে দেয় এক নীরব ঘাতক—মোবাইল ফোন কিংবা ট্যাবের মতো ডিজিটাল ডিভাইস। আর এখান থেকেই শুরু হয় ডিজিটাল জগতে শিশুটিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করার ভিন্ন এক যাত্রা।
সকাল শুরু হয় ইউটিউবের ‘কার্টুন’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমস খেলে। শিশুদের পুরো জগত কয়েক ইঞ্চি রঙিন পর্দায় বন্দি হয়ে যাচ্ছে। কী খাচ্ছে নিজেও জানে না, জানতেও চায় না। সবজি নাকি মাছ—সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
মস্তিষ্ক খাবারের স্বাদের চেয়ে স্ক্রিনের ‘নীল আলো’ আর ‘শব্দ’ থেকে পাওয়া আনন্দে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এরপর শুরু হয় ক্ষুধামন্দা, স্থূলতা ও অনিদ্রা। সারাক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে ঝাপসা দেখে শিশুটি। মাথাব্যথাও বাড়তে থাকে। সঙ্গে যুক্ত হয় ঘাড়ে ও পিঠে ব্যথা। এই কষ্ট সহ্য করেও গড়ে প্রায় প্রতিদিন সাড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটিয়ে দিচ্ছে অনেক শিশু। অনলাইন ক্লাস, গেমস, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সময় কাটায় তারা।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় উঠে আসে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ভয়াবহ চিত্র, যার মূল্য দিতে হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে।
৬টি স্কুলের ৪২০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ শিশু দৈনিক সাড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বা আরও বেশি।
গবেষণায় শিশুদের ৯টি প্রধান শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার সরাসরি সম্পৃক্ত।
প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করা শিশুদের মধ্যে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড়–পিঠের ব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এমনকি স্থূলতার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গবেষণায় শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে শারীরিক সমস্যাগুলো, তা হলো—
চোখের সমস্যা
মাথাব্যথা
ঘাড়ে ব্যথা
পিঠে ব্যথা
হজমজনিত সমস্যা
পেটব্যথা
ক্ষুধামন্দা বা ক্ষুধার পরিবর্তন
শ্রবণ সমস্যা
ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
ঘুমে দেরি হওয়া
ঘুমের সময় কমে যাওয়া
ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া
স্থূলতা
সর্বাধিক সমস্যা: চোখ ও মাথাব্যথা
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানো শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে চোখের সমস্যা ও মাথাব্যথা।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণা বলছে, ৩৫ শতাংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যা ও ৮০ শতাংশ শিশু মাথাব্যথায় ভুগছে।
দীর্ঘসময় একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হয় এবং চোখের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এ কারণেই চোখের সঙ্গে সঙ্গে মাথাও ব্যথা শুরু হয়।
ঘাড় ও পিঠের ব্যথা: অল্প বয়সেই মেরুদণ্ডে চাপ
প্রতিবেদন বলছে, মোবাইল ও ট্যাব ব্যবহারের সময় সঠিকভাবে না বসার কারণে শিশুদের ঘাড় ও পিঠ ব্যথার হার বাড়ছে। বিশেষ করে মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস ঘাড়ের হাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ৪৫ শতাংশ শিশুর ঘাড়ে ব্যথা ও প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর পিঠের মাংসপেশিতে ব্যথায় ভুগছে।
এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পালমোনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান কামরুল।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অল্প বয়সে ঘাড় ও পিঠের ওপর চাপ পড়লে ভবিষ্যতে তা মেরুদণ্ডজনিত জটিলতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।’
হজম, পেটব্যথা ও ক্ষুধামন্দা: বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস
গবেষণা বলছে, স্ক্রিনে আসক্ত শিশুদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যাপার হচ্ছে খাবারের সময়সূচি ঠিক থাকছে না। অনেক শিশু স্ক্রিন দেখতে দেখতে খাচ্ছে বা ঠিকমতো খেতে চাইছে না। এর ফল হিসেবে হজম সমস্যা, ও ক্ষুধামন্দার মতো উপসর্গ একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
আইসিডিডিআর,বি জানাচ্ছে, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা ৬৫ শতাংশ শিশুর হজমের সমস্যা ও ৪৮ শতাংশ শিশুর ক্ষুধামন্দা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ডা. কামরুল বলেন, ‘খাবারের সময় স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের পাচনতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক দুর্বলতার কারণ হতে পারে।’
'এই গবেষণায় প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু পেটব্যথায় ভুগছে এমন তথ্য রয়েছে,' বলেন তিনি।
এর কারণ হিসেবে তিনি ১২ বছর বয়সী একটি শিশুর কথা উল্লেখ করেন। বলেন, ‘ওই শিশুটিরও পেটে ব্যথা ছিল।’ তিনি নানা কৌশলে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, শিশুটি মোবাইল ফোন দেখার প্রতি এতই আসক্ত ছিল যে, ঠিক সময়ে টয়লেটে যেত না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রস্রাব ও পায়খানা দীর্ঘ সময় চেপে রাখত। আর এ কারণেই তার প্রায় সবসময় পেটে ব্যথা লেগে থাকত।
মেডিকেলের ভাষায় এর নাম ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা মূত্রনালির নিম্নভাগে সংক্রমণ বলে জানান এই চিকিৎসক।
শ্রবণ সমস্যা
গবেষণায় শ্রবণ সমস্যা ভুগছে এমন শিশুর সংখ্যা মাত্র ৩ শতাংশ বলে পাওয়া গেছে। এই সমস্যাকে নীরব ও স্থায়ী ঝুঁকি মনে করছেন গবেষকরা। দীর্ঘ সময় হেডফোন বা ইয়ারফোনে উচ্চ শব্দে গান শোনা ও গেম খেলার ফলে শিশুদের শ্রবণক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ডা. কামরুল বলেন, 'শ্রবণ সমস্যা অনেক সময় ধরা পড়ে দেরিতে, তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ।'
স্থূলতা ও ডায়াবেটিস ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, কম শারীরিক পরিশ্রম ও দীর্ঘসময় বসে থাকার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এটি বর্তমানে ছোট আকারে দেখা গেলেও ভবিষ্যতের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
ডা. কামরুল বলেন, 'শিশুর শরীরে বড়দের এই রোগ কোনোভাবেই হেলাফেলা করা যাবে না। দীর্ঘসময় বসে বসে স্ক্রিনে সময় কাটানোর কারণে শিশুরা অল্প বয়সেই স্থূল বা মোটা হয়ে পড়ছে। অনেকেই ডিভাইসে আসক্ত হয়ে ঘরেই থাকছে, বাইরে বের হওয়া বা খেলাধুলাও ছেড়ে দিয়েছে।'
'এমনটা চলতে থাকলে ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়,' সতর্ক করেন তিনি।
ঘুম কম
স্ক্রিন টাইমের সবচেয়ে নীরব আঘাত আসে ঘুমের ওপর। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের ঘুমাতে যেতে দেরি হয়, মোট ঘুমের সময় কমে যায় এবং রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘুমজনিত সমস্যা শিশুদের শরীরের বৃদ্ধি, মনোযোগ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদন বলছে, দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনে সময় কাটানো শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিদিন ৭ ঘণ্টার চেয়েও কম ঘুমায়। বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী প্রতি দুই শিশুর একজনই প্রয়োজনীয় ঘুম পাচ্ছে না।
ঘুমের অভাব সরাসরি শরীরের বৃদ্ধি, হরমোন ব্যালান্স, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চোখ, মাথা ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে বলে উল্লেখ করেন গবেষকরা।
এ বিষয়ে ডা. কামরুল আবারও ১২ বছরের ওই শিশুটির উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘শিশুটির বাবা-মা প্রথমে তার এই স্ক্রিনে আসক্তি ধরতে পারে ঘুমের বিষয়টি দেখে।’
‘শিশুটির বাবা বুঝতে পারেন ১২ বছরের ওই শিশুটি রাত জেগে জেগে মোবাইল ফোন দেখছে। কিছু জিজ্ঞাসা করলে ঠিকমতো কথা বলত না। প্রায়ই বাড়ির সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছিল ছেলেটি। কিন্তু কয়েকমাস আগেও এমনটা দেখেননি ছেলেটির বাবা। এরপরই তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন,’ বলেন তিনি।
ঝুঁকি ও করণীয়
ডা. কামরুল বলেন, 'পুরো বিষয়টি হচ্ছে একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো। স্ক্রিনে বেশি সময় কাটালে ঘুম কম হবে, স্থূলতা বাড়বে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমবে এবং এক সময় অসুস্থ হবে।'
তিনি বলেন, 'অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই একটির বেশি শারীরিক সমস্যা একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে। চোখের সমস্যা থাকা শিশুদের বড় অংশের মধ্যেই মাথাব্যথার উপসর্গ রয়েছে।'
'সমস্যাগুলো আলাদা নয়, একটি কারণকে ঘিরেই বাকিগুলো তৈরি হচ্ছে,' যোগ করেন তিনি।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের জন্য এখন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। ঠিক সময়ে বাবা-মা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারসহ সবাইকে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ না নিলে আজকের ছোট সমস্যাগুলোই আগামী দিনে বড় রূপ নেবে বলে সতর্ক করেন ডা. কামরুল।
এসব ঝুঁকি রোধে আইসিডিডিআর,বি গবেষকদের কিছু সুপারিশ হলো—শিশুদের স্ক্রিন টাইম ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী সীমিত রাখা, ঘুমানোর অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করা, আউটডোর গেম, ব্যায়াম ও শারীরিক কার্যক্রমে শিশুদের উৎসাহিত করা, বিকল্প বিনোদন হিসেবে গান, ইনডোর গেম বা পাখি পালনের মতো কাজে আগ্রহ বাড়ানো, বাবা-মায়ের নিয়মিত শিশুদের সঙ্গে ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটানো।