সরকারি অফিসারদের গাড়ি ব্যবস্থাপনা খরচ কমিয়ে অর্ধেক করার পরিকল্পনা
সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে প্রাধিকারপ্রাপ্ত অফিসারদের গাড়ির জ্বালানি খরচ অর্ধেক করার পরিকল্পনা চলছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার। এমন খবরে সচিবালয়ের প্রাধিকারপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন, আইন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে এই বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানের উপসচিব ও তদুর্ধ্ব মর্যাদার অফিসাররা রাজস্ব খাত থেকে গাড়ি কেনার জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকার পাশাপাশি গাড়ি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার করে টাকা পান। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি মাসের খরচ ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা যায় কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সচিবদের অনুরোধ করেছে।
চিঠিতে এ বিষয়ে প্রধামন্ত্রীর নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ৯ জুলাই পাঁচ সচিবের কাছে পাঠানো অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রাধিকারপ্রাপ্ত অফিসারদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসেবে যে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, তা কিছুটা হ্রাস করার সুযোগ রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা হারে নির্ধারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জাকির হোসাইনের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মোটরযানের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হলো।
সচিবালয়ে প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রতিক্রয়া শুরু হয়েছে। সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত অফিসাররাই এমন খবরে গত দুদিনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সচিবের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শীর্ষ সচিবদের কয়েকজন এই বিষয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন বলেও জানা গেছে।
এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমলে সচিব হওয়া প্রভাবশালী এক কর্মকর্তা কাজ করছেন বলে বিএনপিপন্থী অফিসারদের অভিযোগ।
তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমলে শীর্ষপদে পদোন্নতি পাওয়া কিছু অফিসার নিজেদেরকে সরকারের ‘গুডবুকে’ রেখে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আশায় এমন পরামর্শ দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক অফিসার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারকে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্রবাহিনীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির একটি প্রক্রিয়া বলে মনে করি। সরকার এরই মধ্যে প্রাধিকারপ্রাপ্ত অফিসারদের গাড়ির ঋণ স্থগিত করেছে, এটা ঠিক আছে। যারা ইতোমধ্যে সুবিধা পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ অপ্রত্যাশিত।’
আরেক অফিসার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে বিপুলসংখ্যক অফিসার পদোন্নতি পেয়েছে, বিদেশ সফর, গাড়ি সুবিধা, পহেলা বৈশাখের বিশেষ ভাতাসহ সরকারি কর্মচারীদের অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার চালু থাকা সুবিধা বাতিল করলে, সেটা নেতিবাচক ফল হতে পারে।
সচিবালয়ের চার নম্বর ভবনের আরেক অফিসার বলেন, ‘ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে প্রাধিকারপ্রাপ্তদের গাড়ি ঋণ স্থগিত করা হয়েছে, এই বিষয়ে অফিসাররা অখুশি নন, আমরা সেই বাস্তবতা বুঝি। কিন্তু যারা দীর্ঘ সময় ধরে একটা সুবিধা পেয়ে আসছেন তাদের সুযোগ-সুবিধা বাতিল করাটা যৌক্তিক নয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, গাড়ির ব্যবস্থাপনা খরচটা দেওয়া হয় ক্ষতিপূরক ভাতা হিসেবে। এটা যেন কোনোভাবেই কর্মচারীর লাভের উৎস না হয়। সরকার যদি হিসেব করে দেখে এটা লাভের উৎস হয়, তাহলে যৌক্তিকভাবে কমাতে পারে।
‘কোনো সরকারই রাজস্ব খাতের গাড়ির অপব্যবহারের মূল জায়গায় হাত দেয় না’ উল্লেখ করে ফিরোজ মিয়া বলেন, প্রাধিকারপ্রাপ্ত অফিসারকে গাড়ি দিলে তিনি মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর যেখানে যান সেখানে তাকে ওই গাড়িই ব্যবহার করতে হবে, কোনোভাবেই অন্য কোনো সরকারি গাড়ি তিনি ব্যবহার করতে পারবেন না, এই নিয়ম চালু করা হলে রাজস্ব খাতের গাড়ি সংক্রান্ত খরচ অনেক কমে যাবে।