লাখো ডলারের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের বদলি, সংকটে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট
যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে লাখো ডলার ব্যয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া একাধিক পুলিশ সদস্যকে বদলির সিদ্ধান্তে সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বিশেষায়িত কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশিক্ষিত জনবল হারালে সন্ত্রাস দমন, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ, সোয়াট অভিযান এবং সাইবার অপরাধ তদন্তে ইউনিটটির সক্ষমতা অনেকখানি কমে যাবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তার নিজ জেলার মহানগর পুলিশে রাখা হবে না।
এ সিদ্ধান্তের কারণে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০ সদস্যকে চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায়।
সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে বর্তমানে একজন উপকমিশনারের অধীনে পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক (এসআই), এএসআই, কনস্টেবল ও অন্যান্য পদে ৮৭ জন সদস্য কর্মরত আছে।
ইউনিটটির অধীনে সাইবার সিকিউরিটি শাখা, বিশেষায়িত সাইবার ল্যাব, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট, সোয়াট, ইন্টেলিজেন্স শাখা এবং ডগ স্কোয়াড (কে-নাইন ইউনিট) পরিচালিত হয়।
ইউনিটটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি টেররিজম অ্যাসিস্ট্যান্স (এটিএ) কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব প্রশিক্ষণের বড় অংশ সমন্বয় করেছে বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এসব প্রশিক্ষণের আর্থিক মূল্য কয়েক লাখ ডলারের সমপরিমাণ।
গত ৯ জুন পুলিশ সদরদপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেনের সই করা এক আদেশে সিএমপি থেকে বদলি হওয়া ৪ জন পরিদর্শকের মধ্যে ২ জনই কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের।
তারা হলেন বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান পরিদর্শক সঞ্জয় গুহ এবং সোয়াট টিমের প্রধান পরিদর্শক সঞ্জয় সিনহা। দুজনই একাধিকবার বিদেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
এছাড়া পৃথক আদেশে এটিএ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাইবার ল্যাবের এসআই রেজাউল করিম ও এসআই রাজিব হোসেন, সোয়াট সদস্য এসআই সুমিত দাশ, এসআই জুলফিকার হোসেন, এসআই জয়শান্ত বড়ুয়া, এএসআই (সশস্ত্র) রেফায়েত হোসেন, এএসআই (সশস্ত্র) মাইকেল বড়ুয়া এবং কনস্টেবল মহিবুর রহমানকে বদলির তালিকায় রাখা হয়েছে।
তাদের মধ্যে এসআই সুমিত দাশ সিএমপির একমাত্র প্রশিক্ষিত স্নাইপার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বদলি আদেশ কার্যকর হলে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে মাত্র দুজন এএসআই অবশিষ্ট থাকবেন। এই টিমের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরেক এসআই স্বপন কুমার সরকার কিছুদিন আগে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা না থাকায় বিস্ফোরক উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ কার্যক্রম পরিচালনা ও যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন জুনিয়র সদস্যরা।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জঙ্গি তৎপরতা দমন, সাইবার অপরাধ তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা অভিযান এবং উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণের মতো দায়িত্ব পালন করে। অতীতে সীতাকুণ্ডের বোমা হামলা, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশনের ডিভাইস ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার আলোচিত মামলার তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইউনিটটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, 'কাউন্টার টেররিজমে যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক কোনো অনিয়ম বা বড় কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। যারা এই ইউনিটে কর্মরত আছেন তারা সবাই বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং সংবেদনশীল ঘটনায় থানা পুলিশ তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে থাকে। লাখ লাখ ডলার খরচ করে তাদের ট্রেনিং করিয়ে আনার পর এভাবে বদলি দিলে পুরো ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হবে।'
উপকমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এমনিতেই ইউনিটতে জনবল কম। গত কয়েকমাস ধরে এখানে পদায়নের জন্য লোক খোঁজা হয়েছিল। কাউন্টার টেররিজমের ডিসি সিএমপির গোয়েন্দা ও থানাসহ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সদস্যদের কেউ তার ইউনিটে যেতে আগ্রহী কি না, জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কারও আগ্রহ দেখা যায়নি।'
'এখানে যারা কাজ করেন সবাই প্রশিক্ষিত। হুট করেই কাউকে এখানে এনে বসালে, জরুরি প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে কোনো সাপোর্ট পাওয়া যাবে না। আবার নতুন প্রশিক্ষিত লোক বানাতে কমপক্ষে ২-৩ বছর সময় লাগবে,' বলেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কাউন্টার টেরিজমের সবাই বিশেষ প্রশিক্ষিত। জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তদন্তকাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা তাদের বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের সিদ্ধান্ত রিভিউ করার জন্য লিখব।'
তবে, এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন ও ডিআইজি (অ্যাডমিন) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।