২৬ জেলার পানিসংকট নিরসনে ৩৩ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ

রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে সরকার বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ নামে একটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনর্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করা হবে। পুরো প্রকল্প শেষ করতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—এই পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে।

বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত চার বিভাগের ২৬ জেলা ও ১৬৩ উপজেলার মানুষ পদ্মা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বহু বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে তীব্র পানিসংকট দেখা দিচ্ছে।

সরকারের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকের পর প্রকল্পটি নতুন করে গতি পায়। বৈঠকে তিনি দেশের জিডিপিতে প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে বলেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপের প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। এই ধাপের ব্যয় সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করা হবে।

প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। ব্যারেজটিতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস গেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।

এ ছাড়া পদ্মা ব্যারেজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ধাপের আওতায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতী নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে।

অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফ-টেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফ-টেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

হিসনা অফ-টেককে হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি গঙ্গা নদী ব্যবস্থা থেকে পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পলি জমা কমানো ও শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯টি জেলা ও ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে।  জেলাগুলো হলো কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুর।

দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা পাবে এবং সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে।

এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বছরে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন চাল এবং ২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন বাড়তে পারে।

পদ্মার ওপর ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সেই সমীক্ষা শেষ করে।

সেই সমীক্ষায় বলা হয়, ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি, নৌ-চলাচলে বিঘ্ন এবং জীববৈচিত্র্যের অবনতি ঘটেছে।