ঠাকুরগাঁওয়ে চৈত্র সংক্রান্তিতে ঐতিহ্যবাহী মুখোশ নৃত্য
অশুভ শক্তির বিনাশ ও সকলের মঙ্গল কামনায় ঠাকুরগাঁওয়ে চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পালিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী মুখোশ নৃত্য।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সিঙ্গিয়া গ্রামের শিবকালী মন্দির প্রাঙ্গণে চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এ মুখোশ নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। পৌরাণিক দেব-দেবীর মুখাবয়বের আদলে তৈরি বর্ণিল মুখোশ পরে একদল শিল্পী এই নৃত্যে অংশ নেন।
বাংলা একাডেমির পঞ্জিকা অনুযায়ী দিনটিতে দেশব্যাপী পহেলা বৈশাখ পালিত হলেও, বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী দিনটি মূলত চৈত্র সংক্রান্তির ছিল। এদিন উৎসবের প্রধান আকর্ষণ মুখোশ নৃত্য দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা শিবকালী মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হন।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পরিবেশিত মুখোশ নৃত্যের উপস্থাপনায় আধ্যাত্মিকতা ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। প্রথা অনুযায়ী, নৃত্যানুষ্ঠান শেষে মুখোশগুলো বিসর্জন দেওয়া হয়।
মুখোশ নৃত্যের আয়োজনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে ছিল সাজ সাজ রব। দুপুর থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত নানা বয়সী নারী, পুরুষ, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ও শিশুরা।
ঢোলের তালে এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুরে এসময় মন্দির প্রাঙ্গণে এক উৎসবমুখর পরিবেশের তৈরি হয়। মুখোশ নৃত্য ছাড়াও মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা আগত বছরের সুখ-সমৃদ্ধি ও অমঙ্গল থেকে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করেন।
মেলায় আগত প্রবীণ গ্রামবাসীরা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে মুখোশ নৃত্য পালিত হচ্ছে। এটি শতাব্দী ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ।
বয়স এখন বয়সে আশির কোঠায় থাকা সিঙ্গিয়া গ্রামের বাসিন্দা দীপক কুমার ঘোষও মুখোশ নৃত্য দেখতে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘শৈশব থেকেই এই মুখোশ নাচ দেখে আসছি। আমার বাপ দাদাও ছোটবেলা থেকে এই নাচে অংশ নিতেন।’
দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক হেম কুসুম রায় বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে গম্ভীরা বা মুখোশ নৃত্য নামে পরিচিত এই পরিবেশনা অশুভ শক্তির বিনাশ ও সবার মঙ্গল কামনায় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।’ ছোটবেলা থেকেই তিনি এই উৎসবে অংশ নিয়ে আসছেন বলে জানান।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার নওপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক হৈমন্তী শুক্লা রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শিবের তাণ্ডব ও মা কালীর রুদ্ররূপ পাপের বিনাশ এবং শান্তির প্রতীক। এই মুখোশ নৃত্যের মাধ্যমে তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আরাধনা করা হয়।’
মুখোশ নৃত্য উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে বসেছিল দিনব্যাপী গ্রাম্য মেলা। মেলায় নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, মিষ্টি, খেলনা, মাটির তৈরি তৈসজপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন দূর-দুরান্ত থেকে আগত বিক্রেতারা।
মাটির তৈরি নানান তৈজসপত্র নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে এসেছিলেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মৃৎশিল্পী পূর্ণ পাল। তিনি জানান, গত কয়েক বছর ধরে মেলা প্রাঙ্গণে মাটির তৈরি সামগ্রী বিক্রি করে আসেছেন তিনি।
পার্শ্ববর্তী বীরগঞ্জ উপজেলার বলেয়া গ্রাম থেকে মেলায় এসেছিলেন ললিতা রায়। তিনি বলেন, ‘সংসারের কাজে ব্যবহারের জন্য মাটির জিনিসপত্র এবং শিশুদের জন্য খেলনা কিনেছি।’
মন্দির কমিটির সভাপতি পল্লব কুমার ঘোষ বলেন, ‘শতবর্ষী এই মুখোশ নৃত্য উৎসবে যোগ দিতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুখোশ শিল্পীরা এসেছেন। মূলত আগত ভক্তদের অনুদানেই প্রতি বছর এই আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে।’
স্থানীয়রা জানান, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই উৎসবের জন্য সরকারি সহায়তা ও বিত্তবানদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তাহলে এ ধরনের লোকজ উৎসব দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকবে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘চৈত্র সংক্রান্তি এখনও গ্রামবাংলার মানুষের কাছে সার্বজনীন এক উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তির লোকজ আচার-অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে গম্ভীরায় অংশগ্রহণ কিছুটা কমলেও গ্রামের মানুষ এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যা দারুণ আশাব্যঞ্জক।’