বিশ্লেষণ

ইসলামী ব্যাংক সামলাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

শীর্ষ পদে রদবদল, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িকে ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে
মো. মেহেদী হাসান
মো. মেহেদী হাসান

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপের হাত থেকে ইসলামী ব্যাংককে উদ্ধার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটিতে নতুন পর্ষদ বসিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়।

দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটি সে সময় ব্যাপক ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীরা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই বের করে নেয়, যার পরিমাণ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।

এর ফলে ২০২৩ সালের শুরু থেকেই শীর্ষ এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি অর্থ সংকটে পড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া পর্ষদের এক স্বাধীন নিরীক্ষায় ব্যাংকটির এই নাজুক আর্থিক অবস্থার চিত্র বেরিয়ে আসে।

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তায় ব্যাংকটির নগদ অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে। মানুষ কোনো রকম অসুবিধা ছাড়াই নিজেদের টাকা তুলতে পারছিলেন। ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ব্যাংকটি।

কিন্তু এখন ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংকট দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক ঠেকাতে গ্রাহকদের টাকা তোলায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তাও চাওয়া হয়েছে।

সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও খাতে নিজেদের অনুগতদের নিয়োগ দেবে—বাংলাদেশে এটা নতুন কিছু নয়। সরকার গঠন করার পর বিএনপিও কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেয়। নতুন নিয়োগ পাওয়া গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও সদস্য ছিলেন।

সে সময় এই খবর অনেককেই অবাক করেছিল। তবে মোস্তাকুর রহমান তার আন্তরিক আচরণের কারণে এর মধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে তিনি মাথা নত করবেন না এবং রাজনৈতিক প্রভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি অনেককে বিস্মিত ও হতবাক করেছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে ২৪ মে সন্ধ্যায় এই ঘোষণা আসে। সাবেক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন, অর্থাৎ ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কর্মকর্তার দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে শীর্ষ কর্মকর্তারা পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, খুরশীদ আলম তাদের একজন।

অভিযোগ আছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ ছিল। এ ছাড়া তার স্ত্রী ঋণ খেলাপি। এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়ায় পুরো ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম যখন কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং বড় ধরনের ঋণ অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তখন খুরশীদ আলম বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তাই এমন নিয়োগের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। এত তাড়াহুড়া করে কেন এই নিয়োগ দেওয়া হলো? কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কি? যদি তা না হয়, তবে খুরশীদ আলমের বিশেষ এমন কী যোগ্যতা ছিল? এর চেয়ে যোগ্য আর কেউ কি ছিলেন না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তির কাউকে নিয়োগ দিতে পারত না?

এসবের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেছেন, খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি একজন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিত, তাহলে হয়তো অস্থিরতা এমন পর্যায়ে যেত না। এই অস্থিরতার কারণে শুধু জুনের প্রথম সপ্তাহেই চার হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকটিকে এখন ১০ হাজার কোটি টাকার ‘বিশেষ তারল্য সহায়তা’ চাইতে হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের এই নতুন নিয়োগের বিরুদ্ধে কর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও সরব হয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রতি দলটির দৃশ্যমান সমর্থন এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না যে তারা এই নতুন চেয়ারম্যানের বিপক্ষে। তারা রাজপথে, সংসদে এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরে এই নিয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ ভূমিকা এবং বিশেষ করে গত নির্বাচনে ব্যাংকটির ভূমিকা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ব্যাংকটি জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে। তবে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ইসলামী দলটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে ব্যাংকটিকে ঘিরে যে অস্থিরতা চলছে (তা জামায়াতে ইসলামী শুরু করুক বা না করুক), তা চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন।

এই অস্থিরতা থামানোর মতো শক্তি বা সদিচ্ছা হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই সরকারের উচিত এই সংকট সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করা।