শুভর দাফন হয় অজ্ঞাত হিসেবে, অপহরণের অভিযোগ ছিল স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে
নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে মাহফুজুর রহমান শুভ নামে ২১ বছর বয়সী এক যুবককে অপহরণের অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনার পরদিনই শুভর মরদেহ পাওয়া যায়, তবে ‘অজ্ঞাত’ পরিচয়ে।
পুলিশ বলছে, পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় গত ৩১ মার্চ অজ্ঞাত হিসেবেই রাজউক কবরস্থানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয় মরদেহ।
এর ছয়দিন পর আজ রোববার সকালে উদ্ধারের সময়কার ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা শুভকে শনাক্ত করেন।
ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর রসুলবাগের ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেলের ছেলে শুভ। ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। পরদিন ৩০ মার্চ সকালে রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পৌরসভার কালাদী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, ‘মরদেহটির মাথা, মুখমণ্ডল, হাত, পা ও বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল। নীলাফুলা জখম ছিল।’
তিনি জানান, শরীরের এসব জখম হত্যার পূর্বে নির্যাতনের নির্দেশ করছে। মরদেহের ময়নাতদন্তের পর পুলিশ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করে। তখনও তার পরিচয় জানা যায়নি। পুলিশ মামলাটি করে ১ এপ্রিল।
একইদিন এই থানা থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে ফতুল্লা মডেল থানায় শুভকে অপহরণের অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়। সেখানে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে প্রধান আসামি এবং আরও ১০ জনকে অভিযুক্ত করেন শুভর মা মাকসুদা বেগম। তখনও তাদের জানা ছিল না শুভকে এরই মধ্যে হত্যা করা হয়েছে, তার মরদেহ পাওয়া গেছে এবং দাফনও করা হয়েছে।
মামলায় মাকসুদা অভিযোগ করেন, ২৯ মার্চ তার বড় ছেলে শুভকে মারধরের পর একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় তোলা হয়। ওই অটোরিকশার পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেলটি চালিয়ে নিয়ে যান রানা। এরপর শুভ ও তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান আর পাওয়া যায়নি।
অপহরণের এই ঘটনার ১৫-২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় রানার সঙ্গে শুভর তর্ক হয় এবং এরপর থেকেই রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিলো বলেও এজাহারে উল্লেখ করেছেন মাকসুদা।
সেই তর্কের ঘটনার দাবি করে শুভর বাবা মো. সোহেল একটি ভিডিও দ্য ডেইলি স্টারকে দিয়েছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গ্যারেজের সামনে রানাসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানে রানার সঙ্গে শুভর তর্ক হয় এবং একপর্যায়ে ছুরি হাতে রানা ও তার সহযোগীদের ধাওয়া দেন শুভ।
এজাহারে বলা হয়েছে, শুভ আগে এসি মেরামতের কাজ করলেও পরে এলাকার কিছু বখাটে যুবকের সঙ্গে মিশে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।
অপহরণ মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও শুভর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আজ তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ মার্চ উদ্ধার হওয়া রূপগঞ্জের সেই অজ্ঞাত মরদেহ ছবি দেখালে পরিবারের লোকজন শুভকে শনাক্ত করে বলে জানান ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন।
তিনি জানান, মামলাটি এখন অপহরণের পর হত্যা হিসেবে তদন্ত করা হবে।
এই মামলার প্রধান আসামি রানাসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।’
শুভর বাবা মো. সোহেলের অভিযোগ, অপহরণের রাতেই পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, পুলিশের সহযোগিতা পাননি। মামলা রেকর্ডও করা হয়েছে তিনদিন পর।
তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই সবার নাম বলছি। কারা তুইল্লা নিয়া গেছে তাদের নামও বলছি। কিন্তু পুলিশ পাত্তা দেয় নাই। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও ধরে নাই। শুরুতেই পুলিশ গুরুত্ব দিলে আমার ছেলেরে হয়তো জীবিত পাইতাম।’
তবে, তদন্তে কোনো প্রকার অবহেলা ছিল না বলে দাবি করেন পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে শুরু থেকে ঘটনাটির আপডেট ফলো রেখেছি। সারাদিন পুলিশ কাজ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছি। আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল ভিক্টিমকে উদ্ধার করা, আর জড়িতদের শনাক্ত করা। সবাই শুধু পুলিশের নেগেটিভটা দেখে। অথচ, আমরা শুরু থেকেই কাজ করেছি।’
২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত যুবদল নেতা মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগ্নে সাখাওয়াত ইসলাম রানা।
শুভকে অপহরণ ও নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে রানা বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই। আমাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। আমি পুলিশের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা সুষ্ঠু তদন্ত করুন। তাহলেই সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।’
যোগাযোগ করা হলে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ‘আমি যেকোনো হত্যার বিচার চাই। সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ যা উঠেছে তা তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার। তদন্তে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ তাকে অযথা ফাঁসাতে চাইছে বলে যদি প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রশাসন যেন তাকে হয়রানি না করে।’
তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে যেহেতু সে বিএনপির একটি সহযোগী সংগঠনের নেতা, সেক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।’