মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে কয়েক জেলায় ঈদ উদযাপন

স্টার রিপোর্ট

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে আজ শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জেলার বেশ কিছু গ্রামে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। নিজস্ব মতাদর্শ ও প্রথা মেনে এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ আজ ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।

চট্টগ্রামের শতাধিক গ্রামে ঈদ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের শতাধিক গ্রামে আজ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। মির্জাখীল দরবার শরিফের অনুসারীরা সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে মিল রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা রাখা শুরু করেন এবং আজ ঈদ পালন করছেন।

চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের এক গ্রামে ঈদের জামাত। ছবি: সংগৃহীত 

মির্জাখীল দরবারের সূত্রমতে, প্রায় ২৫০ বছর আগে সাতকানিয়ার মির্জাখীল গ্রামের হজরত মাওলানা মোখলেসুর রহমান জাহাঙ্গীরী (রহ.) বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে চাঁদ দেখা গেলে রোজা ও ঈদ পালনের ফতোয়া দেন। সেই থেকে তার অনুসারীরা আরব বিশ্বের চাঁদ দেখার ঘোষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। দরবারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. মাওলানা মাকসুদুর রহমান বলেন, আরব বিশ্বে চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আজ আমরা ঈদের নামাজ আদায় করেছি।

উত্তরের ৫ জেলার ৭৬ গ্রামে ঈদ উদযাপন

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে উত্তরের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার প্রায় ৭৬টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ আজ ঈদ উদ্‌যাপন করছেন।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের জেলেপাড়া গ্রামে ঈদ জামাতের ইমাম শাহীন ইসলাম জানান, সকালে বৃষ্টি হলেও সাড়ে ৮টার পর আবহাওয়া ভালো হয়ে যায় এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা ঈদের নামাজ আদায় করেন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের ঈদগাহ মাঠের সভাপতি আবদুল সাত্তার বলেন, ‘সৌদি আরব ইসলামের কেন্দ্র। সেখানকার রীতিনীতি অনুসরণ করা আমাদের কর্তব্য।’

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্ণেয়া গ্রামের বাসিন্দা সেকেন্দার আলী (৭০) জানান, তাদের গ্রামের ৭০টি পরিবার কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করে আসছে। লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান জানান, আগাম ঈদ উদ্‌যাপনকারী গ্রামগুলোয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

চাঁদপুরের অর্ধশতাধিক গ্রামে ঈদ

নিজস্ব ধর্মীয় মত অনুসরণ করে চাঁদপুরের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ আজ ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন করছেন। হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরিফে সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন দরবারের পীর মুফতি জাকারিয়া চৌধুরী আল মাদানী।চাঁদপুর

স্থানীয়দের দাবি, ১৯২৮ সাল থেকে সাদ্রা দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীর আল্লামা মোহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী বিশ্বের যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোজা ও ঈদ পালনের এ পদ্ধতি চালু করেন। হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলব, কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এই রীতি অনুযায়ী আজ ঈদ পালিত হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জের ১৫ গ্রামে ঈদ

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ আজ সকাল সাড়ে ৯টায় ঈদের জামাতে অংশ নিয়েছেন। মূলত আধারা ও শিলই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ আজ ঈদ উদ্‌যাপন করছেন। শিলই ইউনিয়নের উত্তরকান্দি মাঝিবাড়ি ঈদগাহ মাঠে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

এই তরিকার অনুসারীরা জানান, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে সেই হিসাব অনুযায়ী ঈদ উদ্‌যাপন করা উচিত বলে তারা বিশ্বাস করেন।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদ্‌যাপন হচ্ছে এবং শৃঙ্খলার জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঝিনাইদহের ৩ গ্রামে ঈদের জামাত

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার তিন স্থানে—উপজেলা মোড়, ভালকি ও নিত্যানন্দপুর গ্রামে আজ সকালে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উপজেলা মোড়ে ঈদের জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ। তিনি জানান, ২০০৫ সাল থেকে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন। এবারের জামাতে শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৯০ জন মুসল্লি অংশ নেন। মুসল্লিরা জানান, সৌদি আরবকে ইসলামের কেন্দ্রস্থল মনে করে তারা সেখানকার সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করেন।

পাবনার সুজানগরে এক গ্রামে ঈদ

প্রতিবছরের মতো এ বছরও আরব বিশ্বের সঙ্গে মিল রেখে পাবনা সুজানগর উপজেলার দুলাই বদনপুর গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় দুলাই বদনপুর নকিবিয়া দরবার শরীফে ঈদের নামাজ আদায় করেন আশপাশের এলাকাসহ বদনপুর গ্রামের ৫০-৬০টি পরিবারের লোকজন। নামাজ শেষে দেশের কল্যাণ ও শান্তি কামনা করে দোয়া করা হয়।

ফরিদপুরের ১২ গ্রামে ঈদ

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এক দিন আগেই পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার ১২টি গ্রামের মানুষ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মির্জাখিল দরবার শরিফের অনুসারী এসব গ্রামের প্রায় সহস্রাধিক পরিবার দীর্ঘকাল ধরে এই রীতি মেনে আসছেন। 

আজ শুক্রবার সকালে বোয়ালমারীর শেখর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়রা জানান, প্রায় দেড় শ বছর ধরে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করে আসছেন।

মৌলভীবাজারেও ঈদ উদযাপন

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে শুক্রবার মৌলভীবাজারের শতাধিক পরিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন করেছে। সকাল ৭টায় শহরের সার্কিট হাউস এলাকার একটি বাসভবনে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর মুসল্লিরাও অংশ নেন। উজান্ডির পির আবদুল মাওফিক চৌধুরী এই জামাতে ইমামতি করেন। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে সারা দেশে একই দিনে ঈদ উদ্‌যাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন মুসল্লিরা।

এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন দ্য ডেইলি স্টার এর চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, ঝিনাইদহ, পাবনা, ফরিদপুর ও মৌলভীবাজার সংবাদদাতা।