শুরু হচ্ছে নতুন সংসদের পথচলা, প্রত্যাশা আকাশচুম্বী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। নতুন এই সংসদকে ঘিরে প্রত্যাশা—এটি হবে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রাণবন্ত এক কেন্দ্র, যেখানে গঠনমূলক বিতর্ক, অর্থবহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
আজ বেলা ১১টায় প্রথম অধিবেশনে বসছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। আর তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে জাতীয় সংসদ ভবন। গত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে গণ্য ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সংসদগুলো প্রায়শই বর্জন, সারশূন্য বিতর্ক এবং ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তে কেবল সিলমোহর দেওয়ার প্রবণতার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাই নতুন সংসদ সেই পুরনো ধারা ভেঙে বেরিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী।
পথচলার শুরুতেই এই সংসদের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করা। সংবিধান অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে সংসদকে এই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন দিতে হবে অথবা তা বাতিল করতে হবে।
প্রথম দিনই সংসদ সদস্যরা একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবেন। নতুন এই সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’ গঠনের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ত্রয়োদশ সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, আগামীকাল যে সংসদ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে, তা হবে জনগণের সংসদ; যা মানুষের অধিকার, আশা ও স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়ে সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত এবং দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা।
‘আমরা জাতীয় গুরুত্বের বিষয়গুলোতে গঠনমূলক আলোচনা, যৌক্তিক তর্ক এবং সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ চাই। মতভেদ থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, বিরোধী দলগুলো একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে, যেন জাতি আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
প্রথম অধিবেশন
নুরুল জানান যে, বর্তমানে কোনো স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদে না থাকায় স্পিকারের আসনটি কিছুক্ষণের জন্য শূন্য রেখেই প্রথম অধিবেশন শুরু হবে।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাময়িকভাবে অধিবেশন পরিচালনার জন্য একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। নুরুল জানান, অন্য একজন সংসদ সদস্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করার পর মনোনীত সদস্য ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন এবং তার অধীনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন এবং এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
নুরুল জানান, বিএনপি সংসদীয় দল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদের প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেছে।
নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন এবং এরপর নতুন স্পিকার সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করবেন।
প্রথম অধিবেশনেই স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি উদ্বোধনী অধিবেশনের মেয়াদ এবং সংসদীয় কার্যসূচি নির্ধারণ করবে।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ এবং দেশ-বিদেশের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
আইনমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে পেশ করবেন। চিফ হুইপ জানান, এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের নিয়ে একটি 'বিশেষ কমিটি' গঠন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, 'কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে এবং কোনগুলো বাতিল হবে। আমরা ১২ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো পাস করার চেষ্টা করব।'
এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। তার ভাষণের পর সেদিনের মতো সংসদের বৈঠক মুলতবি করা হবে।
সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা
'জুলাই সনদ আদেশের' অধীনে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা পালনের কথা ছিল—আইনপ্রণেতা হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের কাজ ছিল ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লিখিত ৪৮টি সাংবিধানিক বিধান নিয়ে কাজ করা।
এর জন্য সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ নিতে হতো: একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি পরিষদের সদস্য হিসেবে।
তবে পরিষদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। নুরুল জানান যে, এই কাউন্সিল সংবিধানে স্বীকৃত নয়, আর এ কারণেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা এর সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
তিনি আরও বলেন, পরিষদকে যখন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরিষদ গঠনের প্রস্তাবটি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে যখন বিএনপির আইনপ্রণেতারা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী এবং সমমনা বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা উভয় পদের জন্যই শপথ নেন।
প্রত্যাশা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, অনেকেরই প্রত্যাশা যে অতীতের সংসদগুলোর স্থবিরতা ও ব্যর্থতার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
তিনি বলেন, 'সরকারি দল (ট্রেজারি বেঞ্চ) এবং বিরোধী দল উভয়কেই তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলগুলো এরইমধ্যে সংসদকে গঠনমূলক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাবটি বিএনপির একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সংসদকে কার্যকর করতে এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে প্রতিটি বিলের ওপর যথাযথ যাচাই-বাছাই ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদ বর্জন সংস্কৃতি, বিরোধীদলীয় নেতাদের অনুপস্থিতি এবং ‘অসংসদীয় ভাষা’ ব্যবহারের অবসান ঘটবে।
আইন প্রণয়ন সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া সত্ত্বেও, সংসদ সদস্যরা প্রায়শই এই বিষয়ে সীমিত আগ্রহ দেখিয়েছেন অথবা অর্থবহ সংসদীয় আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা জ্ঞানের অভাব প্রকাশ করেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, একাদশ সংসদে মোট কার্যসময়ের মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ আইন প্রণয়নে ব্যয় করা হয়েছিল। দশম সংসদে এই সময় ছিল ১২ শতাংশ এবং নবম সংসদে ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।
সংসদ বর্জন
ঘন ঘন সংসদ বর্জন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের একটি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পঞ্চম সংসদে আওয়ামী লীগ ৩৪ শতাংশ, সপ্তম সংসদে বিএনপি ৪৩ শতাংশ, অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ ৬০ শতাংশ এবং নবম সংসদে বিএনপি ৮২ শতাংশ কার্যদিবস বর্জন করেছিল।
বিরোধীদলীয় নেতারা পঞ্চম সংসদে ৭০ শতাংশ, সপ্তম সংসদে ৯৩ শতাংশ, অষ্টম সংসদে ৮৮ শতাংশ, নবম সংসদে ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ, দশম সংসদে ৪১ শতাংশ এবং একাদশ সংসদে ৮০ শতাংশ কার্যদিবস অনুপস্থিত ছিলেন।
২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
দশম সংসদে জাতীয় পার্টির তিন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য একই সঙ্গে মন্ত্রিসভায় পদ পাওয়ার মাধ্যমে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী দুই সংসদেও বিরোধী দল হিসেবে এই দলটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমিত।
সংসদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিজাম আহমেদ বলেন, তিনি নতুন এই সংসদ নিয়ে 'সতর্ক আশাবাদ' ব্যক্ত করছেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী না হয়ে বরং পেশাজীবী হিসেবে এসেছেন, যা সংসদীয় কাজে তাদের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, 'দলের পক্ষ থেকেও তাদের প্রস্তুত করা, দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং সামনের দায়িত্বের জন্য একটি সুশৃঙ্খল টিম গঠন করার বিষয়ে এক ধরনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।'