‘ভুল তথ্যে’ দোকান কর্মচারীকে তুলে এনে জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগ, মুচলেকা নিয়ে মুক্তি
চট্টগ্রামে একটি মার্কেটের কর্মচারীকে ঈদের আগে আটক করেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজমের (সিটি) বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট।
পরবর্তীতে তাকে ‘ভুল তথ্যে’ আটক করা হয়েছিল জানিয়ে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী, পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ মার্চ ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকা থেকে আরিফুল ইসলাম (২৬) নামের ওই কর্মচারীকে তুলে নিয়ে যায় সোয়াট সদস্যরা।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে কাউন্টার টেররিজমের সেলে রাখা হয়। তবে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা কোন ঘটনায় তাকে আটক করে আবার ছেড়ে দেওয়া হয়, তা জানেন না ভুক্তভোগী কিংবা তার পরিবার।
পুলিশের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্দরনগরীর চন্দনপুরা এলাকায় চাঁদা দাবিতে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনার পর সিএমপির কাউন্টার টেররিজম শাখা নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আরিফের মতো অনেককে তুলে নিয়ে যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
নগরীর খুলশী থানা, বায়েজিদ থানার পুলিশ কিংবা ডিবি সদস্যরা আটকদের কয়েকদিন রেখে আবার ছেড়ে দেন।
বিষয়টি নিয়ে মহানগর পুলিশের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্র বলছে, ওই গুলির ঘটনার পর কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনেককে কয়েকদিন পর্যন্ত রেখে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিভিন্ন থানায় মামলা নিয়ে চালান করে দেওয়া হয়।
তবে সমালোচনা এড়াতে এই বিষয়গুলো খুবই গোপনীয়ভাবে করা হচ্ছে যা তদারকি করছেন কাউন্টার টেররিজমের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ বদিউজ্জামান।
ভুক্তভোগী আরিফুল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করার কথা বলে আমাকে সোয়াট সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে যাওয়ার পর আমার পরিবারকে জানালে তারা আসেন। যাচাই-বাছাই শেষে আমাকে ভুল তথ্যের জন্য ধরে আনা হয়েছে জানিয়ে মুচলেকা নিয়ে কয়েকঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়।'
আরিফুলের বড়ভাই ওসমান আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার ভাইকে ভুল তথ্যে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে আমাদের নাম-ঠিকানা যাচাই করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।'
ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নগরীর বায়েজিদ এলাকার নাঈম মাসুদ নামের এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর বায়েজিদ বোস্তামী থানার আলোচিত সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী বাবলা গত বছরের ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপিপ্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
বায়েজিদ বোস্তামী থানা সূত্রে জানা গেছে, নাঈম বায়েজিদের অক্সিজেনের একটি বড় পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা দেখাশোনা করেন।
নাঈম মাসুদকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি জাহিদুল কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাবলা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে নাঈমকে।'
তাকে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল জানতে চাইলে ওসি বলেন, 'আমার মনে নেই।'
তুলে এনে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির কাউন্টার টেররিজমের উপকমিশনার (ডিসি) বদিউজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে সিএমপি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলুন। তিনি পুরো বিষয়টি জানেন। আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না এবং বলতে চাই না।'
এ বিষয়ে জানতে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘হাই ভ্যালু টার্গেট আসামি যারা আছেন, তাদেরকেই আমরা ধরি। তাদের ধরার জন্য আমরা এনগেজ করি। এখানে মুচলেকা দিয়ে আসামি ছাড়া হয়েছে—এমনটি নয়। দুয়েকটি কেস, যেগুলো নাম-ঠিকানা ভুলের কারণে হতে পারে। তবে এই ধরনের ঘটনা খুবই ক্ষীণ। আটকে রাখার খবরও ভিত্তিহীন।’
সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘সাজ্জাদসহ বিভিন্ন নামে যে বাহিনীগুলো আছে, সেসব বাহিনীতে ২০ থেকে ২২ বছরের ছেলেদের শুটার হিসেবে নিয়ে আসে, তারাই হাই ভ্যালু টার্গেট। আমরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ধরছি।’
উল্লেখযোগ্য আসামি কাকে ধরেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রচুর আসামি ধরেছি। সরোয়ার বাবলার মার্ডারের পরে আর কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। তারা স্লিপার সেলের মতো কাজ করে। তাদের আমরা ডিস্টার্ব করছি।’
‘আমি কমিশনার হিসেবে যোগদান করার পরে রায়হান ছাড়া বাকি সব আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। ছোট সাজ্জাদ, হাসান, ইমন, বোরহান সবাইকে ধরেছি। ফটিকছড়ির ইমনকে কক্সবাজার থেকে ও বোরহানকে চান্দগাঁও থেকে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে গেছেন,’ যোগ করেন তিনি।