শতবর্ষ পরও রশীদ করীমকে কেন মনে রাখব

মাওলা প্রিন্স
মাওলা প্রিন্স

রশীদ করীমের পুরো নাম রশীদ করীম গোলাম মুরশেদ। জন্ম ১৯২৫ সালে কলকাতায়, ৩০ নম্বর ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে। তার মা সৈয়দা আমাতুজ জোহরা ছিলেন গৃহিণী। বাবা মৌলভি আবদুল করীম ছিলেন সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। দাদা খান সাহেব আবদুর রাহিম ছিলেন ক্যালকাটা পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর। নানা সৈয়দ আবদুল মালেক ছিলেন এডিশনাল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের পূর্বপুরুষ আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন সোনারগাঁয়ে। পরে বসতি গড়েন যশোরে। যশোর থেকে কলকাতায়। দেশভাগের অভিঘাতে ও চাকরির সুবাদে রশীদ করীম ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ স্থায়ীভাবে চলে আসেন ঢাকায়। বড় ভাই আবু রুশদ মতিনউদ্দিন ঢাকায় আসেন আরও আগে। শৈশবে বাবার বদলি চাকরির কারণে রশীদ করীম থেকেছেন লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুষ্টিয়ায়।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায় হলেও রশীদ করীমের কল্পনা, কর্ম ও স্মৃতির ভূগোলে জীবন্ত হয়েছে পূর্ব বাংলা ও পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ। পারিবারিকভাবে পাওয়া ভাষা উর্দুকে পরিহার করে বাংলাকে নিজ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে আবু রুশদের মতো রশীদ করীমও সন্তুষ্ট থাকেননি; তিনিও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নকল্পে আত্মনিয়োগ করেছেন নিবিষ্টচিত্তে। পাকিস্তান সরকার যখন ইসলাম ধর্মভিত্তিক সাহিত্যচর্চাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে দাঁড় করাতে হয়েছিলেন উন্মুখ।

দেশি রবীন্দ্র-শরৎ আর বিদেশি রুশ, ফরাসি, জার্মান ও আমেরিকান সাহিত্য প্রভাব বিস্তার করেছে রশীদ করীমের সাহিত্যচিন্তায় ও চরিত্রনির্মাণে। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, ডিফো, ফিল্ডিং, টমাস হার্ডি, জেন অস্টেন, ফ্লবেয়ার, ভিক্টর হিউগো, বালজাক, রোমাঁ রোলাঁ, আনাতোল ফ্রাঁস, আঁদ্রে মারোয়া, আলবেয়ার কামু, জঁ পল সার্ত্র আর কাফকা পড়া রশীদ করীম বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যে শিল্পাদর্শ সূচিত করেছেন, তা ছিল নিঃসন্দেহে স্রোতবিরুদ্ধ। বিষয় ও আঙ্গিক নির্মাণ, নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য ও নতুনত্ব কথাশিল্পী রশীদ করীমকে পৃথক করেছে অন্যদের থেকে।

ষাটের দশকের সূচনালগ্নে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় রশীদ করীমের প্রথম উপন্যাস 'উত্তম পুরুষ'। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস 'প্রসন্ন পাষাণ'। রশীদ করীম যে স্রোতের বিরুদ্ধচারী কথাশিল্পী, তা উপন্যাস দুটি বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি হবে অনেকটা। উপন্যাস দুটি কলকাতার ভূগোলে পরিবর্ধিত। দেখুন, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কথাশিল্পীরা যখন দেশীয় টানে ও আর্থরাজনৈতিক চৈতন্যে বাংলাদেশের ভূগোলের প্রতি আবেগ-উচ্ছ্বাস-ভালোবাসা সঞ্চার করতে সচেষ্ট ছিলেন, তখন রশীদ করীম খুব সম্ভব এককভাবেই কলকাতা নগরীকে করলেন চৈতন্যের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশে কলকাতা নগরীর ভূমিকাকে তিনি খর্ব বা অস্বীকার করেননি।

তিনি দেখিয়েছেন কলকাতাভিত্তিক 'উত্তম পুরুষ' ও 'প্রসন্ন পাষাণ' উপন্যাসের অস্তিত্বসন্ধানী ও আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী শাকের-তিশনা-কামিলরা পরবর্তীতে বিস্তৃত, বুনট ও সম্প্রসারিত হয়েছে ঢাকা শহরসংলগ্ন 'আমার যত গ্লানি', 'প্রেম একটি লাল গোলাপ', 'মায়ের কাছে যাচ্ছি', 'বড়ই নিঃসঙ্গ', 'চিনি না', 'শ্যামা', 'পদতলে রক্ত' প্রভৃতি উপন্যাসের চরিত্রসমূহে। আমাদের গবেষণা ও সমালোচনাসাহিত্যের বড় ত্রুটি, স্থানিক প্রেক্ষাপট কলকাতা হওয়ায় আমরা রশীদ করীমের এই উপন্যাস দুটিকে প্রায়ই বাংলাদেশের উপন্যাস পর্বে যুক্ত করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছি। আমাদের মেধা-মনন স্বচ্ছ ও শানিত হলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। শুধু নির্দিষ্ট ভূগোলে পল্লবিত স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক চেতনার ওপর যে বাস্তব জীবন ও উপন্যাসের চরিত্র-চারিত্র্য-মনন গঠন হয় না, এটা স্থূল পণ্ডিতদের বোঝাবে কে?

বৃহত্তর অর্থে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কথাশিল্পীগণ গ্রামীণ জীবনকে উপজীব্য করলেও রশীদ করীম অগ্রগামী হয়েছেন নগরজীবনের স্বরূপ সন্ধানে। আধুনিক শিক্ষা, বিশ্বদর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতায় সমৃদ্ধ যে নাগরিক চেতনা ও নগর-চরিত্র, তা রশীদ করীমের উপন্যাসে হয়েছে শিল্পিত। তার চরিত্ররা শিক্ষিত, সচ্ছল, স্বাবলম্বী ও ক্ষুধামুক্ত। তাই তারা শিল্প-সাহিত্যমনা, যুক্তিবাদী, দেশ-রাজনীতিঘনিষ্ঠ ও শরীরী অবয়বে আকর্ষণীয়। যারা ক্ষুধার্ত-বুভুক্ষু-অশিক্ষিত, তারা ব্যক্তিত্ববান ও রাজনীতিচেতন হবে কীভাবে? যারা দিনের পর দিন অনাহারে ভুখা পেটে থাকে, তাদের মন-মনন-দেহ কীভাবে হয় পুষ্পিত পূর্ণ? তাদের যৌবন, তাদের বীরত্ব কীভাবে উথলে ওঠে আমাদের কথাসাহিত্যে, তা রশীদ করীমের প্রশ্ন। অর্থাৎ, তিনি নগরজীবনের বাহির নয়, অন্তঃকরণকে নিঃসঙ্গভাবে তুলে এনেছেন কার্যকারণসূত্রে।

চরিত্রনির্মাণে রশীদ করীম ভেঙে দিয়েছেন ব্যাকরণের সূত্র। ব্যাকরণে পুরুষ তিন প্রকার; যথা: উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ও নাম পুরুষ এবং এই উত্তম পুরুষ হলো একবচনে 'আমি' আর বহুবচনে 'আমরা'। যেকোনো ব্যক্তির দৃষ্টি ও যুক্তিতে সে বা তিনি সব সময়ই শ্রেষ্ঠ বা ভালো; তাই 'আমি' মাত্রই উত্তম পুরুষ। 'আমি' কখনো অধম-মধ্যম-ইতর হতে পারে না। অথচ, উত্তমপুরুষে লেখা রশীদ করীমের উপন্যাসগুলোর নায়ক 'আমি' নিজেকে কখনোই উত্তম দাবি করেনি। উত্তম নয়ও। 'উত্তম পুরুষ' উপন্যাসের শাকের আত্মপরিচয় বর্ণনে বলেছে, 'আমি আদর্শ পুরুষ নই...যাকে বলে আত্মকেন্দ্রিক, আমি সেই বহু নিন্দিত জীব।' আবার, 'আমার যত গ্লানি' উপন্যাসে এরফান মিঞা ওরফে এরফান চৌধুরী নিজের সম্পর্কে বলে, 'আমি লোকটা আসলে একটা খচ্চর'।

পাষণ্ড-পিশাচ-অনাদর্শ চরিত্রের রূপান্তর ঘটার প্রচলন রয়েছে আমাদের নাটক ও কথাসাহিত্যে। অমানুষের 'মানুষ' হয়ে ওঠা, কিংবা বিবেকহীনের 'বিবেক' জাগ্রত হওয়ার দৃশ্য আমাদের সাহিত্যে প্রচুর। কিন্তু রশীদ করীম এই প্রথাসিদ্ধ পথ গ্রহণ করেননি। প্রাতিস্বিকতায় এগিয়েছেন নতুন পথে। যে কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ উপন্যাস 'আমার যত গ্লানি' পর্বেও খচ্চর এরফান মিঞা ওরফে এরফান চৌধুরীর চরিত্রের কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি। সে ভয় ও কাপুরুষতার বৃত্ত ভেদ করে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে স্বাধীনতার পক্ষে 'জয় বাংলা' উচ্চারণ করতে পারেনি।

অনুরূপ, পুঁজিবাদী জীবনবাস্তবতায় লেখা 'প্রেম একটি লাল গোলাপ' উপন্যাসের রানু ও উমরের প্রেম আদর্শিক নয়। 'চিনি না' উপন্যাসের সুলেমান কিংবা 'পদতলে রক্ত' উপন্যাসের রেখাও মহৎ হতে পারেনি। রেখার পরিচয় নৃত্যশিল্পী হলেও বস্তুত সে একটা দেহজীবী নর্তকী। আর 'মানুষের ইমোশনটাই সব নয়, মাথাটাও কাজ করে'—বক্তব্য নিয়ে অগ্রসর হওয়া সুলেমান ধর্ষণ করে যুদ্ধে যাওয়া বাল্যবন্ধু বিমলের সুন্দরী স্ত্রী মন্দিরাকে। 'আমি' ভূমিকায় অবতীর্ণ সুলেমান তার বাল্যসখীর মূল্যায়নে একটা 'স্কাউন্ড্রেল'; যা সুলেমানের জবানিতে পাঠকমহল জানতে পারে। তারপরও রশীদ করীমের সৃষ্ট চরিত্রগুলো পাঠকের ভালোবাসা হারায় না। বরং অর্জন করে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি।

কেন এই ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি? কারণ, আমাদের কথাসাহিত্যে একমাত্র রশীদ করীমই বলতে পেরেছেন, 'আমি কোনো বাস্তবকে আদর্শায়িত করি নি অথবা কোনো আদর্শকে বাস্তবায়িত করি নি।' উক্তিটি শুধু 'উত্তম পুরুষ' প্রসঙ্গে নয়, তার সব উপন্যাস সম্পর্কেই সত্য। তিনি 'মায়ের কাছে যাচ্ছি' উপন্যাসে কামরুদ্দীন আহমদ ওরফে কামরু সাহেবের জবানিতে বলেছেন, 'আমি তো জানি আমি একজন সাধারণ নির্দলীয় মানুষ মাত্র!'; আবার 'চিনি না' উপন্যাসে সুলেমানের কণ্ঠে শুনি রশীদ করীমের জীবনদর্শনের সারকথা, 'কোনো মানুষকেই আমি তার আদর্শ বা মতবাদের জন্য অভিযুক্ত করি না—সেটা আমার আদর্শ বা মতবাদের যতোই বিরোধী হোক না কেন। বরং নিষ্ঠার সঙ্গে মতকে আঁকড়ে থাকেন বলে শ্রদ্ধা করি।'

অর্থাৎ কল্পিত-কাল্পনিক-পক্ষপাতদুষ্ট, আরোপ আর বিভাজনের রীতি থেকে রশীদ করীম ছিলেন পুরোপুরি মুক্ত। চল্লিশের দশক থেকে মুক্তিযুদ্ধোত্তর দীর্ঘ সময়াবহে মুসলিম বাঙালি নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষের প্রবহমান জীবনধারার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত ইতিহাস ও আর্থরাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি তিনি অবলোকন করেছেন গভীরভাবে এবং তা তুলে এনেছেন অত্যন্ত নিরপেক্ষ, নির্মোহ ও স্বচ্ছরূপে। নাগরিক বৈদগ্ধ্যপূর্ণ ভাষায়, অলংকারবর্জিত চিত্রকল্পে আর ছেঁড়া ছেঁড়া কথামালায় তিনি ব্যক্তি-চরিত্রের আত্মকথন ও আত্মবিশ্লেষণে যে অখণ্ডতায় পৌঁছে দেন, তা আর ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি জাতির পূর্ণ ইতিবৃত্ত, একটি জাতিগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ ইতিহাস-আখ্যান। স্কেচধর্মী ছোট্ট 'শ্যামা' কিংবা এপিকশৈলী বৃহৎ 'মায়ের কাছে যাচ্ছি'—যেকোনো উপন্যাসের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।

ক্লাসিক রীতিতে রচিত রশীদ করীমের উপন্যাসে ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, পুঁজিবাদী বিরূপ বাস্তবতা, অচরিতার্থ বাল্যপ্রেম, স্মৃতিকাতরতা, আত্মজৈবনিক অনুষঙ্গ, বিশ্বসাহিত্যের অনুরণন, ইতিহাস ও রাজনীতির সংবেদ, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি হয়েছে বিষয়গত উজ্জ্বল উপকরণ। কিন্তু তিনি বস্তুত মানুষকেই করেছেন আরাধনা। আধুনিক শিক্ষিত নাগরিক মানুষের যাপিত জীবন, জীবনজটিলতা ও জীবনাদর্শ উল্টে-পাল্টে অনুসন্ধান করবার ব্রত লক্ষ করা যায় তার কথাসাহিত্যে। সেই ব্রতে তিনি কী খুঁজে পেলেন? যা পেলেন, যা দেখালেন, যা বললেন, যা বলতে চাইলেন, যে বোধের সন্ধান দিলেন, তার মূল কথা হলো—মানুষের আচরণ চিরকালেই বহুলাংশে আনপ্রেডিক্টেবল বা অনির্দেশ্য, তাই মানুষের নীতি-আদর্শও অনিশ্চিত ও অনির্দেশ্য; বিশেষ একটি আদর্শ বা নীতির সরলরেখা ধরে কোনো মানুষই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অগ্রসর হয় না। এখানেই কথাশিল্পী রশীদ করীম বাংলাদেশের অন্যান্য কথাশিল্পী থেকে পৃথক, স্বতন্ত্র, আলাদা ও আধুনিক এবং এই বোধ-বিবেচনা-জ্ঞানের সার্থক রূপায়ণের জন্যই কথাশিল্পী হিসেবে তিনি নিঃসঙ্গ ও স্রোতের বিরুদ্ধচারী।

মাওলা প্রিন্স: রশীদ করীম গবেষক ও অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়