শতবর্ষে

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখাগোষ্ঠীর শিখা

আহমেদ মাওলা
আহমেদ মাওলা

চিন্তা চর্চার খোলা পদ্ধতি হচ্ছে প্রশ্ন করা। প্রশ্নের পুঁজি হচ্ছে জ্ঞান-বুদ্ধি-যুক্তি। নির্বোধ ও যুক্তিহীন মানুষের সঙ্গে আর যা-ই হোক, তর্ক চলে না। সমাজে পরস্পরবিরোধী মতাদর্শ থাকবে, ভিন্ন মতের সঙ্গে দ্বান্দ্বিকতা থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক। মার্কসীয় বস্তুবাদের সূত্র অনুযায়ী দ্বন্দ্বই সমাজ বিকাশের মূল বা প্রগতি। দ্বন্দ্ব ছাড়া বস্তুরও বিকাশ বা রূপান্তর হয় না।

মুশকিল হচ্ছে, আমাদের সমাজে দ্বান্দ্বিকতা কমছে এবং এটাই ক্ষতিকর। ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীল, স্বস্তিকর সহাবস্থান কোথাও নেই। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি—সব জায়গায় চলছে নির্লজ্জ জোর-জবরদস্তি, নিজের মতকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কুৎসিত মচ্ছব। তাহলে মুক্তচিন্তা চর্চা কোথায়? 'বুদ্ধির মুক্তি' ঘটবে কীভাবে?

'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উপলক্ষে পেছন ফিরে তাকিয়ে যদি জিজ্ঞাসা চিহ্নের সামনে দাঁড়াই, তত্ত্ব-তালাশ করি, তখন মন খারাপ করা একরাশ হতাশাই কেবল ঘিরে ধরে।

সমাজ বদলে দেওয়ার মতো চিন্তক বা দার্শনিক চোখে পড়ে না। কোনো বিজ্ঞানী নেই, আবিষ্কার নেই, উৎকর্ষ নেই, আছে কেবল মস্তিষ্কহীন সারি সারি নেতা, পাড়ায় পাড়ায় পাতি নেতার আত্মম্ভরিতা—ঠুনকো গৌরব নিয়ে যারা আকাশছোঁয়া আস্ফালন করে।

বরং দিন শেষে বাঙালি মুসলমানকে দেখি আত্মদ্বন্দ্বে পরাজিত, শতাব্দীব্যাপী লাঞ্ছিত, ঐতিহাসিকভাবে দুর্ভাগা এক জনগোষ্ঠী হিসেবে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তর থেকে মুসলমান জনগোষ্ঠীর গ্লানিকর জীবন শুরু হয়, তারপর ১৭৯২ সালে লর্ড কনওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে হিন্দু জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এই শ্রেণিতে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না।

ফলে আর্থিকভাবে দুর্বল, ক্ষমতাচ্যুত মুসলমান সমাজ নিজস্ব সংস্কার বশত 'হারাম' ও 'ইহুদি-নাসারা'দের ভাষা ইংরেজি শিক্ষা থেকে বিরত থাকায় আর্থিকভাবে দেউলিয়া, বিদ্যাবুদ্ধির চর্চায় পশ্চাৎগামী ও সংস্কৃতিগতভাবে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরাজ ক্ষমতা নিজ হতে তুলে নিলে ভারতের জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়। ইংরেজ অনুগত জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি তখন বিকশিত, বিদ্যাশিক্ষায় অগ্রগামী। ইংরেজদের দপ্তরে অনেকের জুটে যায় চাকরি। ব্যবসা-বাণিজ্যে, আর্থিক সচ্ছলতার কারণে বর্ণ-হিন্দুদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বেড়ে যায়।

এই উপনিবেশিক সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি ইউরোপীয় চিন্তাধারায় নিজেদের নেতৃত্বে সভা, সমিতি, সংঘ, পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

১৮৮৬ সালে 'ইন্ডিয়ান কংগ্রেস' এবং ১৮৯৪ সালে 'বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতি' গড়ে উঠলে চিন্তাচর্চার নতুন পাটাতন তৈরি হয়। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘু ও পশ্চাৎপদ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কয়েকজন তরুণ 'মুসলিম সাহিত্য সমিতি' গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

কবি মাজম্মেল হক, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, মাওলানা আকরম খাঁ, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আফজালুল বাসার, কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ প্রমুখের চেষ্টায় ১৯১১ সালে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি' গড়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্য ছিল আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষা থেকে ধর্মশাস্ত্র অনুবাদ করা, প্রাচীন পুঁথি, ইতিহাস, সাহিত্য অনুবাদ, প্রকাশ-প্রচারের মাধ্যমে বাংলাভাষার সমৃদ্ধি, আত্মপরিচয় নির্মাণ, জ্ঞান-উপলব্ধিকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।

'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা' (১৯১৮) প্রকাশিত হয় এবং এই পত্রিকায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অনেক লেখা, করাচি থেকে পাঠানো সৈনিক কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কবিতা 'মুক্তি' (১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট) এবং 'হেনা' (১৩২৬, কার্তিক) 'ব্যথার দান' প্রকাশিত হয়।

পরে করাচি থেকে ফিরে নজরুল 'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি'র অফিসেই ঠাঁই নেন। নজরুল লিখেছেন, 'সেদিন যদি সাহিত্য সমিতি আমাকে জায়গা না দিত, তবে হয়তো কোথায় ভেসে যেতাম তা আমি জানি না।… আশ্রয় না পেলে আমার কবি হওয়া হতো কিনা আমার জানা নেই।'

উনিশ শতকে কলকাতায় যে রেনেসাঁ ঘটেছিল, সেই নবজাগরণে বাঙালি মুসলমান সমাজ ছিল অনুপস্থিত। তার কারণ হিসেবে যে মিথ প্রচলিত, তা হচ্ছে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষায় পশ্চাৎপদ। এটা যে ভুল এবং বেহুদা কথা, আনিসুজ্জামান ও আহমদ শরীফ তাদের বহু লেখায় উদাহরণসহ তুলে ধরেছেন।

কলকাতার 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র (১৯১১) সঙ্গে ঢাকার 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'কে (১৯২৬) বাঙালি মুসলমানের ধারাবাহিক চিন্তাচর্চা ইতিহাস হিসেবে মিলিয়ে যদি পাঠ করা যায়, তবে এর একটা সংস্কৃতিগত তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।

শতাব্দী পেরিয়ে আজ বাঙালি মুসলমানের ধারাবাহিক চিন্তাচর্চার একটা ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস বোধ করি প্রয়োজন আছে। ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের জায়গা থেকে যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে বিচার করতে হয় কালের সাপেক্ষে।

প্রথমে আমরা দেখবো, 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠন করার প্রয়োজন হলো কেন? নিশ্চয় তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার মধ্যে এমন কিছু উপাদান বিরাজমান ছিল যে, ওই সমাজের প্রাগ্রসর একটা চিন্তক দলের কাছে মনে হয়েছে, স্বসমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন জরুরি এবং প্রথাবদ্ধতা, পশ্চাৎপদতা থেকে বেরিয়ে আসতে সংগঠিত শক্তির কার্যকর প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে তখন উপনিবেশিক শাসনের কারণে সম্প্রদায়গত সামাজিক শক্তি ছিল অধিক কার্যকর। সেই সময়ের পূর্ববাংলা, বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের প্রথম উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার দরজা উন্মুক্ত হয়।

উনিশ শতকে কলকাতায় যে রেনেসাঁ ঘটেছিল, সেই নবজাগরণে বাঙালি মুসলমান সমাজ ছিল অনুপস্থিত। তার কারণ হিসেবে যে মিথ প্রচলিত, তা হচ্ছে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষায় পশ্চাৎপদ। এটা যে ভুল এবং বেহুদা কথা, আনিসুজ্জামান ও আহমদ শরীফ তাদের বহু লেখায় উদাহরণসহ তুলে ধরেছেন।

ইংরেজ আমলের পরের সময় মুসলমান অধ্যুষিত বাংলা ছিল অবহেলিত। এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ পেশাগতভাবে ছিল চাষি, ধর্মগতভাবে আচারসর্বস্বতায় বন্দি—বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগই ছিল না।

মুসলমান জনগোষ্ঠীর কল্যাণচিন্তা, মানসিক সমৃদ্ধি ও জ্ঞানগত অগ্রগতির কথা ভাবা শুরু হয়েছে ইতিহাসের এই বিশেষ প্রেক্ষাপটে। এই প্রেক্ষাপটের আবার দুটি দিক আছে—একটা হিস্টোরিক্যাল দিক, অন্যটি থিওরিটিক্যাল দিক।

১৮৮৬ সালে 'ইন্ডিয়ান কংগ্রেস', ১৮৯৪ সালে 'বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতি', ১৯১৫ সালে 'হিন্দু কলেজ' প্রতিষ্ঠায় হিন্দুদের জন্য জ্ঞানচর্চার নতুন পাটাতন তৈরি হয়। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় গঠিত হয় 'মুসলিম সাহিত্য সমিতি'। কলকাতার 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র (১৯১১) সঙ্গে ঢাকার 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'-এর (১৯২৬) চিন্তাচর্চার তাৎপর্য তাই কালের সাপেক্ষে বিশ্লেষিত হওয়া দরকার। দুটি সংগঠনের উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন হলেও চিন্তাগত ফারাক ছিল। মানুষের মৃত্যু হয়, সংগঠনও একসময় হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনো চিন্তাচর্চার মৃত্যু হয় না।

'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি'র তুলনায় 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' বা শিখা গোষ্ঠীর বুদ্ধি-মুক্তি আন্দোলন ছিল কালেক্টিভ থিংকিং ওয়ার্কের অংশ। চিন্তার দিক থেকে শিখাগোষ্ঠী ছিল সমন্বয়বাদী।  খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গলপ্যাক্ট থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, বিভেদপূর্ণ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয়—যা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আকস্মিক মৃত্যুতে অবসিত হয়। সেই সময় ওরিয়েন্টালিস্ট ও কলোনিয়ালিস্ট দৃষ্টির দ্বান্দ্বিক অবস্থার মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনই প্রধান বিষয় ছিল। উদারনৈতিক মানবতাবাদী ধারণা বা লিবারালিজমের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত নয়। তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য। এই উদারনৈতিক ধারণার কিছু সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা আছে, এই ক্রিটিক কম দেখা যায়।

'মুসলিম সাহিত্য সমাজের' কাজকে মোটা দাগে দুইভাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম যোগ দিয়ে 'খোশ আমদেদ' উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এই তথ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নজরুল ছিলেন তাদের প্রেরণার প্রধান উৎস। মুসলমানরা যে কেন্দ্রীয় স্বরে কথা বলতে পারে, শিখাগোষ্ঠী এই ধারণা পেয়েছিলেন নজরুল থেকে।

তবে এখানে বলা প্রয়োজন, নজরুল ছিলেন রাজনীতি প্রবণ, বিপ্লবাত্মক অপর দিকে শিখাগোষ্ঠী ছিল ঘোষিতভাবে অরাজনৈতিক, বিপ্লব-বিরোধী। দ্বিতীয়ত, যে ভাষ্যগুলো তৈরি হয়েছে কলোনিয়াল মর্ডানেটির গভীর থেকে এবং মুসলিম কমিউনিটির প্রতি 'অপরায়নের' বোধ থেকে—কাউকে দায়ী না করে ইতিহাস পাঠ থেকে বলা যায়, এটা পরিস্থিতির ফল মাত্র।

শিখাগোষ্ঠীর অবদান দুইভাবে বিবেচনা করা যায়—১. কালচারাল চিন্তা, ২. সমন্বয়বাদী চিন্তা।

কালচারাল চিন্তার দিক থেকে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর 'সংস্কৃতি কথা', কাজী মোতহার হোসেনের 'সঞ্চরণ', কাজী আবদু ওদুদের 'শাশ্বতবঙ্গ' গ্রন্থকে উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। যদিও তাদের অনেক অভিমত ও ভাবাদর্শ সম্পর্কে ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন তোলা যায়। বিশেষত মোতাহের হোসেন চৌধুরীর 'সংস্কৃতি কথা' মোতাহার হোসেনের 'সঙ্গীত চর্চায় মুসলমান' প্রবন্ধ নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। তিরিশ দশকের মাঝামাঝি 'মুসলিম সাহিত্য সমাজের' তৎপরতা থেমে গিয়েছিল, কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবুল ফজল 'বুদ্ধির মুক্তি' প্রবন্ধে লিখেছেন, 'গোড়া থেকেই গোঁড়ারা মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিরোধী ছিল। চিন্তার ক্ষেত্রে কায়েমি স্বার্থের বুনিয়াদ সবচেয়ে শক্ত। এরপর এরা রীতিমত বিরুদ্ধতা করতে লাগলেন সাহিত্য সমাজের। ছাত্রদের বড় দল সাহিত্য সমাজের বিরুদ্ধে চলে গেল। মুসলিম হলে মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশন নিষিদ্ধ হল।'

'বাধ্য হয়ে জগন্নাথ হল ও লিটন হলে সভা করতে হল। সমাজ নেতাদের কাছে আবুল হুসেন ও আবদুল ওদুদকে সাহিত্য সমাজের নেতা হিসেবে জবাবদিহি করতে হল। নবাব বাড়িতে সভা বসল। ইসলাম গেল, মুসলিম সমাজ ডুবল—এ ধরনের একটা মনোভাব বিরুদ্ধ শিবিরে ছড়িয়ে পড়ল। যদিও সাহিত্যসমাজের তৎপরতা থেমে যাওয়ার মূল কারণ এটা নয়। উৎসাহী কর্মীরা পাস করে অনেকে কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ল। সাহিত্য সমাজের কর্মযোগী আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দিলেন। শিখা'র সম্পাদক হিসেবে যার নামই ছাপা হোক না কেন, বেশিরভাগ খরচ বহন করতেন আবুল হুসেন। ভাবযোগী কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতায় চলে গেলেন। কাজী আনোয়ারুল কাদীর সাহিত্য সমাজের সূচনায় ছিলেন ঢাকা কলেজের দর্শনের অধ্যাপক, পরে বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শক হয়ে কলকাতা চলে গেলেন। শিখা'র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।'

শিখাগোষ্ঠী যে সমন্বয়বাদী ও ঘোষিতভাবে অরাজনৈতিক ছিল, তার প্রমাণ এ গোষ্ঠীর কেউ পরবর্তীতে চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেননি। অন্যদিকে স্বাতন্ত্রবাদীদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল পাকিস্তান সৃষ্টি। কলকাতায় গঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি' (১৯৪২), ঢাকায় গঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ' (১৯৪২) যুক্ত ব্যক্তিরা ছিলেন মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী। ঐতিহাসিক অবদান বিবেচনার ক্ষেত্রে 'সমন্বয়বাদী' ও 'স্বাতন্ত্র্যবাদী' দুইটি শব্দ দিয়ে পৃথক বিচার-বিশ্লেষণে আনতে হবে।

আসলে কোনো কল্যাণ চিন্তাই ব্যর্থ হয় না। কাজী আনোয়ারুল কাদীর পরবর্তীতে ঢাকার 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'-এর সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীন চিন্তার লেখাগুলোকে 'আমাদের দুঃখ' নামে কলকাতা থেকে বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন। এই দুষ্প্রাপ্য বইটি সম্প্রতি অ্যার্ডন পাবলিকেশন ঢাকা থেকে প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসানের সম্পাদনায় বেরিয়েছে। এই সুযোগে তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আকারে ছোট কিন্তু ভাববৃত্তের দিক থেকে বৃহৎ বইটি 'আমাদের দুঃখ' শিরোনামের মধ্যে বাংলাদেশ অঞ্চল ও বাঙালির মৌলিক সমস্যাকে খুব দূরদৃষ্টি দিয়ে কাজী আনোয়ারুল কাদীর চিহ্নিত করতে পেরেছে।

শিখাগোষ্ঠীর চিন্তাচর্চা কী আমাদের সমাজ-সাহিত্যে কোনো কার্যকর প্রভাব ফেলতে পেরেছে? যেসব প্রত্যয়কে সামনে রেখে শিখা প্রকাশিত হয়েছিল, শতবর্ষ পরে সেই প্রয়োজন কী অবসিত হয়ে গেছে?

এই সব জিজ্ঞাসাকে সামনে রেখে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'-এর তৎপরতার একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়। শিখার প্রকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। নানা ধরনের ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই একটা প্রোডাক্ট হয় এটি। সেই প্রোডাক্টকে যাপিত জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, রাজনীতি-সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সেটাকে কালের সাপেক্ষে দেখা ও বিশ্লেষণ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

সেই সময় বাংলা অঞ্চলের উর্দুভাষি 'আশরাফ' (অভিজাত, নিজেদেরকে আরব, ইরান, তুর্কী থেকে আগত বংশদ্ভূত মনে করতো) অবাঙালি মুসলমান, বাঙালি হিন্দু, 'আতরাফ' (নিম্ন বর্গ) বাঙালি মুসলমান—এই তিনটি বর্গ ও তাদের শ্রেণিগত অবস্থানকে এই বিবেচনায় রাখা দরকার।

প্রথমে ধরা যাক 'মুসলিম' শব্দটি কেন? অবিভক্ত ভারতবর্ষের পারসেপশন 'মুসলমান' সম্প্রদায় কথাটাকে প্রধান করা হয়েছে এই জন্য যে, মুসলিম সংখ্যাধিক্যের তুলনায় তৎকালীন বাংলা-অঞ্চলে প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যায় কম হলেও তাদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ছিল বেশি। ইতিহাসের তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকার মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ জমিদার-ভূসম্পত্তি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে। উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত আধুনিক বাংলা সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা।

এমতাবস্থায় কলকাতার বাইরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, জগন্নাথ কলেজকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'।

এর মূল স্লোগান ছিল 'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব'। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মের অন্ধ গোঁড়ামির মোকাবিলায় মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, 'আমরা প্রতিষ্ঠান গড়ব, সংগঠনের জোরে আমরা আগ্রাসী অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে আলোকের অভ্যুদয়য়ের নিশানায় মুক্ত জ্ঞান চর্চা করব। দেশময় ছড়িয়ে দেবো মুক্ত বুদ্ধির সেই আলোকবর্তিকা।' অতএব সেটা থেকেই সহজ শব্দের এ নামকরণ 'শিখা'। (মুস্তাফা, ২০১৯: ছয়)

'শিখা সমগ্র' সম্পাদক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম 'বিষয়ভিত্তিক সূচীপত্র'-এ দেখিয়েছেন, কবিতা ৩টি, সাহিত্য, ভাষা ১০টি, সঙ্গীত, নাটক, শিল্পকলা ৬টি, সমাজ, ধর্ম, জাগরণ ১৯টি, শিক্ষা ৪টি, অর্থনীতি, রাজনীতি ৮টি, ইতিহাস ও অন্যান্য বিবিধ প্রসঙ্গ ১৭টি, অভিভাষণ, বিবরণী ১৭টিসহ মোট ৮১টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামির মোকাবিলায় উদ্ভিন্নমান মুসলমান শিক্ষিত প্রজন্মের শিখা যে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে, তা পাঁচটি সংখ্যার বৈচিত্র্যময় সূচিপত্র দেখে অনুমান করা যায়। যদিও পত্রিকাটি স্বল্পায়ু, সমমনা, আগ্রহী পাঠকের বাইরে এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রসার ছিল সীমিত এবং দেশের সাধারণ জনমানুষের সংযোগ ছিল নগণ্য।

এসব সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিখা সমকালে চিন্তাচর্চায় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রমাণ? শিবনারায়ণ রায় এটাকে শনাক্ত করেছেন 'এ নিউ রেনেসাঁ' হিসেবে।

শিবনারায়ণ রায়ের শিখাগোষ্ঠীর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে উনিশ শতকের ডিরোজিও নেতৃত্বে গড়ে ওঠা 'ইয়াং বেঙ্গল'দের সঙ্গে তুলনাকে অমি অযৌক্তিক মনে করি। ডিরোজিও হিন্দু কলেজে শিক্ষকতাকালে তার মেধা, প্রতিভা, সামর্থ্য সবকিছু বিনিয়োগ করেছেন মূলত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কমিউনিটির কল্যাণের জন্য।

তার প্রতিফলিত রূপ হচ্ছে বাবু কালচার, আধুনিকতা, রেনেসাঁ, রেফরমেশন, জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ইত্যাদি। 'ইয়াং বেঙ্গলদের'  কোনো কিছুর সঙ্গে শিখাগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দূরতম সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

'মুসলিম সাহিত্য সমাজের' কর্মকাণ্ড ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, সুশৃঙ্খল। নিজ সম্প্রদায়ের প্রথাবদ্ধতা, পশ্চাৎপদতা, সংস্কারের বন্দিদশা থেকে মুক্তি, উন্নতি, সমৃদ্ধি, কল্যাণকর যুগোপযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়া। অন্নদাশঙ্কর রায় সেই ভুলটাকে আরও চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—'এতকাল আমরা যেটাকে বাংলার রেনেসাঁ বলে ঠিক করেছি বা ভুল করেছি সেটা ছিল অবিভক্ত বাংলার ব্যাপার। পার্টিশনের পর পূর্ব বাংলা—এখন তো বাংলাদেশ—নতুন করে জেগে ওঠে। সেখানে দেখা দেয় দ্বিতীয় এক রেনেসাঁ। প্রথম রেনেসাঁর নায়কদের মধ্যে ইউরোপীয় ছিল, খ্রিস্টান ছিল, কিন্তু মুসলমান ছিল না। দ্বিতীয় রেনেসাঁর নায়করা সকলেই মুসলমান।…দ্বিতীয় রেনেসাঁ হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক।' (অন্নদা, ১৯৮০: ভূমিকা)

শিখাগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপর্যুক্ত অভিমত থেকে স্পষ্ট। যদিও বিভাগোত্তরকালে পাকিস্তান ও ধর্ম ইসলামকে অভিন্ন করে দেখা, শাসকগোষ্ঠীর সামরিকমুখিতা বাঙালির 'মুসলমান' পরিচয়কে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। আরবি তাদের ধর্মীয় ভাষা, উর্দু-ফার্সি শিক্ষার বাহন, বাংলা তাদের মাতৃভাষা—এতগুলো ভাষা-সমস্যায় বিভ্রান্ত একশ্রেণির বাঙালি আরবি হরফে বাংলা লেখার মতো আজগবি প্রস্তাবও দেয়।

এর ঐতিহাসিক মীমাংসা এনে দেয় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৭ সালে 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' থেকে 'মুসলিম' শব্দ বাদ দেওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা লাভ করে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, মুসলিম লীগের পাকিস্তান রেজুলেশন পাস হওয়ার পর কলকাতায় গঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি' (১৯৪২), ঢাকায় গঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ' (১৯৪২) নামে ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য ছিল প্রায় অভিন্ন—মুসলিম জাতীয়তাবাদ, মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র ধারণা প্রচার, ইসলামী ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করা।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাদের তৎপরতা হারিয়ে যায়। যদিও ঢাকার বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারণার মধ্যে উনিশ শতকে কলকাতায় উৎপাদিত জাতীয়তাবাদী ধারণার আরোপণ ছিল, কিন্তু মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে তা মাতৃভূমি বা স্বদেশ অনুরাগে রূপান্তরিত হয়।

এই রূপান্তরের ফাংশনাল ন্যারেটিভ হিসেবে কাজ করেছে শিখাগোষ্ঠীর চিন্তাচর্চা। এই চেতনার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন হচ্ছে—উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রগতি চেতনা, সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং 'মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদীর' বদলে 'সমন্বয়বাদী' চিন্তার প্রসার।

উর্দু ভাষাকে বাতিল করে মাতৃভাষা বাংলা সূত্রে আত্মপরিচয় ধারণ বাঙালি মুসলমানের অভূতপূর্ব রূপান্তর বলা যায়। শিখা পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধের শিরোনাম 'বাঙালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা', 'সঙ্গীত চর্চায় মুসলমান', 'নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ', 'স্থাপত্য-চর্চায় মুসলমান', 'বাঙালী মুসলমানের সামাজিক গলদ', 'আমাদের নবজাগরণ ও শরিয়ত', 'বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা', 'বাঙালী মুসলমানের আর্থিক সমস্যা', 'নারী জীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ', 'মানব প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধি', 'কুসংস্কারের একটা দিক', 'মুসলিম জাগরণ', 'নাস্তিকের ধর্ম', 'মুসলিম নারীর কথা', 'সভ্যতার উত্তরাধিকার' প্রভৃতি নাম-শিরোনামের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে যে মুসলমান সমাজের চৈতন্য বদল ঘটেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি ইতিবাচক অর্থে নতুন অর্জনকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক সমাজ গঠন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণে বারবার গণঅভ্যুত্থান করেও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ।

মুসলমান সমাজের বিকাশের গতিপথ শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যেসব জীবনদৃষ্টি, ইতিহাসবোধ বাঙালি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তা খুঁজে দেখার প্রয়োজন বোধ থেকেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪) গবেষণা করেন।

এটা প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভ হলেও 'মুসলিম মানস' আলাদাভাবে চিহ্নিত করা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাস্তবতায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। বিশেষত, মুসলমান জনগোষ্ঠীর স্বরূপ সন্ধান 'বাঙালি জাতীয়তাবাদী' ধ্যান-ধারণা আবিষ্কারে এই গবেষণা যে মাইল ফলকের ভূমিকা পালন করেছে, তা শিখা পত্রিকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতিফলন নয় কী?

আনিসুজ্জামানের গবেষণার বিষয় উনিশ শতকের সাময়িকপত্র-সাহিত্য হলেও তা তৎকালীন সমাজ-রাজনীতির বাস্তবতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ছিল। কারণ, তিনি মুসলিম মানস ও সাহিত্য পাঠে প্রভাবশালী প্রচলিত মতের অনুসরণ না করে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। সেটা হচ্ছে—উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রগতিশীল অবস্থান, যা বাঙালি মুসলমানদের সামষ্টিক পরিচয়ের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হয়ে ওঠে।

উত্তরকালে আহমদ ছফার 'বাঙালি মুসলমানের মন' এবং বদরুদ্দীর উমরের 'মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন' সেই ধারাবাহিকতারই গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নায়ন। অর্থাৎ 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' নিজ কমিউনিটি নিয়ে যে চিন্তা করেছে, মুসলমান জাতিকে যে জায়গায় দেখতে চেয়েছে, তার পরিবর্তিত পরিণত রূপ বাংলাদেশ নামের স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড।

কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি ইতিবাচক অর্থে নতুন অর্জনকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক সমাজ গঠন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণে বারবার গণঅভ্যুত্থান করেও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ।

সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ জাতি স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পরেই মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজ, ন্যায্যতা, মানবিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। শাসকশ্রেণির সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যর্থতা, বিচারহীনতা, নানা নিরিখে বিভাজ্য-বৈষম্যের কারণে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে যায়। সামরিক জেনারেলদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণ আন্দোলন-সংগ্রামে রাস্তায় নামে, সংঘটিত হয় একাধিকবার গণঅভ্যুত্থান। সমাজের অভ্যন্তরে তৈরি হয় নানা ডিসকোর্স, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ। সম্প্রদায়গততা, সম্প্রদায়প্রাণতার একটা ইতিবাচকতা আছে, এটা ঢাকার 'মুসলিম সাহিত্য সমাজে'র শিখাগোষ্ঠীর তৎপরতার মধ্যে কার্যকরভাবে প্রমাণিত।

আশার কথা হচ্ছে, এই তরুণ চিন্তক দল বাংলাদেশের চিন্তাচর্চার সমস্যাগুলোকে শনাক্ত করতে পেরেছে। তরুণ চিন্তক দল যথেষ্ট তত্ত্ব তালাশ করছে, যাচাই-বাছাই করছে, প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসতত্ত্ব, ম্যাটান্যারেটিভস্ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছে। এরা 'ক্ষমতা সম্পর্ক' সম্পর্কে সচেতন এবং অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষা কেজো গদ্য লিখছেন।

পোস্ট-মডার্ন চিন্তার প্রভাবে হয়তো এদের মধ্যে বড় অংশ ম্যাটান্যারেটিভ থেকে মুক্ত। এন্টিথিসিস, সিনথিসিস, ম্যাটান্যারেটিভকে ক্রিটিক্যাল এনালাইসিসের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন কেউ কেউ।

জীবনদর্শন অর্থাৎ পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে মনে হয়—সেটি ধর্ম বা রাজনৈতিক মতাদর্শ অবলম্বনে জীবনকে দেখার পদ্ধতিকে পোস্ট-মর্ডানরা ম্যাটান্যারেটিভ বলে। যে ব্যাপারগুলো নিদিষ্ট অর্থে, শব্দে, পরিভাষায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত আছে, সেই ব্যাপারগুলো সেই অর্থে ব্যবহার না করা, ইতিহাসতত্ত্বের দিক থেকে চিন্তার যে দায়গুলো আমরা বহন করে চলছি, সেগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা, জিজ্ঞাসা সামনে আনা—এটাই মুক্ত চিন্তাচর্চার পরিসর।

যাচাই না করে, প্রশ্ন না করে কোনো কিছুকে গ্রহণ বা বর্জন করাই তরুণ চিন্তকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেমন: আধুনিকতা কাকে বলে? প্রগতিশীলতা কাকে বলে? ইতিহাসের সত্য কী? সুন্দর, কল্যাণ, মঙ্গল, যে ব্যাপারগুলো আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, এই প্রতিষ্ঠিত ব্যাপারগুলোকে প্রশ্ন করতে না পারলে নতুন চিন্তার পরিসর তৈরি হবে না।

ট্র্যাডিশনাল থিংকিং, পুরানো প্রতিষ্ঠিত চিন্তার আরামের মধ্যে বসবাস করা মানে জীবন অর্থহীন। প্রজ্ঞাবান মানুষের উচিত নিরর্থক জীবনকে সার্থক করে তোলা। সেটাই প্রগতি।