বাঙালি মুসলমানের ভাষা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা সভা

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

‘বাঙালি মুসলমানের ভাষা প্রশ্ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ভাষার সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ইতিহাস আড্ডার ১১তম পর্বে ‘বাঙালি মুসলমানের ভাষা প্রশ্ন’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা ভাষার সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের সম্পর্ক কেবল মাতৃভাষার টানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে ধর্ম, আত্মপরিচয় এবং ঔপনিবেশিক রাজনীতির জটিল সম্পর্ক জড়িয়ে ছিল।

তাদের মতে, যেকোনো দেশের ভাষাই সে দেশের মানুষের আত্মপরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভাষাবিদ অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, ভাষাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা একটি সংকীর্ণ মানসিকতা। সংস্কৃত শব্দকে ‘হিন্দু’ এবং আরবি-ফারসি শব্দকে ‘মুসলিম’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

তিনি উইলিয়াম কেরির ‘কথোপকথন’ গ্রন্থের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেরি সাধারণ মানুষের জীবন্ত ভাষাকে ধারণ করতে পেরেছিলেন—যা বর্তমান সমাজ অনেক সময় উপেক্ষা করে।

গবেষক অধ্যাপক মো. চেঙ্গিশ খান বলেন, উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরবি ও ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে একটি অতিরিক্ত সংস্কৃতায়িত বাংলা গদ্য নির্মাণ করেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর দীর্ঘ সময় মুসলমান সমাজ ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় এই কৃত্রিম গদ্যই পরবর্তী সময়ে মান ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি আবুল মনসুর আহমদের ভাষাচিন্তার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

আলোচনায় উঠে আসে চল্লিশের দশকের পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির ভূমিকার কথা।

বক্তারা বলেন, আবুল মনসুর আহমদ কলকাতাকেন্দ্রিক মান বাংলার পরিবর্তে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার ওপর ভিত্তি করে একটি ‘ঢাকাইয়া বাংলা’ মান তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা এই অঞ্চলের মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করবে। তার গল্প ও উপন্যাসেও ভাষা ব্যবহারের এই স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট।

গবেষক তাহমিদাল জামি বলেন, ঔপনিবেশিক আমলের শুমারির ফলে বাঙালি মুসলমানরা এক ধরনের পরিচয় সংকটে পড়েছিল। সে সময় শিক্ষিত শ্রেণির অনেকেই মনে করতেন, বাংলা কেবল ঘরের ভাষা, আর সাংস্কৃতিক বা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হওয়া উচিত উর্দু বা আরবি। এই খণ্ডিত মানসিকতার প্রতিফলন তৎকালীন সাহিত্যে দেখা যায়।

অনুষ্ঠানের শেষে আলোচকদের সঙ্গে শ্রোতাদের প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের স্পেশাল কনটেন্ট এডিটর সামসুদ্দোজা সাজেন। সঞ্চালনা করেন ইমরান মাহফুজ।