পাঠাগারে পাঠক বৃদ্ধির সৃজনশীল পথনকশা

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল হলেও বাংলাদেশে পাঠাগারের সংখ্যা কম নয়। বিভাগীয় ও জেলা সদরে সরকারি গণগ্রন্থাগার; বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছু পাঠাগার; বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-আধা সরকারি সংস্থা ও ব্যাংকসহ অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও পাঠাগার আছে।

এর মাঝে নতুন পাঠাগার গড়ে উঠছে, আবার বন্ধও হচ্ছে। তবে বাস্তবে গ্রন্থাগারে সমস্যা হলো পাঠকের উপস্থিতি। পাঠাগারে পাঠকের উপস্থিতি কমছে।

একটি পাঠাগারে কেবল নতুন বই নয়, পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আধুনিকায়ন ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। এলাকা ও পাঠক বিবেচনায় বইয়ের বিষয় নির্বাচন ও কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই একটি পাঠাগারকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

প্রখ্যাত মনীষী প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘লাইব্রেরি হচ্ছে মনের হাসপাতাল। শরীর অসুস্থ হলে আমরা যেমন হাসপাতালে যাই, মনের খোরাক মেটাতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য আমাদের গ্রন্থাগারে যাওয়া প্রয়োজন।’

এই ‘টিকটক’ যুগে এসে কেবল নতুন বই প্রকাশ করলেই হবে না। ভাবতে হবে নতুন করে পাঠকের মন নিয়ে। বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ বইয়েও পাঠক ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।

পাঠকদের পাঠাগারমুখী করতে প্রয়োজন সৃজনশীল বিবর্তন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। লেখক, পাঠক ও সাহিত্য সমালোচকদের সঙ্গে কথা বলে পাঠক বৃদ্ধির একটা প্রস্তাবনা দেওয়া যায়।

১. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে পাঠাগারের নতুন বই ও বিভিন্ন কার্যক্রম প্রচার করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে বই নিয়ে অনলাইন প্রচারণা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২. বই নিয়ে নানা আয়োজন

বই পাঠ প্রতিযোগিতা, লেখক আড্ডা ও সাহিত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। খ্যাতিমান কবি, লেখকদের জন্মমৃত্যুতে তাদের স্মরণ, ছোট ছোট করে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা করা যায়।

এ ছাড়া, সৃজনশীল পাঠকদের জন্য ‘রিডিং চ্যালেঞ্জ’ বা কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কারের ব্যবস্থা করলে পাঠাগারে পাঠক আসার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

৩. পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ

নির্দিষ্ট এলাকার পাঠকদের রুচি ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বই সংগ্রহ করা যায়। পাঠকদের কাছ থেকে ‘বই কেনার প্রস্তাব’ বা পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে, পাঠাগার কেবল বইয়ের গুদাম নয়, এটি হওয়া উচিত একটি সামাজিক মিলনমেলা। মার্কিন লেখক আলবার্ট ম্যাঙ্গুয়েল বলেছিলেন, ‘পাঠাগার হলো মহাবিশ্বের একটি প্রতিচ্ছবি।’

৪. আরামদায়ক বিন্যাস

সরকারি গ্রন্থাগারগুলোর গুমোট ভাব দূর করে সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা পাঠাগারে ছোট কফি কর্নার বা ক্যাফেটেরিয়া রাখা যেতে পারে। এতে পাঠক সেখানে দীর্ঘ সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। এক কাপ চা বা কফি বই পড়ার আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. কমিউনিটি পার্টনারশিপ

স্থানীয় স্কুল, কলেজ বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের পাঠাগার ব্যবহারে উৎসাহিত করেন এবং ভালো পাঠকদের আলাদা মূল্যায়ন করেন, তবে পাঠক দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

৬. প্রযুক্তির সঙ্গে মেলবন্ধন

ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, ‘বই এমন একটি মাধ্যম, যা এক মন থেকে অন্য মনে সংযোগ স্থাপন করে।’ বর্তমান যুগে এই সংযোগের বড় মাধ্যম প্রযুক্তি। পাঠকরা যাতে ঘরে বসেই জানতে পারেন কোন বই পাঠাগারে আছে।

এর জন্য মোবাইল অ্যাপ থাকা জরুরি। কিউআর কোড স্ক্যান করে বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জানার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পাঠাগার সদস্য কার্ড দিয়ে যাতে অনলাইনের বিশাল ই-বুক ভাণ্ডারে প্রবেশ করা যায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। অডিও বুক কর্নার দৃষ্টিহীন বা শ্রবণপ্রিয় পাঠকদের আকৃষ্ট করবে।

৭. লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক উৎসব

হোর্হে লুইস বোর্হেস লিখেছিলেন, ‘আমি সবসময় কল্পনা করেছি যে স্বর্গ হবে এক ধরণের পাঠাগারে।’ সেই স্বর্গীয় আবহ তৈরি করতে নিয়মিত অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।

দ্য নিউইয়র্কার, ফাইনান্সিয়াল টাইমস, দ্য গার্ডিয়ানের সেরা বই নিয়ে আড্ডা হতে পারে। বাংলা ভাষার শতবর্ষী বই পাঠ প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠান হতে পারে।

৮. শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ জোন

শিশুকালেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে পাঠক পাওয়া দুষ্কর। গল্প বলার আসর করে সপ্তাহে একদিন পেশাদার গল্পকারদের দিয়ে শিশুদের বই পড়ে শোনানো যেতে পারে।

শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন বই, কমিকস ও খেলনা সমৃদ্ধ একটি আলাদা জোন তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা পাঠাগারকে ভয় না পেয়ে খেলার জায়গা মনে করে।

৯. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয়

শুধু পাঠ্যবই নয়, সমসাময়িক বা ক্লাসিক সাহিত্যের গল্প ক্লাসে সংক্ষেপে শুনিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করা যেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত একদিন শিক্ষার্থীদের স্কুলের পাঠাগারে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে তাদের পছন্দের বই পড়ার সুযোগ দেওয়া যায়। নির্দিষ্ট মাসে সবচেয়ে বেশি বই পড়া শিক্ষার্থীকে 'সেরা পাঠক' হিসেবে স্বীকৃতি বা ছোট পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে।

১০. পরিবারের ভূমিকা

অভিভাবকরা বই পড়লে সন্তানরা তা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। পরিবারের সবাই মিলে নির্দিষ্ট সময়ে 'পারিবারিক পাঠ সময়' নির্ধারণ করতে পারেন। বাড়িতে একটি ছোট পাঠাগার বা বুকশেলফ তৈরি করুন। শিশুর রুচি অনুযায়ী রঙিন ও সচিত্র বই সংগ্রহে রাখা জরুরি। জন্মদিন বা ভালো ফলাফলে খেলনা বা গ্যাজেটের বদলে চমৎকার কোনো বই উপহার দিন।

১১. দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স

তরুণ প্রজন্মকে পাঠাগারে টানতে হলে তাদের কর্মজীবনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হবে। ক্যারিয়ার কর্নার করে বিসিএস, ব্যাংক জব ও উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রাখতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং, সিভি রাইটিং বা সৃজনশীল লেখালেখির ওপর ফ্রি কোর্স বা সেমিনার আয়োজন করা হলে তরুণরা গ্রন্থাগারে নিয়মিত যাতায়াত করবে।

১২. মেম্বারশিপ ও প্রচারণায় অভিনবত্ব

পাঠাগারের প্রচার হতে হবে আধুনিক। পাঠক যত বেশি বই পড়বেন, তাকে তত বেশি পয়েন্ট দেওয়া এবং নির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জিত হলে তাকে ‘লাইব্রেরি অ্যাম্বাসেডর’ খেতাব বা বিশেষ উপহার দেওয়া যেতে পারে। ফেসবুকে ‘বুক অব দ্য উইক’ বা জনপ্রিয় উক্তি শেয়ার করে তরুণ পাঠকদের নজর কাড়া যায়।

১৩. সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়

সরকারি গ্রন্থাগারগুলোর উন্নয়নে স্থানীয় সাহিত্যিক ও বিত্তবানদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই দান করার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে।

১৯৭৮ সালে মাত্র ১০ জন সদস্য ও ৩৫ টাকার বই নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পায়। আজ এর মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও স্কুল-কলেজ পর্যায়ের বই পড়া কর্মসূচির সাহায্যে দেশজুড়ে লাখো পাঠক তৈরি হচ্ছে।

এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সবসময় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও দর্শনের বই পড়তে উৎসাহিত করেন। কারণ, ভালো বই মানুষের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে এবং পাঠ্যবই দ্রুত আয়ত্ত করতে সাহায্য করে।

বিখ্যাত ব্যঙ্গসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ বিশ্বাস করতেন, একটি জাতি নিজস্ব সাহিত্যের মাধ্যমেই নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে পারে।

তার মতে, সাহিত্য চর্চা ও ইতিহাস পাঠ ছাড়া কোনো সভ্যতাই বেশিদূর এগোতে পারে না।

মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো বলেছিলেন, ‘যার একটি বাগান ও একটি পাঠাগার আছে, তার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।’

আমাদের সরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে সেই সুশোভিত বাগানে পরিণত করতে হবে। এগুলোকে কেবল বই পড়ার স্থান নয়, বরং আধুনিক সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়।

তাই কেবল বই সাজিয়ে রাখলে হবে না, পাঠাগারে প্রাণের স্পন্দন তৈরি করতে হবে। যখন কেউ পাঠাগারে আনন্দ, শান্তি ও প্রগতি খুঁজে পাবেন, তখনই প্রকৃত অর্থে পাঠকের সংখ্যা বাড়বে।

সৃজনশীল চিন্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে আমাদের পাঠাগারগুলো আবারও হয়ে উঠবে জ্ঞানপিপাসুদের গন্তব্য।