হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন, যেভাবে দেখছে ভারতীয় মিডিয়া

স্টার অনলাইন ডেস্ক

প্রতিবেশী বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আয়তন, অর্থনীতি, সামরিক ক্ষমতা ও জনসংখ্যার দিক থেকে বহুগুণ বড় ভারতের আগ্রহের কমতি নেই

ঢাকায় গণ-অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে অপসারিত হাসিনা সরকারের সঙ্গে দিল্লির সখ্যতা সুবিদিত। এমন একটি দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের আশায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমের সংবাদ প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘মোটের উপর নির্বিঘ্নেই নির্বাচন চলছে বাংলাদেশে, সকাল থেকে বুথের বাইরে ভোটারদের লাইন, ভোট দিলেন নাহিদ-ফখরুলরা’।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ চলছে। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত আছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও হচ্ছে বাংলাদেশে।

হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ায় ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অপর এক শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘বাংলাদেশে ভোট: ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন চায় বিএনপি? অবস্থান স্পষ্ট করলেন চেয়ারপার্সন তারেকের উপদেষ্টা’।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি, ক্রিকেটের ময়দানেও ছড়িয়ে পড়েছে সেই উত্তাপ।

এতে আরও বলা হয়—বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রাক্কালে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতা মাহদী আমিন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ, সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন নিয়ে বিএনপির অবস্থানসহ নানা বিষয়ে মন্তব্য করেছেন মাহদী আমিন।

তিনি জানান—শুধু প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই নয়, গোটা বিশ্বের সঙ্গেই মিলেমিশে কাজ করার এক দারুণ সুযোগ আছে বাংলাদেশের কাছে। বাণিজ্য, শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সকল দেশের সঙ্গে কাজ করা যেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘দুঃস্বপ্নের অবসান’, ভোট দিয়ে বললেন ইউনূস, স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে ভোট তারেকের, নির্বাচনে নিরুত্তাপ হাসিনার ‘খাসতালুক’।

সংবাদমাধ্যম এই সময়-এর প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম বলা হয়, ‘ভোটের দিনে বিস্ফোরণে কাঁপল বাংলাদেশ, টার্গেট হাসিনার শক্ত ঘাঁটি গোপালগঞ্জ’।

দৈনিক আজকাল-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, ‘ভোট শুরু হতেই বিক্ষিপ্ত অশান্তি বাংলাদেশে, জামায়াত প্রধানের কেন্দ্রেই যত গোলমাল’। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে চলছে ভোটগ্রহণ। তবে শুরুতেই মিলল অশান্তির খবর। ভোটের দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াত ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে মিরপুরে সংঘর্ষের খবর মিলেছে। প্রসঙ্গত, ঢাকার মিরপুর-১০ আসন থেকে লড়াই করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমান।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এর বাইরে এখনো অবধি মোটের উপর নির্বিঘ্নেই চলছে ভোট।’

দৈনিকটির এক আলোকচিত্র প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়, ‘প্রতীক্ষার নির্বাচন, আঁটসাঁট নিরাপত্তায় ভোট দিলেন তাকের, নাহিদ, আপাতত নির্বিঘ্নেই ভোট বাংলাদেশে’।

একটি ছবির ক্যাপশনে বলা হয়—শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন। ২০২৪ সালের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটগ্রহণ চলছে বাংলাদেশে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আঁটসাঁট নিরাপত্তা।

হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা-এর প্রধান সংবাদ ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে। এর প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘হিন্দু মহিলা প্রার্থীর এজেন্টকে বাধা, বাংলাদেশে ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে নাকি বাহুবলে বুথ দখল করে ভোট হতো হাসিনা জমানায়। সেই ব্যবস্থা পালটে ফেলার অঙ্গীকার নিয়েই ইউনূস সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশে। তবে হাসিনা জমানায় যে অভিযোগ উঠত, ইউনূস জমানায় সেই একই অভিযোগ উঠল।’

‘এই আবহে বরিশালের এক কেন্দ্রে হিন্দু মহিলা প্রার্থী গুরুতর অভিযোগ তুললেন’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘বাম জোটের প্রার্থী তথা বরিশাল জেলায় বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের আহ্বায়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী দাবি করেন, তার কেন্দ্রে বাহুবলের মাধ্যমে প্রভাব করা হচ্ছে এলাকায় এলাকায়। এমনকি, তার দলের পোলিং এজেন্টকে বুথে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না।’

দ্য স্টেটসম্যান-এর বাংলা সংস্করণ দৈনিক স্টেটসম্যান-এর ‘বাংলাদেশের নির্বাচন এবং…’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়—‘ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয় যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন প্রতিবেশীর পরিচয় রাজনীতি নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে। 

বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থানে দিল্লির অস্বস্তি আসলে ইসলামিক রাজনীতির নয়, নিজের নৈতিক অবস্থান হারানোর ভয়?’

এতে আরও বলা হয়—‘এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ওপাড়ে মৌলবাদ! নিজের ঘরে হিন্দু রাষ্ট্র চাই, প্রতিবেশীর ঘরে ইসলামিক হুমকি? জাতীয়তাবাদ এখানে যদি নৈতিক, তবে ওখানে কেন বিপজ্জনক? রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক আধিপত্য এখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ওখানে হলেই কেন মৌলবাদ?’

‘এই প্রশ্নগুলো একটাও আমার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশ্ন’—এমনটি জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ‘ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে, কিন্তু, প্রতিবেশী দেশে একই ধরনের পরিচয় রাজনীতি উঠলেই দিল্লি তাকে নিরাপত্তা-হুমকি বলে চিহ্নিত করছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটা আসলে ‘পলিসি কন্ট্রাডিকশন’।’

প্রতিবেদন অনুসারে—‘আবার এটাও ঠিক যে, এটা রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের স্বাভাবিক পরিণতিও এটা। যে রাষ্ট্র নিজের ভিতরে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে, সেই রাষ্ট্রের প্রতিবেশীর আইডেনটিটি পলিটিক্স নিয়ে নৈতিক উদ্বেগ দেখানো কতদূর সঙ্গত, এবং এর ফলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চতা ক্ষয়ে যাচ্ছে কি না, সেটাই মূল ভাবার বিষয়।’
টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিশ্ব সংবাদ বিভাগে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লাইভ আপডেট দেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটায় এই সংবাদমাধ্যমটির আপডেটেড প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল—‘ভোটকেন্দ্রে বিএনপি নেতার মৃত্যু, জামায়াত সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ দলের’।
হিন্দুস্তান টাইমস একই বিভাগে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে লাইভ আপডেট দিয়েছে।

দুপুর পৌনে ২টার দিকে সংবাদ প্রতিবেদনটির শিরোনামে বলা হয়—’৩২ শতাংশ বেশি ভোট, গোপালগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জে ককটেল বোমা বিস্ফোরণ’।
দ্য হিন্দু লাইভ আপডেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচন গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। দুপুর সাড়ে ৩টায় প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল: ‘খুলনা-২ এ জামায়াত নেতাদের হামলায় বিএনপি নেতা নিহত’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক মিত্র বিএনপি ও ইসলামপন্থি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। জরিপে বিএনপি এগিয়ে। প্রতিবেদনটির প্রধান আলোকচিত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃশ্য।

সংবাদ প্রতিদিন বিশেষ আয়োজনে বাংলাদেশের ভোটের খবর তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটের প্রথম অংশ লাইভ আপডেটের পাশাপাশি একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিকাল সোয়া ৪টায় প্রধান প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল: ‘ভোটের ফল মানব না, যদি…’, নির্বাচনের মাঝেই হুঁশিয়ারি বিএনপি সভাপতি তারেকের’।

অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘পদ্মাপারের ললাটলিখন! ধর্মের রাজনীতি বনাম দুর্নীতির বিরুদ্ধতা, কোন তাসে বাজি মাত?’ এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ত্রয়োদশতম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ভোটে নেই। বিএনপি ও জামায়াতের “শীতল যুদ্ধ” ভোট অংকে যোগ করেছে নব মেরুকরণের ঢেউ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট পেতে উভয় দলই উদগ্রীব।’