জুনজুড়ে সেমিনারের হিড়িক: স্মরণ নাকি শুধু বাজেট পোড়ানোর আয়োজন?
জাতির গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক, শিল্পী, গবেষক, চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারকদের স্মরণে প্রতিবছর নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। উদ্দেশ্য মহৎ—তাদের জীবন, কর্ম ও চিন্তাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা, গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা এবং জাতীয় স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা।
এসব আয়োজন বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর।
তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে এসে এসব আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কর্মকর্তারাও।
অভিযোগ উঠেছে, জুন মাসে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের তাগিদে তড়িঘড়ি করে একের পর এক স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। কোথাও একদিনেই চারটি অনুষ্ঠান, কোথাও একই ব্যক্তি পাঁচটি অনুষ্ঠানের মূল প্রাবন্ধিক। আবার অনেক ক্ষেত্রে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই ঘুরেফিরে অতিথি, বিশেষ অতিথি, আলোচক ও সভাপতি।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকের মতে, স্মরণানুষ্ঠানগুলো গবেষণাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক আয়োজনের পরিবর্তে স্রেফ প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা ও বাজেট শেষ করার উপায়ে পরিণত হচ্ছে।
৪২ জনকে নিয়ে অনুষ্ঠান, বেশিরভাগই জুনে
বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে ৪২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সেমিনার আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ২৮টি অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলা একাডেমি। বাকি ১৪টির আয়োজন করেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।
এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউট পেয়েছে ১০ এবং বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট পেয়েছে পাঁচটি স্মরণানুষ্ঠানের দায়িত্ব।
প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য প্রাবন্ধিক, আলোচক, অতিথি, সঞ্চালক ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ প্রায় ৮০ হাজার টাকা।
বছরের শুরু থেকে পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কেন অধিকাংশ অনুষ্ঠান জুনে আয়োজন করতে হচ্ছে—এমন প্রশ্নে বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি উপবিভাগের উপপরিচালক ইমরুল ইউসুফ বলেন, অর্থবছরের মধ্যেই অনুষ্ঠান শেষ করার বাধ্যবাধকতা আছে। তাই ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করতে হচ্ছে। তবে অংশগ্রহণমূলক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অবশ্য এর দায় নিতে নারাজ। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (অনুষ্ঠান) আইরীন ফারজানা বলেন, অনুষ্ঠান করার জন্য নামের তালিকা পাঠিয়েছি গত বছর নভেম্বরে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে তা আয়োজন করবে, সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যাপার। এখানে মন্ত্রণালয়ের কাউকে রাখা না রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেখানে যান।
একদিনে ৪ স্মরণসভা
গত ১৩ জুন বাংলা একাডেমি একই দিনে চারজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে চারটি পৃথক স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা হলেন—প্রাবন্ধিক আবদুল হক, কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর এবং কবি শামসুর রাহমান।
আবার ২২ জুন আয়োজন করা হয়েছে কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি রফিক আজাদ এবং মধ্যযুগীয় কবি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে তিনটি অনুষ্ঠান।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন গবেষক, শিক্ষার্থী বা আগ্রহী পাঠক কীভাবে একই দিনে চার বা তিনটি স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেবেন? আর প্রতিটি ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে গভীর আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ই বা কোথায়?
একজন প্রবীণ গবেষকের ভাষায়, স্মরণসভা যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়, তাহলে একদিনে দশটাও করা সম্ভব। কিন্তু যদি গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা লক্ষ্য হয়, তাহলে একটি অনুষ্ঠান নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হতে পারে।
একই মুখ বারবার
অনুষ্ঠানগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অতিথি ও আলোচকের আসনে ঘুরেফিরে কয়েকজন ব্যক্তির নামই বারবার আসছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রায় নিয়মিত। ফলে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলা একাডেমির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের না রাখলে অনেক সময় অসন্তোষ তৈরি হয়। বিভিন্নভাবে জানানো হয়, তাদের নাম যেন তালিকায় থাকে।
যদিও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতিথি নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিষয় এবং এ ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাওয়াল খানম ১৬ জুন শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, ১৭ জুন নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী ও ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং ১৯ জুন খনাকে নিয়ে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে মূল প্রাবন্ধিক ছিলেন।
অর্থাৎ পাঁচটি অনুষ্ঠানেই তিনি আয়োজক এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারীও। স্বাগত বক্তব্যও দিয়েছেন তিনি।
সংগীত, ভাষা আন্দোলন, নৃত্য, লোকঐতিহ্য ও মধ্যযুগীয় জ্ঞানচর্চার মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে একজন ব্যক্তি কীভাবে সমান দক্ষ গবেষকের ভূমিকা পালন করেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে শাওয়াল খানমের ব্যাখ্যা, অল্প সময়ে উপযুক্ত গবেষক পাওয়া যায়নি। তাই তাকেই প্রবন্ধ লিখতে হয়েছে। তাছাড়া এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই।
বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক সদস্য এবং রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ এর সমালোচনা করে বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজেই প্রাবন্ধিক, নিজেই আলোচক—এটা শোভন নয়। এটা শুধু সাংস্কৃতিক চর্চার সংকটই নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংকটেরও সংকেত।
নজরুল ইনস্টিটিউটেও একই চিত্র
নজরুল ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও একইরকম চিত্র দেখা গেছে।
গত ১৪ এপ্রিল 'নজরুল চেতনাদীপ্ত বাংলা নববর্ষ' শিরোনামে দেখা যায় প্রধান আলোচক ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জেহাদ, প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব উদ্দিন, মো. রায়হান কাওছার, আলোচক প্রতিষ্ঠানেরই পরিচালক কে এম আল-আমীন, সভাপতি নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী।
গত ৯ জুন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহা. খালিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক কে এম আল-আমীন। মুখ্য আলোচক ছিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জেহাদ উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী।
অর্থাৎ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরাই বিভিন্ন ভূমিকায় অনুষ্ঠানটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
পরিবারকে না জানিয়েই স্মরণসভা
ইব্রাহীম খাঁকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার পরিবারের সদস্যদের কেউই আমন্ত্রণ পাননি বলেও অভিযোগ উঠেছে। ইব্রাহীম খাঁর নাতি ও ইব্রাহীম খাঁ ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোসাদ্দেক হাবিব বলেন, আমরা কোনো আমন্ত্রণ পাইনি। সাধারণত ইব্রাহীম খাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান হলে ফাউন্ডেশনকে জানানো হয়। এবার তা করা হয়নি।
নীতিমালা কোথায়?
কে প্রাবন্ধিক হবেন, অতিথি নির্বাচন কীভাবে হবে, সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে কি না, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কতটা অংশ নিতে পারবেন—এসব বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এই সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও জবাবদিহির সামগ্রিক সংকটের প্রতিফলন।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা এখন অনেকটাই হুকুমের দাসে পরিণত হয়েছেন। নিজেদের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক দায় বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ আছে বলে মনে হয় না। গবেষণার চর্চা নেই, নেই স্বাধীন চিন্তার জায়গা। জনগণের টাকায় আন্তরিক ও দায়বদ্ধ আয়োজনের পরিবর্তে অনুষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটা শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্যই লজ্জার।
এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের এই অবস্থা জানা ছিল না, কেউ বলেনি আমাদের। যেভাবে অনুষ্ঠান হচ্ছে তা অপ্রত্যাশিত। আমরা বিষয়টা খতিয়ে দেখব। আরও অংশগ্রহণমূলক আয়োজন কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে কাজ করব। আমরা নতুন এসেছি এই সেক্টরে, অনেক কিছু করার আছে। ধীরে ধীরে তা বাস্তবায়ন করব।