ফ্রেডি মার্কারির কণ্ঠে লুকিয়ে ছিল যে রহস্য
ক্যামেরাটা বসানো হয়েছিল গলার ভেতর, ৪ হাজার ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে, লন্ডনের একটা স্টুডিওতে। এই পরীক্ষণের বিষয়বস্তু ছিলেন এক সুইডিশ রক গায়ক, দানিয়েল জ্যাঙ্গার-বর্খ। ফ্রেডি মার্কারি নন। কারণ ফ্রেডি নেই ততদিনে ২৫ বছরের কাছাকাছি। দানিয়েলকে ভাড়া করা হয়েছিল একটাই কাজে—ফ্রেডির কণ্ঠস্বর নকল করা, আর সেই নকলের ভেতর দিয়ে আন্দাজ করা মৃত মানুষটার স্বরযন্ত্র আদতে করত কী।
২০১৬ সালে ‘লোগোপেডিক্স ফোনিয়াট্রিক্স ভোকোলজি’ জার্নালে ছাপা হওয়া এই গবেষণা ক্রিশ্চিয়ান হার্বস্ট, স্তেলান হের্তেগার্দ, জ্যাঙ্গার-বর্খ ও পের-অকে লিন্ডেস্তাদের যৌথ কাজ। প্রশ্নটা দেখতে সহজ, উত্তর গিয়ে ঠেকেছে অন্য জায়গায়—একজন মানুষ ঠিক কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে এমন কিছুর ওপর, যাকে দর্শক ভাবে সম্পূর্ণ বল্গাহীন।
সবাই ফ্রেডিকে চেনে টেনর হিসেবে, তীক্ষ্ণ, উড়ন্ত তার স্বর। অথচ আশির দশকের ছয়টা সাক্ষাৎকার ঘেঁটে গবেষকরা পেয়েছেন তার কথা বলার মৌলিক কম্পাঙ্ক গড়ে ১১৭.৩ হার্জ, যা ব্যারিটোনের সর্বোচ্চ পরিসীমা। চায়ের কাপ হাতে, স্বাভাবিক অবস্থায়, ফ্রেডির গলা ছিল ভারী, নিচু, পাশের বাড়ির লোকের মতো সাদামাটা শোনাত। যে মানুষ ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’-তে আকাশ ছুঁয়ে ফেলতেন, সাক্ষাৎকারের টেপে তার গলা শুনলে প্রথমেই খটকা লাগবে, এ কি সে-ই লোক! দূরত্বটাই আসল জিনিস এখানে—একটা ব্যারিটোন গলাকে জোর করে তেনরে বদলে ফেলার দীর্ঘ চর্চা, যাকে বাইরে থেকে মনে হয় জন্মগত উপহার।
চার অক্টেভ রেঞ্জ নিয়ে যে গল্প ফ্রেডিকে ঘিরে বছরের পর বছর বেড়ে উঠেছিল, গবেষকরা সেটা প্রমাণ করতে পারেননি। গানের কণ্ঠস্বর আলাদা করে বিশ্লেষণ করে তারা পেয়েছেন ৩৭ সেমিটোনের একটা পরিসর, এফ শার্প টু থেকে জি ফাইভ পর্যন্ত, মোটামুটি ৯২ থেকে ৭৮৪ হার্জ। এর চেয়ে উঁচু নোট, যা কখনো কখনো ১ হাজার ৩৪৭ হার্জ পর্যন্ত শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়, নির্ভরযোগ্য বলে মানতে রাজি হননি তারা।
হার্বস্টের ভাষায় ফ্রেডির রেঞ্জ ছিল একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য স্বাভাবিক, তার বেশিও না, কমও না। শুনতে অদ্ভুত লাগে, প্রায় অপমানের কাছাকাছি। বিস্ময়টা লুকিয়ে আছে ঠিক এখানেই। রেঞ্জ স্বাভাবিক ছিল, তবে সেই রেঞ্জের ভেতর তিনি যা করতেন, তা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না!
গবেষকরা সবচেয়ে বেশি সময় খরচ করেছেন তথাকথিত 'গ্রোল' নিয়ে, রুক্ষ, খসখসে, ভাঙাচোরা একটা শব্দ, যা ফ্রেডি ইচ্ছাকৃতভাবে ঢুকিয়ে দিতেন গানের নাটকীয় মুহূর্তে। জ্যাঙ্গার-বর্খের স্বরযন্ত্র হাই-স্পিড ক্যামেরায় ধরে তারা দেখেছেন এই শব্দ তৈরি হয় যখন গলার ভেতরের ভেন্ট্রিকুলার ফোল্ড, সাধারণ কথাবার্তায় বা গান গাওয়ায় যাদের আদৌ কোনো কাজ নেই, ভোকাল ফোল্ডের সঙ্গে একযোগে কাঁপতে শুরু করে। সাবহারমনিক্স বলে একে, তুভান থ্রোট সিঙ্গারদের মধ্যে যে প্রক্রিয়া চেনা—মঙ্গোলিয়া আর সাইবেরিয়ার সীমান্তের সেই ঐতিহ্যবাহী কণ্ঠশিল্পীরা এক গলা থেকে একসঙ্গে দুটো স্বর বের করেন যেভাবে। ফ্রেডি তুভান সংগীত কোনোদিন শুনেছিলেন কি না কেউ জানে না। তার গলা নিজে থেকেই খুঁজে নিয়েছিল সেই পথ।
তারপর ভাইব্রাটো। সূক্ষ্ম কম্পন, যা একটা স্থির সুরকে জীবন্ত করে তোলে। ধ্রুপদী অপেরা গায়কদের এটা সাধারণত ঘোরে ৫ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ৯ হার্জের মধ্যে। ফ্রেডির মাপা হয়েছে ৭ দশমিক ০৪ হার্জ, দ্রুত, অনিয়মিত।
হার্বস্ট ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেছিলেন, এই দ্রুততাই দেয় ফ্রেডির স্বরের সেই কাঁপুনি, যা ‘উই আর দ্য চ্যাম্পিয়নস’ বা ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’র দীর্ঘ সাসটেইন করা নোটে স্পষ্ট ধরা পড়ে। এটা তিনি অবশ্য সবসময় ব্যবহার করতেন না। ইচ্ছাকৃতভাবে পাল্টাতেন ‘ব্রেদি’ ফোনেশন, নিঃশ্বাসযুক্ত ও নরম, আর ‘প্রেসড’ ফোনেশন, চাপা ও টানটান ও ভাইব্রাটোহীনের মাঝে। একটা গানের ভেতরেই, এক লাইন থেকে আরেক লাইনে যেতে যেতে, কণ্ঠের টেক্সচার বদলে যেত এমনভাবে যে দর্শক টেরও পেত না ঠিক কখন মুখোশ পাল্টে গেল।
এতটুকু পর্যন্ত বিজ্ঞান বলতে পারে। এরপর যে প্রশ্ন থেকে যায় তার উত্তর ল্যাবরেটরিতে নেই। ফ্রেডি মার্কারির স্টেজ পারসোনা, চিৎকার, বাহু ছড়ানো, ভাঙা কাচের মতো ধারালো ফলসেটো, দর্শকের সঙ্গে সেই বিখ্যাত ‘ওয়ে-ওহ’ কল অ্যান্ড রেসপন্স, এসবকে বরাবর ব্যাখ্যা করা হয়েছে বেপরোয়া এক শক্তির প্রকাশ বলে। অথচ ভেন্ট্রিকুলার ফোল্ড সক্রিয় করা, ফোনেশন টাইপ বদলানো, নির্দিষ্ট মুহূর্তে ভাইব্রাটোর গতি ইচ্ছেমতো বাড়ানো-কমানো—এসব দুর্ঘটনায় হয় না। শেখা কৌশল এগুলো, বছরের পর বছর মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাড়ে-মজ্জায় গেঁথে ফেলা এক ধরনের পেশিস্মৃতি। গবেষকরা নিজেরাই লিখেছেন যে ফ্রেডি তার স্বরযন্ত্রকে সীমার শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন তার জমকালো ও উদ্ভট মঞ্চ-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে। ফ্রেডির সবচেয়ে খাঁটি রূপ বলে যাকে মনে হয়, সেই বল্গাহীনতাটাই বোধহয় ছিল সবচেয়ে হিসেবি জিনিস, যন্ত্রণাদায়ক পরিশ্রমে গড়ে তোলা এক নিয়ন্ত্রিত বন্যতা।
এই বৈপরীত্য গানেই আটকে ছিল না অবশ্য। ফারুক বালসারা নামের এক জাঞ্জিবার-প্রবাসী পার্সি ছেলে, শৈশব যার কেটেছিল ভারতের বোর্ডিং স্কুলে, লন্ডনে পা রেখে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন ফ্রেডি মার্কারি নামে। যিনি কথা বলতেন নিচু, শান্ত, ব্যারিটোন স্বরে, ঠিক যেভাবে ধরা পড়েছে সেই ছয়টা সাক্ষাৎকারে। মঞ্চে উঠে তিনিই নিজের গলাকে টেনে নিয়ে যেতেন শারীরবৃত্তীয় সীমার একদম শেষ প্রান্তে, তুভান থ্রোট সিঙ্গারদের কাছাকাছি এক জায়গায়, যেখানে সচরাচর কোনো পশ্চিমা রক ভোকালিস্ট পৌঁছান না। পরিচয় পুনর্নির্মাণের কাজটা তিনি করেছিলেন শুধু নাম বদলে বা পোশাকে নয়, বরং নিজের স্বরযন্ত্রের পেশিতেও।
ফ্রেডি মারা গেছেন ১৯৯১ সালে, তার স্বরযন্ত্র সরাসরি পরীক্ষা করার সুযোগ কারো নেই আর। যা কিছু জানা গেছে তা এসেছে জীবিত এক গায়কের অনুকরণ থেকে, রেকর্ডিং থেকে বের করে আনা অ্যাকুস্টিক তথ্য থেকে। প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়, এটা পুনর্গঠন। হার্বস্ট নিজেও এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন সাক্ষাৎকারে। তবু এই আধখেঁচড়া ছবিটাই এখন পর্যন্ত এ প্রশ্নের সবচেয়ে নিকটবর্তী উত্তর। একটা মানুষের গলা কীভাবে হয়ে উঠতে পারে তার সবচেয়ে বড় থিয়েটার, আর পর্দার পেছনে ঠিক কতটা মহড়া চলেছিল, তা কেউ কখনো পুরোপুরি জানবে না। ফ্রেডি নিজেও হয়তো জানতেন না শেষমেশ কোনটা তার আসল গলা, ইন্টারভিউয়ে যেটা শোনা যেত সেটা নাকি ওয়েম্বলির ভিড়ের ওপর দিয়ে যেটা ভেসে বেড়াত সেটা।


