ভ্যান গঘের প্রথম ‘স্টারি নাইট’ আঁকার ৫ রহস্য জানেন?
১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাত। ফ্রান্সের দক্ষিণে প্রভেন্স অঞ্চলের আর্লেস শহরের একটি চত্বরে এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন, হাতে তুলি, সামনে ইজেল। রাত গভীর হচ্ছে, কিন্তু তিনি নড়ছেন না।
উপরে তারাভরা আকাশ, সামনে লণ্ঠনের আলোয় জ্বলজ্বল করছে একটি কফি হাউস। লোকটির নাম ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।
সেই রাতে তিনি যা এঁকেছিলেন, তার নাম 'ক্যাফে টেরাস অ্যাট নাইট'। এটি তার বিখ্যাত 'দ্য স্টারি নাইট'-এর ঠিক নয় মাস আগের কাজ। অনেকে এই ছবিকে বলেন ভ্যান গঘের 'প্রথম স্টারি নাইট'। কারণ তারাভরা রাতের আকাশ তিনি এখানেই, প্রথমবারের মতো এঁকেছিলেন।
কিন্তু শুধু রাতের আকাশ আঁকা নয়, এই ছবিতে ভ্যান গঘ নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন।
কীভাবে তিনি এটি করেছিলেন এবং এর পেছনের অর্থ কী, তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন করেছে বিবিসি।
১৮৮৮ সালের শুরুর দিকে প্যারিস থেকে আর্লেসে আসার সময় ভ্যান গঘের বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়। তখন তিনি ছিলেন অস্থির এক মানুষ। শিল্পকলা ব্যবসা, শিক্ষকতা, ধর্মপ্রচারসহ নানা পেশায় হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু কোথাও স্থির হতে পারেননি।
ইমপ্রেশনিজমের (বাস্তবধর্মী ছবি আঁকার নিয়মের বাইরে গিয়ে দৃশ্যের তাৎক্ষণিক অনুভূতি, আলো ও রঙের খেলাকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার ওপর জোর দেয়) প্রভাবে তার ছবির রঙ উজ্জ্বল হলেও মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। তাই মরিয়া হয়ে তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সের উজ্জ্বল আলোর সন্ধানে আর্লেসে ছুটে যান।
প্রোভেন্সকে তিনি দেখেছিলেন নতুন করে শুরু করার জায়গা হিসেবে, যেখানে অতীতের সব ক্লান্তি ফেলে নিজেকে নতুনভাবে গড়া যায়।
ছবিটি আঁকার কয়েক সপ্তাহ আগে ভাই থিওকে লেখা চিঠিতে ভ্যান গঘ জানান, তিনি আর চোখের সামনের দৃশ্য হুবহু তুলে ধরতে চান না। তিনি চান 'অসীমের অনুভূতি' ফুটিয়ে তুলতে।
সেই লক্ষ্য নিয়েই সেপ্টেম্বরের এক পরিষ্কার উষ্ণ রাতে তিনি ইজেল পাতলেন আর্লেস শহরের ওই চত্বরে। প্রাচীনকাল থেকে বহু ইতিহাসের সাক্ষী সেই স্থানটি ছবিটির গভীরতার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সেই রাতে যেন সাধারণ জিনিসগুলো অন্য এক আলোয় জ্বলে উঠল। আকাশের অসীমতা আর নিচের চঞ্চল জীবন মিলেমিশে তৈরি হলো এক অপূর্ব দৃশ্য।
বিবিসির প্রতিবেদনে 'ক্যাফে টেরাস অ্যাট নাইট'-এর ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কীভাবে ভ্যান গঘ একটি সাধারণ চত্বরকে স্বপ্নের মতো এক জগতে বদলে দিয়েছিলেন, যেখানে অতীত ও বর্তমান একাকার হয়ে যায়।

পাথরের রাস্তা
ক্যানভাসের সামনের চার ভাগের এক ভাগ জুড়ে আছে রঙিন পাথরের এক ঢেউ খেলানো বিস্তার। এটি মূল ক্যাফেকে দর্শকের কাছ থেকে যেন একটু দূরে রাখে।
ছবিটি আঁকার পরপরই বোনকে লেখা চিঠিতে ভ্যান গঘ জানান, আলো আর পাথরের এই রঙিন মোজাইকই ছবির এই অংশের মূল বিষয়।
তিনি লিখেছিলেন, 'বিশাল হলুদ এক লণ্ঠন ছাদ, ফুটপাত ও রাস্তার পাথরের ওপর আলো ফেলছে, যা বেগুনি-গোলাপি আভা ধারণ করেছে...আলোকিত চত্বরটি ফ্যাকাশে সালফার ও লেবু-সবুজ রঙে ঢেকে গেছে।'
তবে এই উজ্জ্বল পাথরের নিচে লুকিয়ে আছে আরেকটি ইতিহাস। এই রাস্তার নিচে রয়েছে 'ক্রিপ্টোপোর্টিকো' নামের খিলানযুক্ত ভূগর্ভস্থ গ্যালারির এক বিশাল নেটওয়ার্ক।
রোমান আর্লেসের এই ভূগর্ভস্থ কাঠামো শুধু প্রাচীন চত্বরটিকেই ধরে রাখেনি, ভ্যান গঘ যে মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাকেও। রঙের দক্ষতার পাশাপাশি এই পাথরগুলো আসলে অতীতের ভগ্নস্তূপের প্রতীক, যা পায়ের নিচে চাপা পড়ে আছে। কিন্তু তাড়া করে ফেরে।

স্তম্ভ
ছবির মাঝখানে, ডানদিকের বড় গাছটির নিচে একটি আলোকিত দোকান দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যটি এমন ছিল না। ভ্যান গঘ ইচ্ছে করেই দোকানের জানালা ও পর্দার বদলে এঁকেছিলেন প্রথম শতাব্দীর করিন্থিয়ান রীতির দুটি বিশাল স্তম্ভ। আর সঙ্গে কারুকাজ করা ক্যাপিটাল, কার্নিস এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে নেওয়া একটি পেডিমেন্টের অংশ।
এগুলো মূলত রোমান আমলের নিদর্শন, যা হোটেল ডু নর্ডের সামনে যুক্ত করা হয়েছিল। অন্য যেকোনো শিল্পী হয়তো এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো আঁকতেই বেশি মনোযোগ দিতেন। কিন্তু ভ্যান গঘের ছবিতে অতীতের ভার বহন করার জায়গা নেই।
তার বার্তা স্পষ্ট—অতীতের দিকে তাকানো যায়, কিন্তু সেখানে আটকে থাকা ঠিক নয়।

চেয়ার
ছবিতে একটি প্রাণবন্ত সামাজিক দৃশ্য মনে হলেও দর্শকের চোখ আগে গিয়ে পড়ে সামনের খালি টেবিল-চেয়ারের ওপর। এই খালি আসনগুলো যেন কোনো নাটক শুরু হওয়ার আগের মঞ্চের মতো।
ভ্যান গঘ আর্লেসে আসার এক দশক আগে প্রকাশিত বিবরণী অনুযায়ী, ১৩৯৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই চত্বরে গবার্ত দে লারনেট নামের এক বিদ্রোহী অভিজাতকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। সেই মৃত্যুদণ্ড দেখতে নেপলসের রাজা দ্বিতীয় লুই এবং রানি মেরি অব ব্লোইসও উপস্থিত ছিলেন।
সেই মঞ্চ এখন আর নেই, ইতিহাস মুছে গেছে। তবু সেই স্মৃতি এখনো কোথাও আঁকড়ে আছে।

টাওয়ার
ছবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিরেখা, পাথুরে নর্দমার সারি আর ভাসমান টেবিলগুলো দর্শকের চোখকে টেনে নিয়ে যায় পেছনের দিকে। সেখান থেকে দৃষ্টি উঠে যায় একটি ছায়াময় টাওয়ারের দিকে।
ভ্যান গঘ যখন আর্লেসে এলেন, ততদিনে নীল আকাশের পটভূমিতে এই টাওয়ারটি পুনর্জাগরণের এক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এটি একসময় সেন্ট-অ্যান গির্জার বেল টাওয়ার ছিল। পরে শহরের জাদুঘরের অংশ হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
আর্লেসে এসেই ভ্যান গঘ এই জাদুঘর ঘুরে দেখেছিলেন এবং রোমান শিলালিপি, স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এবং কাছের নেক্রোপলিস থেকে উদ্ধার করা প্রাচীন কফিনগুলোর কথা চিঠিতে লিখেছিলেন।
'ক্যাফে টেরাস' শেষ করেই তিনি সেই নেক্রোপলিস নিয়ে চারটি ছবির একটি সিরিজ আঁকেন। হারানো অতীতের প্রতীক হিসেবে এই টাওয়ার ছবিতে পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্বকে আকাশের অসীমতার সঙ্গে জুড়ে দেয়।

তারা
ভ্যান গঘ সাধারণত চারপাশের দৃশ্য বদলে আঁকতে পছন্দ করতেন। তাই ছবির আকাশে তারার অবস্থান এত নিখুঁত হওয়াটা সত্যিই অবাক করার মতো।
গবেষকরা দেখিয়েছেন, ছবিতে আঁকা তারার বিন্যাস ১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে 'কুম্ভ রাশির' অবস্থানের সঙ্গে হুবহু মেলে। ঠিক তখনই তিনি প্লেস ডু নর্ডে দাঁড়িয়ে রু ডু প্যালাইসের দিকে তাকিয়েছিলেন।
ছবির বাকি সবকিছু, এমনকি ভ্যান গঘ নিজেও প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। কেবল ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই জ্বলজ্বলে তারাগুলোই পরিবর্তন হয় না। এগুলো যেন বিশুদ্ধ সৃজনশীলতার প্রতীক।
'ক্যাফে টেরাস' শেষ করার দুই সপ্তাহ পর ভাইকে লেখা চিঠিতে ভ্যান গঘ লিখলেন, ‘তারা আঁকার জন্য আমি রাতে বাইরে যাই।’