আজও নিঝুম সন্ধ্যার ছায়া হয়ে নামে হেমন্তের সুর
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারণ করলে প্রথমে যা মনে আসে, তা হলো সেই দরাজ গলা। একটু ভারী, একটু ঘন—যেন বিকেলের আলো কোথাও হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হেমন্ত শুধু কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনন্য এক সুরস্রষ্টা। তিনি বুঝতেন, সুর শুধু কানের জন্য নয়—দৃশ্যেরও নিজস্ব একটা ভাষা লাগে।
বাংলা চলচ্চিত্রে আবহসংগীতের ইতিহাস খুঁজতে বসলে একটা বিচিত্র জায়গায় পৌঁছানো যায়। দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় সিনেমায় আবহসংগীত মানে ছিল—করুণ দৃশ্যে বেহালায় একটা দেশ রাগ, একাকিত্ব বোঝাতে নীলাম্বরীর সুর। যেন অনুভূতি টিন দিয়ে বানানো। পরিচালক তপন সিংহ ‘চিত্রভাষ’ পত্রিকায় একসময় এটা স্বীকার করেছিলেন—আগেকার ছবিতে আবহসংগীতের কোনো স্বতন্ত্র সংজ্ঞা ছিল না। রবিশঙ্কর ‘পথের পাঁচালী’ বা ‘কাবুলিওয়ালা’য় দেশজ সুরে সেই বৃত্ত ভাঙলেন, কিন্তু সেগুলো মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা নয়।
মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রে আবহসংগীতকে যিনি সত্যিকারের ভাষা দিলেন, তিনি হেমন্ত। শুরুটা হয়েছিল পঞ্চাশের দশক থেকে।
হেমন্ত নিজে ১৯৮৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছিলেন—‘আবহসংগীতহীন চলচ্চিত্র কল্পনা করাই যায় না। কিন্তু সেই আবহ তৈরির আগে পরিচালকের সঙ্গে চিত্রনাট্য আলোচনা করতে হয়, সিনেমার প্রজেকশন একাধিকবার দেখতে হয়।’
অভিযোগ ছিল তার, অনেকেই শুধু টাইটেল মিউজিক বানিয়ে তারপর যেখানে-সেখানে দু-চারটি যন্ত্র দিয়ে ‘টুং টাং’ করে ছেড়ে দেন। ফলে নাটকীয় মুহূর্তগুলো হয়ে যায় বিস্বাদ।
এই ‘টুং টাং’ নয়—হেমন্ত চাইতেন সুর যেন দৃশ্যের ভেতর থেকে গজিয়ে ওঠে।
তার আবহসংগীতের একটা দর্শন ছিল বেশ স্পষ্ট। উচ্চকিত শব্দ তিনি পছন্দ করতেন না। যতটুকু দরকার, গানের রাগ ব্যবহার করতেন ঠিক ততটুকু। চরিত্র ঘরে, না খোলা প্রকৃতিতে আছে—এই পার্থক্যটা তার ‘সাউন্ড এফেক্ট’ নির্ধারণে কাজ করত। মাপের বাইরে একটা নোটও নয়—এই ছিল তার সুরদর্শন।
‘বালিকা বধূ’ সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা ধরুন। নায়ক-নায়িকার পুনর্মিলন। হেমন্ত সেখানে আবহে ব্যবহার করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ সুরটি, বেহালায়। রি-রেকর্ডিংয়ের সময় আওয়াজ বাড়ানো হলো স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু পরিচালক তরুণ মজুমদারের কানে ঠেকল, কোথাও বেমানান লাগছে।
হেমন্তবাবুকে জানাতেই তিনি বললেন, ‘বাড়াচ্ছেন কেন মিউজিকটা, আমি তো সেভাবে করিনি। যেমন আছে রেখে দিন। মনে হবে যেন অনেক দূর থেকে সুরটা ভেসে আসছে, কখনো কখনো প্রায় শোনাই যাবে না।’
দূরত্বটাই এখানে শিল্প। সুর যেন কানের কাছে আসে না, বরং পেছন থেকে এসে মনের কোথাও একটা দাগ রেখে যায়। এই যে নিয়ন্ত্রণ—এটাই হেমন্তকে আলাদা করে তুলেছিল।
‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমায় বোনের বিয়ের মন্ত্রোচ্চারণের পটভূমিতে সানাই আর ভায়োলিনে হঠাৎ মনে পড়ে যায় অর্চনার বিবাহবিচ্ছেদের বেদনা। দুটো সময়, দুটো ভাব—একই ফ্রেমে পাশাপাশি। কোনো সংলাপ ছাড়াই আবহসংগীত সেখানে ফ্ল্যাশব্যাকের কাজ করে।
‘দাদার কীর্তি’তে হাসির দৃশ্যে তিনি ব্যবহার করলেন ড্রাম আর তবলা। কড়া মেজাজের সরস্বতী যখন দলবল নিয়ে এগিয়ে আসেন, আবহে বাজে কুচকাওয়াজের ড্রাম। ‘ছন্দবাণী’ ক্লাবের দৃশ্যে তবলার তালে তালে সবার কথা বলার চেষ্টা—আবহটুকু না থাকলে দৃশ্যটা এতটা জীবন্ত হত না। হাসির ছবিতেও তিনি আবহকে নির্দিষ্ট চরিত্র দিয়েছেন। তার কাছে আবহ ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ নয়—সে নিজেও অভিনেতা।
১৯৫৫ সালের ‘শাপমোচন’ থেকে তার সুরকারযাত্রার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু। ‘বাগেশ্রী’ রাগে ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’—প্রবল ঝঞ্ঝার রাতে উত্তমকুমারের ঠোঁটে। বাগেশ্রী করুণ রসের রাগ, কিন্তু এখানে সেটাকে ঝড়ের পরিবেশে বসানো হয়েছে। প্রকৃতির ঝড় আর মনের ঝড় একাকার। গানের ভেতর বাঁশিতে ঝড়ের আবহ—প্রিলিউড থেকে ইন্টারলিউড অবধি। রাগ আর দৃশ্য, গান আর অনুভূতি—হেমন্তের কাছে কখনো আলাদা ছিল না এগুলো।
‘হারানো সুর’-এ ‘তুমি যে আমার’ গানের সুর বারবার ফিরে আসে আবহে—কখনো প্রেমের চিহ্ন হয়ে, কখনো বিরহের ভার নিয়ে। একই সুর, প্রতিবার ভিন্ন মাত্রায়। ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এ ‘এই রাত তোমার আমার’ গানের সুরকে রোম্যান্টিক প্রসঙ্গ থেকে তুলে এনে ব্যবহার করা হয়েছে মানসিক ভাঙনের দৃশ্যেও। গানটার কথা ও সুর রোম্যান্টিক, কিন্তু যে দৃশ্যে সেটা বাজছে সেখানে নায়িকা নিজেই মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছেন৷ দৃশ্যটা হৃদয়স্পর্শী, দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাসের মতো।
একটা সুর যখন সিনেমাজুড়ে বারবার ফিরে আসে, সে শুধু অতীত মনে করিয়ে দেয় না; বরং প্রতিবার নতুন কিছু বলে। এটা কেবল টেকনিক নয়, একটা দর্শন।
‘লুকোচুরি’ (১৯৫৮) হাসির ছবি, কিন্তু হেমন্ত এখানে একইসঙ্গে বিরহ আর চাপল্য সামলেছেন। কিশোরকুমার দ্বৈত চরিত্রে—একজন শান্ত সংগীতশিল্পী, আরেকজন তার চঞ্চল যমজ। হেমন্ত সেই ফারাকটা গানেই আলাদা করেছেন।
‘এই তো হেথায় কুঞ্জছায়ায়’ গানে কিশোর আর রুমা গুহঠাকুরতার কণ্ঠে একটা থিতু ভাব, কোথাও তাড়া নেই। ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’তেও সেই শান্ত ছায়া, বিরহটা চাপা। কিন্তু চঞ্চল যমজ যখন লবণদানি নিয়ে খেলতে খেলতে ‘এক পলকের একটু দেখা’ ধরে—সুরের ভেতরটা বদলে যায়, পায়ের তলায় যেন একটা নাচের ছন্দ বাজে। আর ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’—সংগীতের যান্ত্রিক ব্যবসাকে সরাসরি খোঁচা দেয়। হাসির ছবির ভেতরে এই ব্যঙ্গটা ঢুকিয়ে দেওয়া অন্য এক হেমন্তকে চেনায়।
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ সিনেমায় একটা দৃশ্য আছে। রাইচরণরূপী উত্তমকুমার খোকাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পাঁচ-ছয় মিনিট ধরে সেই অন্বেষণ। সংলাপ নেই বললেই চলে—মাঝে মাঝে শুধু ‘খোকাবাবু’ বলে একটা ডাক। ট্রাম্পেট, পিয়ানো আর ভায়োলিনে তৈরি আবহ ধীরে সেই বেদনা আর উদ্বেগ ঘনীভূত করতে থাকে।
শেষে নদীর ধারে এসে দাঁড়ায় রাইচরণ, ঢেউ পাড় ভাঙছে। ঠিক সেই মুহূর্তে হেমন্ত নিজের গলায় একটা করুণ আলাপ ধরলেন—স্বর দিয়ে, কথা ছাড়া। কোনো যন্ত্র নয়, কোনো শব্দ নয়—শুধু কণ্ঠ। আবহে নিজের গলা ব্যবহার করার এই ভাবনা সে যুগে অভিনব ছিল। কনরাড রুকসের 'সিদ্ধার্থ' ছবিতেও একটি মিলনদৃশ্যে একই কাজ করেছিলেন—ভৈরবী সুরে বাঁশির পাশে নিজের কণ্ঠ।
‘সপ্তপদী’ সিনেমায় একটা দৃশ্য প্রায়ই আলোচনায় আসে না। নায়ক যখন ধর্মান্তরিত হয়, নায়িকা তাকে ভুল বোঝে—সেই মুহূর্তে মন্দিরের ঘণ্টা ধীরে মিলিয়ে যায় গির্জার ঘণ্টার সুরে। একটাই ট্রানজিশন, পুরো দৃশ্যের ভার বদলে যায়। এত অল্পে এত কথা বলা—এটা ছিল হেমন্তের বিশেষ দক্ষতার জায়গা।
‘ক্ষণিকের অতিথি’ ছবির শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’ গানের সুর ব্যবহার করেছিলেন। সেই সুর শেষ দৃশ্যে আবার ফিরে আসে—এসরাজ, বাঁশি আর ভায়োলিনে মিলিয়ে। ‘কাঁচ কাটা হীরে’ সিনেমায় কোনো গান ছিল না। শুধু আবহসংগীতে চরিত্রের সংঘাত, দোলাচল, মানসিক বিবর্তনের স্তর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘আলোর পিপাসা’য় সংস্কৃত স্তোত্রের সঙ্গে পিয়ানো আর তার-সানাইয়ের অভিনব মিশেল।
‘মণিহার’ সিনেমায় ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’—পাহাড়ি রাগে গোধূলির একটা আলাদা অনুভূতি তৈরি হয়, পাহাড়ের সঙ্গে প্রকৃতির সাযুজ্য রেখে। ‘অদ্বিতীয়া’তে মিশ্র ভৈরবীতে ‘চঞ্চল মন আনমনা হয়’ ভোরের স্নিগ্ধতা জাগায়। মিশ্র আশাবরীতে ‘চঞ্চল ময়ুরী এ রাত’—রাতের দৃশ্যের ঘনত্ব তৈরি করে নিপুণভাবে। গানের রাগ আর সময়, দৃশ্য আর মেজাজ—এই সমন্বয়টা হেমন্তের সুরে প্রায় স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মতো।
‘মন নিয়ে’ সিনেমার শেষের দিকে সাগরতীরে একা সুপ্রিয়া দেবী। লতার গলায় ‘চলে যেতে যেতে দিন বলে যায়’। অন্তহীন সমুদ্রের পটভূমিতে একটা নিঃসঙ্গ হৃদয়ের বেদনা—জীবনদর্শনের পুরোটা যেন একটাই গানে ধরা। আর ‘কুহেলী’তে গোটা সিনেমাজুড়ে রহস্যের আবহ—দর্শকের গা ছমছম করে ওঠে, অনেক জায়গায় সংগীতই কাহিনির বিন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
‘পরশমণি’ সিনেমায় রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী যখন তাপস পালের সঙ্গে বিয়ের কথা কল্পনা করেন, অনেক দূর থেকে ভেসে আসা ভায়োলিনে সুরকার হেমন্ত বসান হিমাংশু দত্তের ‘তোমারি পথপানে চাহি’ গানের সুর। তাও শ্যামল মিত্রের দ্রুত লয়ের ভার্সন নয়, মাধুরী সেনগুপ্তের কণ্ঠে ত্রিশের দশকের ধীর লয়ের মূল মেলোডিটি। মনে হয় যেন স্বাপ্নিক এক জগতে অবগাহন করছে বিভোর এক তরুণী।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কখনো সুরকে সাজসজ্জা মনে করেননি। তার কাছে সুর ছিল দৃশ্যের নিজস্ব কণ্ঠস্বর—যা কোনো কোনো সময় ফিসফিস করে, কোনো সময় নীরব থেকেও কথা বলে। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি এই ভাষাটা গড়ে তুলেছিলেন—যেখানে আবহসংগীত শুধু পেছনে বসে থাকে না, গল্পের মধ্যে হেঁটে বেড়ায়।
সেই সুর এখনো কোনো কোনো সন্ধ্যায় ভেসে আসে। কানে নয়, বুকের গভীরে কোথাও এসে লাগে।