‘মহাশ্মশান’ পরিণত হোক প্রাণের মেলায়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

ধরুন, আপনি শুধু ছুটছেন, ছুটছেন, ছুটছেন...আপনার কমফোর্ট জোন আর স্বস্তির চৌকাঠ পেরিয়ে আপনি কিছুতেই আর বেরোতে পারছেন না। কিন্তু তবুও নিজের ভেতরে শূন্যতা কাজ করছে। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আর আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

কিন্তু যদি আপনি সোনার বাংলা সার্কাসের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘মহাশ্মশান’ শুনতে শুরু করেন, তাহলে ধীরে ধীরে আপনার মনের রঙ বদলাতে শুরু করবে। আপনি শূন্যতার ভেতর অবগাহন করতে করতে বিচিত্র সব অনুভূতির মুখোমুখি হবেন। নিজেকে ধীক্কার দিতে যদি ইচ্ছে করে, কিন্তু সাহসে না কুলোয়, তাহলে শুনুন ফোক-ব্লুজ ‘সমকাল কীর্তন’-এর এই লাইনগুলো—‘এ এমন সমকাল/ দেখে মনে হয় যেন জীবনের আকাল/ নিজের বানানো খাঁচায় সিংহ সবাই/ নিজের আড়ালে খোঁজে আড়াল সবাই.../ এই বিজ্ঞানের মুখোশের দিকে থু থু থু/ এই কাঁটাতার ঘেরা দুনিয়ার দিকে থু থু থু/ এই মিথ্যে আলোর সূর্যের দিকে থু থু থু/ এই লাশের বেপারী সব সঙ্ঘের দিকে থু থু থু ইয়াক থু...’

লাইনগুলো শোনার পর কি ভেতরের ক্ষোভ একটু প্রশমিত হয়? হতেও পারে, কিংবা না-ও হতে পারে।

আবার, যখন মনে হয় জীবনটা পড়ে গেছে নির্দিষ্ট এক ঘেরাটোপে, যখন মনে হয়, স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’-র মতো কেউ এসে আমাদের উদ্ধার করুক, তখন কানে বাজতে পারে ‘অন্ধ শহর’-এর এই লাইনগুলো—‘তোমার বন্ধ চোখ খুলে দিতে/ আমি এই অন্ধ শহরের/ সবার শত্রু হয়ে যেতে রাজি/ খোলো রে খোলো/ চোখ খোলো রে...’

আর সেই ধারাবাহিকতাতেই আপনি দেখতে পারেন নতুন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। ‘এসো প্রেম’ গানটির এই লাইনগুলোতে খুঁজে পেতে পারেন সেই স্বপ্নের প্রতিফলন—‘এসো প্রেম ধ্বংস করো আমাকে/ নিয়ে যাও প্রিয় মৃত্যুর কাছে/ এসো প্রেম ধ্বংস করো আমাকে/নিয়ে যাও তোমার ধ্বংসস্তূপে.../ এসো এসো তুলে ধরো প্রেমে/ যাচ্ছি ডুবে নরকের অন্ধকারে/ এসো এসো সময় যাচ্ছে চলে/ জীবন ধ্বংসের আগে ধ্বংস করো প্রেমে...’

আর এই প্রেম এক মহাজাগতিক, পরাবাস্তব রূপ পায় ‘নিঃসঙ্গতা’ গানে। ‘তুমি না থাকলে আমি নেই/ আমি না থাকলেও যেমন তুমি নেই/ মাঝের বন চিরে ছুটে যায় নদী/ একূলে আমি হরিণ ওকূলে তুমি হরিণী
সে নদীর নাম প্রেম/ দুপাশে ম্যানগ্রোভ মরুভূমি/ ভাসে আকাশের প্রতিচ্ছবি/ মেঘ নয় কুয়াশার কুণ্ডলী/ আদিম সাপের জিহ্বায় বিষের অগ্নি/ এক কূলে আদম অন্য কুলে হাওয়ার সমাধি...’

এই অনুভূতিটা ঠিক বলে বা লিখে বোঝানো যায় না। শুনতে হয়। শুনতে শুনতে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। তখন ‘অনুভব’ করা যায়।

আবার ‘নেকড়ে’ গানটি দেয় আরেক ধরনের বিচিত্র অনুভূতি৷ আপনাকে যে ধ্বংস করতে চায়, তার সঙ্গেও অনেক সময় আপনাকে গলায় গলায় ভাব করে চলতে হয়। সম্ভাব্য শিকার আর শিকারী মিলিত হয় বন্ধুত্বের ভনিতায়৷ আমরা শুনতে পাই—‘হৃদয় কি হৃদয় হবার আগে ছিল কোনো আগ্নেয়শিলা?/ কোনো এক গুপ্ত সমুদ্র ঢেউ যার আগুনের শিখা?/ আগুনের ঢেউ আছড়ে পড়ে সব সৈকতে সৈকতে/ বালিয়াড়ি ভরে আছে দাবানলে পোড়া পশুর শবে...’

আর তাই এই পৃথিবীতে এই অন্তর্ঘাত নিয়ে আপনাকে, আমাকে কিংবা আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। টাইটেল গান ‘মহাশ্মশান’-এ আমরা শুনতে পাই—‘মা, আমি ক্লান্ত/ এ শহরের মুখোশ ক্রেতাদের ভিড়ে খুব ক্লান্ত/ মা, আমি ক্লান্ত / এ শহরের নকল মানুষের ভিড়ে দিকভ্রান্ত.../ তোমার কাছে কোনোদিন আর ফিরবো না জানি/ ফসিলের মতো পেছনে পড়ে আছে মরা গ্রাম/ যদি মৃতদের কাছ থেকে না-ই পালাতাম/ তোমার সূর্যের মতো কোলে কেনো এসেছিলাম!/ মা, আমি ক্লান্ত/ এ শহরের দানবদের ভেতর অবসন্ন/ মা, আমি ক্লান্ত/ বন্ধু চেহারার শত্রুর ভিড়ে বিষণ্ণ...’

আমাদের জীবনে বর্তমানে এই ‘এম্প্যাথি’-র বড্ড অভাব। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিস্টেমের অধীনে আমাদের নিজেদের পুতুল হয়ে থাকার আয়োজন। কিন্তু তখনই আমরা এই ‘নরক’ থেকে একটু হলেও দূরে সরতে পারি, যখন পারি কাউকে ভালোবাসতে। এটা জানান দেয়, আমাদের সংবেদনশীলতা এখনো মরে যায়নি। আর এরকম কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলেও ভালোবাসার এই অনুভূতিগুলো জীবন্তই থেকে যায়। ‘নরকে বৃষ্টি’-তে আমরা তাই শুনি—‘পুরোনো প্রেমের স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে/ পৃথিবীতে এখনো বৃষ্টি নেমে আসে/ খোঁপা খুলে তোমার পিঠের ওপর/ আছড়ে পড়া চুলের মতো/ বৃষ্টি নেমেছে শহরে...’

কিন্তু এই স্নিগ্ধতার অনুভূতি স্থায়ী হতে পারে না। শূন্যতা থাকে, বহতা নদীর মতোই প্রবাহমান হয়ে। আর তারই প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজে এই কথাগুলো—‘আমি এই শহরের এক ঘরে বসে থাকা সেই নিঃসঙ্গ অন্ধ বুড়ো/ 
সাদাছড়ি হাতড়াতে হাতড়াতে শূন্যতায় হোচট খেয়ে টের পাই/ এখানে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো প্রিয়বন্ধু নেই/ এই শহরে নিঃসঙ্গতার চেয়ে আর কোনো সুন্দরী প্রেমিকা নেই...’

আর তাই গভীর রাতে একাকী নির্ঘুম থেকে নিজেদের মনে করা যায় ‘ব্যর্থ মানুষ’। গানটির কথাগুলো যেন বাস্তব হয়ে ওঠে—‘গিটার বেচে দাঁড়ালাম লবণের দোকানে/ গান শুকিয়ে গিয়েছিল আমার কণ্ঠে/ গ্রীষ্মে যেমন লবণ শুকায় মাটির আড়ালে/ তোমার সামনে পারিনি ছুরি লুকোতে.../ আমি প্রচণ্ড ব্যর্থ মানুষ/ সমুদ্রসারস দেখে বলতে পারিনি—কী সুস্বাদু মাংস!/ গ্লেসিয়ারের দিকে তাকাতে পারিনি অগ্নিদৃষ্টিতে/ এবার নিশ্চয় ভেসে যেতে হবে এই অপরাধে...’

কিন্তু মানুষের জীবনে সাফল্য-ব্যর্থতা সবই আপেক্ষিক। তাই আত্মধ্বংসের চেয়ে লড়াই করতে চাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই ব্যাপারটাই উঠে এসেছে ‘আগুনের পঙ্খীরাজ’ গানে। আমরা শুনতে পাই—‘পুড়তে না চাইলে হও আগুন/ কাঁদতে না চাইলে হও জল/ কিছুই নয় যে অপচয়/ যখন আসে তোমার সময়.../ এসো আদিম বুনোঘোড়া/ পোড়ো আকালের শিখায়/ কেশর পুড়ে অন্ধকারে আলো/ ছুটে যাও ঘোড়া দেহে আগুন/ যে থামাতে চায় তোমার গান/ থামাও তুমি তাহার নাম/ যুদ্ধশেষে মৃতের খুলিতে বসে/ পাখি ভাবে জীবন ডানার অপচয়...’

কিন্তু এই লড়াইটা করতে গেলে মানুষ একা তা পারবে না। মানুষের প্রয়োজন হবে বিশ্বাস করতে পারার মতো, পাশে দাঁড়াতে পারার মতো মানুষ। সবমিলিয়ে, ভালোবাসতে পারার মতো মানুষ। অ্যালবামের শেষ গান ‘প্রেম ও শকুন’-এ আমরা শুনতে পাই—‘ভালোবাসলে মৃত্যুর আগে ভালোবাসো/ মৃত্যুর পর ভালোবাসে সে শকুন/ আকাশে ওরা নখরে দিচ্ছে শান/ তাদের না আসার দিকে পেতে রাখো কান/ প্রেমহীনতার ভয়ানক শীতে/ নিও কাছে টেনে/ আঁধার থেকে এসে আঁধারে যাচ্ছি চলে/ মাঝখানে এই জোনাকীর আলো/ ধরে রাখো তোমার চোখে...’

আর তাই শেষপর্যন্ত মানুষ আশা হারায় না। আপনিও যদি হন আশাভঙ্গের বেদনায় বিপর্যস্ত কেউ, তবে জেনে রাখবেন, এখনো পৃথিবীতে কবিতা ও গানের অস্তিত্ব আছে। সুর আছে। আর এর অর্থ হলো, মানুষ তার সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেনি। মানুষের পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতা আছে অজস্র। তবুও মানুষ মানুষকে ভালোবাসে, তাদের জন্য চোখের জল ফেলে। তাই মহাশ্মশানও একদিন প্রাণের মেলায় পরিণত হতে পারে৷ নরকের শহরও একদিন ভিজে যেতে পারে বৃষ্টির অঝোর ধারায়।