বছরের বারো মাসের নাম কীভাবে এলো?

পূর্বাশা পৃথ্বী

প্রতিদিন অফিসের কাগজপত্রে, ডায়েরিতে, ক্লাসের খাতায়, হিসাবের বইয়ে, ইমেইলে কিংবা চিঠিতে আমরা দিন, তারিখ ও মাসের নাম লিখি। খবরের কাগজে বা মোবাইলের পর্দায়ও প্রতিদিন তারিখ দেখি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই মাসগুলোর নাম এলো কোথা থেকে? কেন একটি মাসের নাম এমন, আরেকটি মাসের নাম তেমন?

যেকোনো কিছুর নামের পেছনেই একটি কারণ থাকে। কখনো সেই কারণ অর্থের সঙ্গে, কখনো ইতিহাসের সঙ্গে, আবার কখনো কোনো বিশেষ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। আমরা প্রতিদিন যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তার মাসগুলোর নামের পেছনেও লুকিয়ে আছে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস।

ইংরেজি মাসগুলোর বেশিরভাগ নাম এসেছে প্রাচীন রোমান সভ্যতা থেকে। কোনো মাসের নাম রাখা হয়েছে দেবতা বা দেবীর নামে, কোনোটি বিখ্যাত সম্রাটের স্মৃতিতে, আবার কোনোটি ধরে রেখেছে একটি প্রাচীন ক্যালেন্ডারে তার সংখ্যাগত অবস্থান। তাই বছরের বারোটি মাস শুধু সময়ের হিসাব নয়, ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতিরও স্মারক।

Calender
ছবি: সংগৃহীত

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পটভূমি

প্রতিদিনের কাজকর্মে তারিখ লিখতে আমরা যে খ্রিস্টাব্দের ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তাকে বলা হয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। এর নাম এসেছে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশের নাম থেকে। তিনি ১৫৮২ সালে এই ক্যালেন্ডার চালু করেন।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার আসলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সংশোধিত রূপ। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেছিলেন। সেই ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরে একবার অধিবর্ষ (লিপ ইয়ার) ধরা হতো। ফলে একটি বছরের গড় দৈর্ঘ্য দাঁড়াত ৩৬৫ দশমিক ২৫ দিন।

কিন্তু পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দশমিক ২৪২২ দিন। অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি বছর প্রায় ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড বেশি ধরা হচ্ছিল। এই সামান্য ভুল প্রতি বছর জমতে জমতে প্রায় ১২৮ বছরে এক দিনের পার্থক্য তৈরি করে। ফলে ১৫৮২ সালের মধ্যে বসন্ত বিষুব ক্যালেন্ডারের হিসাবে প্রায় ১০ দিন পিছিয়ে যায়।

খ্রিস্টধর্মে ইস্টারের তারিখ নির্ধারণের জন্য বসন্ত বিষুবের সঠিক সময় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ক্যালেন্ডার সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়ে। এ কারণে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ সিদ্ধান্ত নেন, ক্যালেন্ডারকে আবার ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে আনতে হবে।

তিনি ঘোষণা করেন, ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবরের পরের দিন হবে ১৫ অক্টোবর। অর্থাৎ ৫ অক্টোবর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০টি দিন ক্যালেন্ডার থেকে বাদ দেওয়া হয়। মানুষের জীবন থেকে দিনগুলো হারিয়ে যায়নি, কিন্তু ক্যালেন্ডারে সেগুলোর কোনো হিসাব রাখা হয়নি।

পোপ গ্রেগরি শুধু ১০ দিন বাদ দিয়েই থেমে থাকেননি। ভবিষ্যতে যেন একই সমস্যা না হয়, সে জন্য তিনি অধিবর্ষের নিয়মও পরিবর্তন করেন। জুলিয়ান নিয়মে প্রতি চার বছরে একবার অধিবর্ষ হতো। গ্রেগরিয়ান নিয়মেও প্রতি চার বছরে একবার অধিবর্ষ হয়। তবে শতাব্দীর বছরগুলো—যেমন ১৭০০, ১৮০০ বা ১৯০০—অধিবর্ষ নয়। কিন্তু যে শতাব্দীর বছর ৪০০ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য, যেমন ১৬০০, ২০০০ বা ২৪০০, সেগুলো আবার অধিবর্ষ হিসেবে গণ্য হয়। এই পরিবর্তনের ফলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনেক বেশি নির্ভুল হয়ে ওঠে।

Calender
ছবি: সংগৃহীত

মাসের নামকরণ

জানুয়ারি

বর্তমান ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস জানুয়ারির নাম এসেছে রোমান দেবতা জানুসের নাম থেকে। তিনি ছিলেন পরিবর্তন ও নতুন শুরুর দেবতা। তার প্রতীক ছিল দরজা বা প্রবেশপথ। জানুসকে সাধারণত দুটি মুখসহ দেখানো হতো। একটি মুখ অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকত, আর অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে।

রোমানদের বিশ্বাস ছিল, যেকোনো নতুন কাজ শুরু করার আগে জানুসের আশীর্বাদ প্রয়োজন। তাই পুরোনো বছরকে বিদায় জানানো এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর মাসটির নাম তার নামেই রাখা হয়। আজও নতুন বছরের শুরুতে আমরা পেছনের বছরটির ভুলভ্রান্তি নিয়ে ভাবি এবং সামনে এগোনোর নতুন পরিকল্পনা করি। এই ভাবনার মধ্যেও জানুসের প্রতীকী অর্থের প্রতিফলন দেখা যায়।

ফেব্রুয়ারি

ফেব্রুয়ারির নাম এসেছে ‘ফেব্রুয়া’ নামে একটি রোমান ধর্মীয় উৎসব থেকে। বসন্তের আগমনের আগে রোমানরা নিজেদের, নিজেদের ঘরবাড়ি এবং পুরো শহরকে প্রতীকীভাবে পবিত্র করার নানা আচার পালন করত।

তাদের বিশ্বাস ছিল, পুরোনো বছরের অশুভ শক্তি ও ভুলত্রুটি দূর করে নতুন ঋতুকে বরণ করা উচিত। সেই শুদ্ধিকরণের উৎসব থেকেই ফেব্রুয়ারি মাসের নামের উৎপত্তি। আজও বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতে বসন্তের আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার যে রীতি দেখা যায়, তার সঙ্গে এই প্রাচীন বিশ্বাসের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

মার্চ

মার্চ মাসের নাম এসেছে রোমান যুদ্ধদেবতা মার্সের নাম থেকে। বর্তমানে মার্চ বছরের তৃতীয় মাস হলেও প্রাচীন রোমে এটিই ছিল বছরের প্রথম মাস।

শীত শেষ হওয়ার পর আবহাওয়া অনুকূলে এলে সৈন্যরা যুদ্ধ অভিযানে বের হতে পারত। তাই নতুন বছরের শুরু এবং সামরিক অভিযানের সূচনা একই সময়ে হতো। মার্স শুধু যুদ্ধের দেবতা ছিলেন না। তিনি সাহস, শক্তি এবং রোমান রাষ্ট্রের রক্ষাকর্তা হিসেবেও সম্মানিত ছিলেন। তাই বছরের প্রথম মাস তার নামেই হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

এপ্রিল

এপ্রিল মাসের নামের উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। তবে অনেকের মতে, এটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘এপেরিইয়ার’ থেকে, যার অর্থ ‘খুলে যাওয়া’।

বসন্তকালে ফুলের কুঁড়ি ফোটা, গাছে নতুন পাতা গজানো এবং প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠার ভাবনাকে বোঝাতেই এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এপ্রিলকে প্রকৃতির ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার মাসও বলা যায়।

মে

মে মাসের নাম এসেছে মাইয়া নামের এক রোমান দেবীর কাছ থেকে। তিনি ছিলেন বৃদ্ধি, উর্বরতা এবং পৃথিবীর লালনশীল শক্তির প্রতীক।

বসন্তের শেষভাগে যখন মাঠ-ঘাট সবুজ হয়ে ওঠে এবং প্রকৃতি নতুন প্রাণ ফিরে পায়, তখন রোমানরা মাইয়ার আশীর্বাদ উদযাপন করত। তাই মে মাসের নাম আমাদের জীবনের বিকাশ, সমৃদ্ধি ও নতুন সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়।

জুন

জুন মাসের নাম রাখা হয়েছে জুনো দেবীর নামে। তিনি ছিলেন দেবরাজ জুপিটারের স্ত্রী এবং বিবাহ, পরিবার ও মাতৃত্বের দেবী।

রোমানদের বিশ্বাস ছিল, জুনো সুখী দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক শান্তির রক্ষক। তাই জুন মাসে বিয়ে করলে সংসার সুখের হবে—এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। আজও বিশ্বের বহু দেশে জুন মাসকে বিয়ের জন্য সবচেয়ে শুভ সময় হিসেবে ধরা হয়।

Calender
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই

জুলাই মাসের পুরোনো নাম ছিল কুইন্টিলিস, যার অর্থ ‘পঞ্চম মাস’। কারণ প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালে জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর রোমান সিনেট তার সম্মানে কুইন্টিলিস মাসের নাম পরিবর্তন করে ‘জুলাই’ রাখে। সিজার শুধু একজন বিখ্যাত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করে সময় গণনার ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন। তাই তার নাম আজও বিশ্বের ক্যালেন্ডারে অমর হয়ে আছে।

উল্লেখ্য, প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে শুরুতে মাত্র ১০টি মাস ছিল। তবে ইতিহাসবিদেরা এও উল্লেখ করেন, সেই প্রাথমিক ক্যালেন্ডার সম্পর্কে আমাদের জানা তথ্যের একটি বড় অংশ কিংবদন্তি এবং পরবর্তী রোমান লেখকদের বর্ণনার ওপর নির্ভর করে।

সেই ক্যালেন্ডারে বছরের শুরু হতো মার্চ মাস দিয়ে এবং শেষ হতো ডিসেম্বরে। মজার বিষয় হলো, শীতকালের প্রায় ৬০ দিনের কোনো মাসের নামই তখন ছিল না। কৃষিকাজ বা যুদ্ধের জন্য শীতকালকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো না। তাই সেই সময়টুকু ক্যালেন্ডারের বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে পুরো বছরের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৩০৪ দিন।

পরে রোমের দ্বিতীয় রাজা হিসেবে পরিচিত নুমা পম্পিলিয়াস ক্যালেন্ডারে দুটি নতুন মাস যোগ করেন—জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। তখন বছর ১২ মাসে পূর্ণ হয়। সেই পুরোনো ১০ মাসের ক্যালেন্ডারের ধারাবাহিকতাতেই বছরের শেষের কয়েকটি মাসের নাম আজও রয়ে গেছে।

আগস্ট

আগস্ট মাসের প্রাচীন নাম ছিল সেক্সটিলিস, যার অর্থ ‘ষষ্ঠ মাস’। পরে এর নাম রাখা হয় রোমের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস সিজারের নামে।

অগাস্টাসের শাসনামলে রোমে দীর্ঘ সময় ধরে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ও সাফল্য এই মাসেই অর্জিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তাই তার সম্মানেই মাসটির নতুন নামকরণ করা হয়।

সেপ্টেম্বর

সেপ্টেম্বর শব্দটি এসেছে লাতিন ‘সেপ্তেম’ থেকে, যার অর্থ ‘সাত’।

আজ সেপ্টেম্বর বছরের নবম মাস হলেও প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে এটি ছিল সপ্তম মাস। পরে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি বছরের শুরুতে যোগ হলেও সেপ্টেম্বরের নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি। তাই এই নামের মধ্যেই এখনো প্রাচীন ক্যালেন্ডারের স্মৃতি রয়ে গেছে।

অক্টোবর

অক্টোবর শব্দটির উৎপত্তি ‘অক্টো’ থেকে, যার অর্থ ‘আট’।

একসময় এটি ছিল বছরের অষ্টম মাস। পরে ক্যালেন্ডারের কাঠামো বদলে গেলেও এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি। তাই অক্টোবর এখনো তার প্রাচীন অবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে।

নভেম্বর

নভেম্বর এসেছে লাতিন ‘নভেম’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘নয়’।

বর্তমানে এটি বছরের একাদশ মাস হলেও একসময় ছিল নবম মাস। নামটি সেই অতীতকে ধরে রেখেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা অনেক সময় ইতিহাসকে জীবন্ত করে রাখে।

ডিসেম্বর

ডিসেম্বর শব্দটি এসেছে ‘ডেসিম’ থেকে, যার অর্থ ‘দশ’।

প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে এটি ছিল বছরের দশম এবং শেষ মাস। বর্তমানে এটি বছরের দ্বাদশ মাস হলেও এর নাম এখনো সেই পুরোনো ক্যালেন্ডারের স্মৃতি বহন করে। ডিসেম্বর যেন মনে করিয়ে দেয়, ক্যালেন্ডার বদলাতে পারে, কিন্তু নামের ভেতর ইতিহাস থেকে যায়।

ইংরেজি মাসগুলোর নাম আসলে প্রাচীন রোমের দীর্ঘ ইতিহাস, বিশ্বাস এবং পরিবর্তনের ধারার স্মারক। জানুয়ারি আমাদের নতুনভাবে শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়। ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য আত্মশুদ্ধিতে। মার্চ সাহস ও যুদ্ধের স্মারক। এপ্রিল প্রকৃতির জাগরণের বার্তা বহন করে। মে ও জুনে ফুটে ওঠে প্রাচীন রোমানদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। জুলাই ও আগস্ট ধরে রেখেছে দুই মহান রোমান শাসকের স্মৃতি। আর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চারটি মাস সংরক্ষণ করে রেখেছে প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারের সংখ্যাগত ঐতিহ্য।

তাই প্রতিবার যখন আমরা একটি তারিখ লিখি, তখন নিজের অজান্তেই হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘ যাত্রার একটি অংশকে আবারও স্মরণ করি।