ম্যাড়া শাক চাষে কেন আস্থা উত্তরাঞ্চলের কৃষকের

এস দিলীপ রায়

পাটের বীজ বপনের এক মাসের মধ্যেই বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। উৎপাদন খরচ কেজিতে মাত্র ৪-৫ টাকা, যা বর্তমানে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ টাকায়।

কম খরচ, দ্রুত ফলন ও সারা বছর চাহিদা থাকায় উত্তরাঞ্চলের অঞ্চলের কৃষকদের কাছে ‘ম্যাড়া শাক’ এখন সবচেয়ে লাভজনক শাকগুলোর একটি। অনেক কৃষকের দাবি, এই শাক চাষ করে তারা কখনো লোকসান গোনেননি।

উচ্চ চাহিদা, উৎপাদন খরচ কম এবং নিশ্চিত লাভের কারণে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা এই শাক চাষের আবাদ বাড়াচ্ছেন।

কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে লাল শাক, পালং শাক, কলমি শাক, পুঁই শাক, লাউ শাকসহ বিভিন্ন ধরনের শাকের বাণিজ্যিক আবাদ হলেও সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ম্যাড়া শাকের। এটি মূলত পাটের বীজ থেকে উৎপাদিত শাক, যা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ।

কৃষকদের ভাষ্য মতে, চলতি মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে অনেক ধরনের শাকের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে প্রায় সব ধরনের শাকের দাম বেড়েছে। তবে ম্যাড়া শাক দ্রুত উৎপাদন করা যায় বলে অনেক কৃষক অন্য শাকের বদলে এই শাকের আবাদ বাড়াচ্ছেন।

ম্যাড়া শাক চাষে ব্যস্ত উত্তরাঞ্চলের কৃষক। ছবি: স্টার

লালমনিরহাট সদর উপজেলার ফুলগাছ গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান (৬০) দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি সারা বছর ২০ শতাংশ জমিতে ম্যাড়া শাক চাষ করেন। বছরে ৭-৮ বার বীজ বপন করেন।

তিনি বলেন, ‘একেকবার শাক উৎপাদনে প্রায় চার হাজার টাকা খরচ হয়। ২০ শতাংশ জমি থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ কেজি শাক পাই। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়ে মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা। এক মাস আগেও পাইকারদের কাছে ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি করছি ১৮ থেকে ২০ টাকায়।’

লাভ কম-বেশি হতে পারে, তবে এ শাক চাষ করে কখনো লোকসান গুনতে হয়নি বলে দাবি করেছেন লুৎফর রহমান।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই গ্রামের কৃষক হরিপদ সেন (৬৫) ৪-৫ বছর আগে ৫-৭ শতাংশ জমিতে এই শাক চাষ করতেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অল্প পরিমাণে ম্যাড়া শাক তিনি বিক্রি করতেন।

এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে এ শাক চাষ করছেন এবং প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ জমিতে ম্যাড়া শাক চাষ করে লাভের মুখ দেখেছেন।

‘এই শাক আমাদের এলাকায় খুবই জনপ্রিয়। সারাবছর এ শাকের চাহিদা রয়েছে। অনেক সবজি ব্যবসায়ী ম্যাড়া শাক চাষের জন্য অগ্রিম টাকা দিচ্ছেন,' ডেইলি স্টারকে বলেন হরিপদ।

রংপুর সদর উপজেলার মাহিগঞ্জ গ্রামে ৫৫টি কৃষক পরিবারের প্রায় সবাই শাক-সবজির আবাদ করেন। তবে এর মধ্যে ম্যাড়া শাকের আবাদই বেশি হয় বলে জানান কৃষক মন্তোষ চন্দ্র বর্মণ (৬৫)।

ম্যাড়া শাক চাষে ব্যস্ত কুড়িগ্রামের কৃষক। ছবি: স্টার

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি এক বিঘা জমিতে সারা বছর বাণিজ্যিকভাবে ম্যাড়া শাক চাষ করি।’

তাকেও অনেক ব্যবসায়ী অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখেন বলে জানান।

রংপুর সিটি বাজারের সবজি ব্যবসায়ী জুলহাস হোসেন বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে ম্যাড়া শাক কিনে কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা লাভে বিক্রি করি। পরিবহন খরচ ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। তবে বাজারে এ শাকের চাহিদা সব সময়ই থাকে।’

রংপুর সিটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সহিদুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘আমাদের পরিবারে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ম্যাড়া শাক রান্না হয়। এবার শাকের দাম গত বছরের তুলনায় বেড়েছে, তারপরও কিনছি।’

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাটের বীজ ঘন করে বপনের পর গাছ এক থেকে দেড় ফুট উচ্চতা হলে জমি পরিষ্কার করার জন্য কচি চারা তুলে ফেলা হয়। স্থানীয়ভাবে সেই চারাই ‘ম্যাড়া শাক’ নামে পরিচিত। পরে জমি সমান করে পাটের মূল ফসলের পরিচর্যা করা হয়। এই প্রক্রিয়া থেকেই শাকটির নাম হয়েছে ‘ম্যাড়া শাক’।

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ওয়েব সাইটে প্রকাশিত তথ্য মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক কমপক্ষে প্রায় ৩০০ গ্রাম শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। শাকসবজি কেবল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় না, বরং খাদ্য হজম, পরিপাক ও বিপাকে সহায়তা করে এবং খাবারে রুচি বাড়ায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ভূমিকা রাখে।

ম্যাড়া শাক। ছবি: স্টার

শাকসবজির এসব গুণাগুণ বিবেচনা করে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট শাক হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটের তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছে।

সেগুলো হলো—বিজেআরআই দেশি পাটশাক-১, বিজেআরআই দেশি পাট শাক-২ ও বিজেআরআই দেশি পাটশাক-৩।

এর মধ্যে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বিজেআরআই দেশি পাটশাক-৩ এর চাষ বেশি হয়।  
উৎপাদনের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এই জাতের শাক বলে জানান রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এ অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকের আবাদ হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতেই চাষ হয় ম্যাড়া শাকের।’

কম খরচ, স্বল্প সময়ে উৎপাদন এবং সারা বছর বাজারে চাহিদা থাকায় এটি কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বলে জানান তিনি।

বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশও হয়ে উঠেছে এই শাক। কৃষক পরিবারে পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করছে এটি।’

ম্যাড়া শাক তুলে নিয়ে যাচ্ছেন এক কৃষক। ছবি: স্টার

শুধু তাই নয়, এ শাক উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মধ্যেও দ্রুত ফলনশীল এটি। আগামীতে এর আবাদ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম।

তিনি জানান, ৫-৬ বছর আগে ১৮০০ থেকে ২ হাজার হেক্টর জমিতে ম্যাড়া শাক চাষ হতো। বর্তমানে এ অঞ্চলের প্রায় ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে এ শাক চাষ হচ্ছে।

‘ম্যাড়া শাক উৎপাদন করে লোকসান হয়েছে এমন তথ্য কৃষকের কাছ থেকে শুনিনি। ম্যাড়া শাক উৎপাদন খরচ খুবই কম। তেমন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। শুধু খেতের যত্ন নিতে হয় নিয়মিত। বৃষ্টির পানি এ শাকের প্রধান শত্রু। এটি কৃষকের লাভজনক ফসল,’ যোগ করেন তিনি।