গ্রীষ্মের রঙিন পুষ্প এবং বৃক্ষেরা...
সময়টা এখন গ্রীষ্মের। প্রখর রোদে পথিকের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও এই গ্রীষ্মের রঙিন ফুলগুলো প্রশান্তি দেয়। অফিস থেকে ফেরার পথে, পড়ন্ত বিকেলে যখন সারাদিনের পরিশ্রম শেষে একেবারে নিষ্প্রাণ মনে হয়, তখন চোখে পড়ে উজ্জ্বল হরিৎ বর্ণের সোনালুর সারি। সারি সারি গাছেদের চিরল পাতার মধ্য থেকে ঝুলে আছে উজ্জ্বল হলুদ রঙের সোনালু ফুলেরা।
এই দৃশ্য দেখা যাবে মানিক মিয়া এভিনিউর দিকটায়, সংসদ ভবনের উল্টো পাশে। একে তো তখন তীব্র রোদ্দুরের দুপুর ফুরিয়ে আসছে, অফিস বাসে তখন মনে হয় ঘুমিয়েই পড়েছি। এমন সময়ে নিদ্রা ভেঙে চোখ পড়ে সোনালু গাছেদের দিকে। গাছগুলো দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই ঠায় দাঁড়িয়ে...
বছরজুড়ে শুধু পাতার দেখা মিললেও গ্রীষ্মের এই সময়টাতেই ফুলেরা মেলতে শুরু করে নিজেদের। প্রতি বছর এর কোনো অনিয়ম হয় না। দিন-ক্ষণের আরও সূক্ষ্ম হিসাব যেন আছে প্রকৃতির এই গাছেদের। ঠিক সময়ে নিজেকে মেলে ধরা চাই। অফিস বাসের জানলা দিয়ে আমি আধঘুম চোখে ছাতার মতোন ছায়া দেওয়া গাছগুলো দেখতে থাকি।
সোনালুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে। তখনকার মল চত্বর এখনকার মতোন ছিল না। সেই সময়টায় লাল বাসগুলো সকল ঘন পল্লবের কৃষ্ণচূড়া, জারুল আর সোনালুদের নিচে আমাদের জন্য অপেক্ষা করত।
ইট-কাঠের শহরে বেড়ে ওঠা আমার। সোনালুর দেখা স্কুল বা কলেজে তেমন মেলেনি। তাই প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে এই উঁচু গাছেদের ফুল আর তাদের এত রঙিন প্রতিযোগিতা দেখে মুগ্ধই হয়েছিলাম। পাশেই ছিল বেগুনী জারুল আর তেজস্বী কৃষ্ণচূড়া, আর তার পাশে দীপ্যমান কমলা রঙের রাধাচূড়া। ভাবতাম, এত ভেবে চিন্তে কে এদের নাম রেখেছে? বসন্তে তো দেখা মেলে বাগানবিলাসের, শুনেছি এর নামকরণ করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই নামকরণগুলো যে কতটা সার্থক, সেটা গ্রীষ্মে এই ফুলগুলোর রঙই বলে দেয়।
তাই জিয়া উদ্যান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আর পুরোনো সেই মল চত্বরে যতবার সুউচ্চ এই পুষ্প-বৃক্ষদের দেখেছি, সব সময়েই ক্ষণিকের জন্য হলেও থেমে দেখেছি। প্রবাসে থাকাকালীনও এই ফুলেদের কথা মনে করতাম। সেখানে ঠান্ডার রাজ্যেও ফুলের সমাবেশ কম নয়। প্রকৃতি কোথাও নিজেকে উজাড় করে দিতে কার্পণ্য করে না। তাই সেখানেও বসন্তে টিউলিপ, পেটুনিয়া, ড্যাফোডিল, হাইড্রেঞ্জা, ল্যাভেন্ডারেরা থাকলেও নিজ দেশের আপন পুষ্পদের সঙ্গে তাদের পার্থক্যটা চোখে ধরা দেয়।
সেখানকার পুষ্প বৃক্ষেরা এই রাধাচূড়া, থোকায় থোকায় গুচ্ছ হয়ে থাকা গাড় সবুজ বর্ণের পল্লবের জারুলের মতোন নয়। বেশিরভাগ ফুল গাছই ছোট কিংবা গুল্মের মতোন। গোলাপের ঝাড় অবশ্য বেশ বড় দেখেছি। ছেঁটে না দিলে নিজ উচ্চতাকেও হার মানিয়ে যাবে। তবে পশ্চিমের গোলাপও ভিন্ন। পাপড়ি কম, আমাদের গোলাপের মতোন ঘন নয়। আর ঘ্রাণও নেই বলেই চলে।
সব মিলিয়ে এই ভিন্নতাই আসলে অনুভূতিটাকে আরও গভীর করে তোলে। দূরের দেশের নানা ফুলের সৌন্দর্য যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, মনের সবচেয়ে কাছে থাকে নিজের চেনা জারুলের থোকা থোকা বেগুনি ছায়া আর কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা শিখা।
সোনালুর ছায়া দেওয়া গাছেদের সারি তখন মনে করিয়ে দেয় নানান স্মৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই টগবগে দিন, আর নিজের মাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো অনুভব। তাই যত দূরেই যাওয়া হোক না কেন, চোখ বারবার খুঁজে ফেরে এই চেনা রঙগুলোকে। তাই অফিস থেকে ফিরতি পথে যত ক্লান্তি-অবসাদই থাকুক না কেন, কয়েকটা মিনিট চোখ জুড়িয়ে নেই এই সোনালু, জারুলদের দেখে...
