শিশুর জেদ নাকি উদ্বেগ: ফাসি ইটিংয়ের পেছনে কী মনস্তত্ত্ব কাজ করছে?
রাতের খাবারের টেবিল। মা বলছেন, ‘এক লোকমা। শুধু এক লোকমা।’ শিশু মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। দাদি বলেন, একটু চাপ দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। বাবা ভাবেন, জেদ বেড়ে গেছে। মা একটু পরে হাল ছেড়ে দেন বা রেগে যান কিংবা কান্না চলে আসে—নিজেও বোঝেন না কেন এতটা কষ্ট লাগছে।
এই দৃশ্য অচেনা নয়। এটা ঘরে ঘরে দেখা যায়।
খাবার নিয়ে শিশুর খুঁতখুঁতেপনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ফাসি ইটিং। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেদওয়ানা হোসেন।
তিনি বলেন, ‘শিশুর ফাসি ইটিং অনেক সময় জেদ নয়; এটি তার বিকাশগত স্বাভাবিকতা, উদ্বেগের প্রকাশ অথবা সংবেদনশীলতা-ভিত্তিক একটি কোপিং মেকানিজম। কারণটা না বুঝে শুধু চাপ দিয়ে যাওয়া—এই পথটা তাই প্রায়ই ভুল।’
দুই থেকে ছয়: ‘না’ বলার বয়স
চার বছরের রিহান (ছদ্মনাম) ভাত খায় না। ডাল খায় না। মাছ দেখলে মুখ বন্ধ করে ফেলে। শুধু রুটি আর কলা খায়। মা প্রতিদিন নতুন কিছু চেষ্টা করেন, প্রতিদিন হতাশ হন। প্রতিবেশীরা বলে, ‘আপনি বাচ্চাকে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন।’ মা ভেতরে ভেতরে নিজেকেই দোষ দিতে থাকেন।
রিহানের এই আচরণ শুধু প্রশ্রয়ের ফল নয়। ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘বিকাশগত মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে দুই থেকে ছয় বছর বয়সটা একটা আলাদা পর্যায়। এই সময়ে শিশু টের পায়—সে একটি আলাদা সত্তা, তার নিজের পছন্দ আছে।
খাবার খাওয়া বা না খাওয়া হয়ে ওঠে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণের একটা উপায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে অটোনমি।’
ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের হ্যারিস, সার্ল, জ্যানসেন ও থর্প তাদের ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখিয়েছেন, ফাসি ইটিং মূলত এই অটোনমির বিকাশগত প্রকাশ। ‘আমি খাব না’ কথাটি তাই অনেক সময় আসলে বলছে—‘আমার নিজের সিদ্ধান্ত আছে।’
বিবর্তনের দিক থেকেও একটা ব্যাখ্যা আছে। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির লিন বার্চ ও মার্লিন ১৯৮২ সালে দেখিয়েছিলেন, অপরিচিত খাবার এড়ানোর প্রবণতা আদতে একটি বিবর্তনগত সুরক্ষাব্যবস্থা—যাতে শিশু অজানা বিষাক্ত কিছু মুখে না দেয়। ফুড নিওফোবিয়া এই বয়সে তাই অস্বাভাবিক নয়। দুই বছর থেকে শুরু হয় ছয়ের কাছাকাছি বয়সে এটা সর্বোচ্চে পৌঁছায়, তারপর ধীরে কমে।
ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘দুই থেকে ছয় বছর বয়সে খাবার নিয়ে আপত্তি করা একটি সাধারণ ডেভেলপমেন্টাল ফেজ। সমস্যা হলো, এই স্বাভাবিক পর্যায়টাকে পরিবার প্রায়ই জেদ ভেবে ভুল করে। আর সেখান থেকেই চাপ দেওয়া শুরু হয়, সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।’
উদ্বেগ: যে কারণটি চোখে পড়ে না
ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘উদ্বেগ ফাসি ইটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত কারণ। কিছু শিশু নতুন খাবারের রঙ, গন্ধ বা টেক্সচার নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল। তাদের কাছে অপরিচিত খাবার শুধু অপছন্দের বিষয় নয়, রীতিমতো অস্বস্তিকর একটা অভিজ্ঞতা। সে ভয় পাচ্ছে, এড়িয়ে যাচ্ছে।’
পাঁচ বছর বয়সী তিয়াশার (ছদ্মনাম) কথা ভাবুন। নতুন কোনো খাবার দিলে সে কাঁদে। শুধু কাঁদে না—তার শরীর শক্ত হয়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়। মা ভাবেন মেয়ে নাটক করছে। আসলে তিয়াশার কাছে সেই অজানা গন্ধটা, সেই নরম থকথকে টেক্সচারটা—সহ্য করা কঠিন। তার স্নায়ুতন্ত্র সেটাকে বিপদের সংকেত হিসেবে পাঠাচ্ছে।
আইসল্যান্ডের ল্যান্ডস্পিতালি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের থর্স্টেইনসডোত্তির ও সহকর্মীদের গবেষণা, যা ২০২২ সালে ‘ওবেসিটি সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ জার্নালে প্রকাশিত, দেখিয়েছে উদ্বেগজনিত সমস্যা আছে এমন শিশুদের মধ্যে ফাসি ইটিংয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ইউনিভার্সিটি অব লাফবরোর ফ্যারো ও কোলথার্ডের কাজেও এই সম্পর্কটা বারবার উঠে এসেছে।
এই সংবেদনশীলতার কথা বলতে গিয়ে ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘অ্যাংজাস টেম্পারামেন্ট বা সেন্সরি প্রসেসিং সেন্সিটিভিটিযুক্ত শিশুরা নতুন খাবারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অনুভব করতে পারে, যার ফলে এড়িয়ে যাওয়ার আচরণ তৈরি হয়।’
চাপ দিলে কী হয়?
শিশু খাচ্ছে না দেখে বাবা-মা স্বাভাবিকভাবেই চাপ দেন। ‘এক লোকমা খেলে গল্প বলব’, ‘না খেলে বাইরে যাবে না’—এই কৌশলগুলো প্রায়ই উল্টো কাজ করে।
রিহানের বাবা একদিন ঠিক করলেন, আজ না খাইয়ে ছাড়বেন না। এক ঘণ্টা চেষ্টার পর রিহান বমি করে দিলো। সেদিন থেকে বাচ্চাটি খাবার টেবিলে বসতেই ভয় পায়। টেবিলটা তার কাছে আর খাওয়ার জায়গা নেই, হয়ে গেছে লড়াইয়ের জায়গা।
পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্যালোওয়ে ও বার্চের ২০০৬ সালের গবেষণা, যা ‘অ্যাপিটাইট’ জার্নালে এসেছিল, দেখিয়েছে চাপ দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টায় শিশু ওই খাবারের প্রতি আরও বিরূপ হয়ে পড়ে।
নেদারল্যান্ডসের ইরাসমাস ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গবেষণায় ৪ হাজার ৮৪৫টি মা-শিশু জুটিকে বছরের পর বছর অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণার ফলে পাওয়া গেছে, বাবা-মায়ের চাপ এবং শিশুর ফাসি ইটিং একে অপরকে বাড়াতে থাকে। শিশু খেতে চায় না, বাবা-মা চাপ দেন; চাপ পেলে শিশু আরও খেতে চায় না।
ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপ, জোর করা বা এক লোকমা খেতেই হবে ধরনের কঠোরতা শিশুর মধ্যে খাবার-সংক্রান্ত অ্যাংজাইটি বাড়াতে পারে।’ আবার উল্টো দিকটাও আছে—অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিলে সিলেক্টিভ ইটিং আরও স্থায়ী হতে পারে। চাপ নয়, আবার সব মেনে নেওয়াও নয়—মাঝের এই ভারসাম্য রক্ষা করাটাই কঠিন, কিন্তু জরুরি।’
যখন এটা আরও গভীর কিছুর লক্ষণ
ডা. রেদওয়ানা হোসেন বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে ফাসি ইটিং গভীরতর নিউরো ডেভেলপমেন্টাল অবস্থার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে। যেমন: এডিএইচডি বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, যেখানে সেন্সরি ইন্টিগ্রেশন এবং রুটিন রিজিডিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
সাত বছরের আরিয়ানের (ছদ্মনাম) মা বছরের পর বছর ভেবেছেন ছেলে জেদি। সাদা ভাত ছাড়া কিছু মুখে নেয় না। পাতে অন্য রঙের কিছু এলে চিৎকার করে ওঠে। পরে জানা গেল, আরিয়ান অটিজম স্পেকট্রামে আছে। তার কাছে পাতে নতুন কিছু আসা মানে শুধু অপরিচিত খাবার নয়—পুরো রুটিনটা ভেঙে পড়া। সেই কষ্টটা সে বলতে পারে না। চিৎকারটাই তার ভাষা।
তুরস্কের হাজেত্তেপে ইউনিভার্সিটির কাসাক ও সহকর্মীদের গবেষণা, যা ২০২৫ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইটিং ডিজঅর্ডার্স’-এ প্রকাশিত, দেখিয়েছে এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সিলেক্টিভ ইটিং ও সেন্সরি প্রসেসিংয়ের সমস্যা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের স্মিথ, রজার্স, ব্লিসেট ও লুডলো ২০২০ সালে ‘অ্যাপিটাইট’ জার্নালে দেখিয়েছেন, নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারযুক্ত শিশুদের মধ্যে সেন্সরি সেন্সিটিভিটি ও ফাসি ইটিংয়ের সরাসরি যোগ আছে।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
শিশু যদি ২০টির কম ধরনের খাবার খায়, খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ভয় বা কান্না দেখা দেয় অথবা ওজন বা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়—এই পরিস্থিতিগুলো ‘দেখি কী হয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার নয়।
নতুন খাবারে অভ্যস্ত করতে ধৈর্যের বিকল্প নেই। বার্চ ও মার্লিন দেখিয়েছিলেন, একটি নতুন খাবারে অভ্যস্ত হতে শিশুর ১০ থেকে ১৫ বারের সংস্পর্শ লাগতে পারে। একবার ফিরিয়ে দেওয়া মানেই চিরতরে না নয়। রিহানের মা যেদিন জোর করা ছেড়ে দিলেন, শুধু খাবার পাশে রাখলেন—সেদিন থেকে ধীরে ধীরে রিহান নিজেই তা ছুঁয়ে দেখতে শুরু করেছিল।
ডা. রেদওয়ানা বলেন, ‘ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিতে ফাসি ইটিংকে শুধুমাত্র আচরণগত সমস্যা হিসেবে না দেখে শিশুর ইমোশনাল স্টেট, ফ্যামিলি ডায়নামিক্স এবং ডেভেলপমেন্টাল স্টেজ একসঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনায় সাধারণত বিহেভিয়ারাল মডিফিকেশন, পজিটিভ রেইনফোর্সমেন্ট এবং গ্র্যাজুয়াল ফুড এক্সপোজার কার্যকর।’
‘তাই এটা বোঝা দরকার, খাবারের টেবিলে শিশু যখন মুখ ঘুরিয়ে নেয়, সে কিছু একটা বলতে চাইছে। সেটা বোঝার চেষ্টা না করে শুধু থালা এগিয়ে দিলে দূরত্বটা কমে না, বরং সমস্যা আরও বাড়ে’, যোগ করেন এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।





