রাকার চিঠি
রাকা এই কেবল পড়তে শিখেছে। লিখতেও শিখেছে। ক আকার কা। কা এর পাশে ক লিখলে হয়ে যায় কাক। প লিখলে হয় কাপ। দন্তন্য লিখলে? কান!
রাকার খুব ভালো লাগে লিখতে। এ যেন এক মজার খেলা। শব্দের পাশে শব্দ বসায়। হয়ে যায় কথা। কাক ডাকে। কা কা কা। কাক পানি চায়। কাপে পানি দেই। কাক খুশি। হাসে হা হা।
জানালার পাশেই এক আমগাছ। সেখানে বাসা বানায় এক কাক। তাকেই চিঠি লেখে জানতে। চিঠিতে লেখে, ও কাক! তুমি কেমন আছ? আমি ভাল আছি। ও কাক, তোমার কান নেই? তোমার চোখ দেখি। মুখ দেখি। কান তো দেখি না।
চিঠিটা জানালার পাশেই রেখে দিল। ও মা! কাক বন্ধু ঠিক উড়ে এল। বসল জানালার পাশে। ঠোঁটে তুলে নিল চিঠিটা। চোখ বোলায় চিঠিতে। যেন পড়ে নিল সবটা। এরপর বলল, কা কা কা!
এরপর চিঠিটা নিয়ে দিল উড়াল। গেল আমগাছের ডালে। বাসা বানাতে লাগল। চিঠিটা রেখে দিল বাসাতেই। রাকা খুব খুশি। কাক বন্ধু ওর চিঠি পেয়ে খুশি। নইলে নিজের বাসায় নেবে কেন? চিঠির জবাবও দিয়েছে। নিজের ভাষায় কিছু একটা বলেছে। যা বলেছে, তা রাকা বুঝতে পারছে না। কী মুশকিল!
রাকা ভাবে। দিনরাত ভাবে। বুঝে পায় না কিছুই। শেষে আর না পেরে মা'কে বলে। মা হেসে চুমু দেন রাকার কপালে। বলেন, বন্ধুর সব কথা বোঝার দরকার নেই। মন বুঝলেই হলো। তোর কাক বন্ধু চিঠি পেয়ে খুশি হয়েছে। সেটা তো বুঝতে পেরেছিস। ওতেই হবে।
মা বলেছেন, বড় হতে হতে অনেক বন্ধু হবে। নানান ভাষার বন্ধু। সবার ভাষা হয়তো রাকা বুঝবেই না। তাতে কী? মন ঠিকই বুঝে নেবে, কে বন্ধু।
জানালার ওপাশে আমগাছে তখন কাকটা। কেবল বাসা বানানো শেষ হলো। জানালার দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল, কা কা কা।
কাক বন্ধু যেন রাকাকে জানাল, কাজ শেষ। এখন আমি খুশি।
রাকার তো তেমনই মনে হলো। কাক বন্ধু উড়ে এল ওর পাশে। আবার বলল, কা কা কা!
রাকার যেন মনে হলো, কাক বলল, আমারও কান আছে। পালকের আড়ালে লুকানো। বাইরে থেকে দেখা যায় না।
কী আনন্দ! মা-ও ঠিক তাই বললেন। বললেন, কাকেরও কান আছে। ওরাও শুনতে পায়।
রাকা বলে, জানি মা। কাকের কান পালকের আড়ালে লুকানো। বাইরে থেকে দেখা যায় না।
মা হেসে বলেন, সবার কান একরকম না। তাই না রাকা?
ঠিক তাই। সবার কান একরকম না। সবাই একরকম না দেখতে। কিন্তু বন্ধুর মন সবারই একরকম। বন্ধুরা চিঠি পেলে খুশি হয়। তাই তো রাকা আরও চিঠি লিখল। কাকে কাকে লিখল?
বেড়াল বন্ধুকে লিখল, মাছ খাবে? বেড়াল বন্ধু চিঠি পেয়ে বলে, ম্যাও! এর মানে, খাব রে খাব! রাকা বুঝেছে।
অরা, ফাইজা, আরিফকেও চিঠি লিখল রাকা। বিকেলে খেলার মাঠে দিল ওদের। তখন ওরা যে কী খুশি! ওরাও কেবল পড়তে শিখেছে। লিখতেও শিখেছে।
পরদিন ওরাও চিঠি দিল রাকাকে। রাকা যে কী খুশি!
নানাভাই চিঠি লিখেছেন। লিখেছেন, পুকুরে হাঁস সাঁতরায়। ছুটিতে বাড়ি এসো। ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শোনাব।
ছোট ফুপু বন্ধুদের নিয়ে সাগরে গেল। রাকাকে চিঠি লিখল। লিখল, রাকা সোনা! সাগরের পাড়ে বালি আর বালি। লাল লাল কাঁকড়া ছোটে। একটা শামুক কুড়িয়েছি। তোকে দেব।
বাবা লিখলেন অফিস থেকে। লিখলেন, অফিসে অনেক কাজ। তবুও তোর কথা মনে পড়ে রাকা সোনা। বাড়ি ফিরেই তোর সাথে দাবা খেলব।
মা তো কলেজে পড়ান। পড়ানোর ফাঁকে রাকাকে চিঠি লিখলেন। লিখলেন, অনেক বড় হ মা। তোর সাথে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াব। খুব মজা হবে।
রাকা সবার চিঠির, সব চিঠির জবাব দেয়। এরকম চিঠি লেখার খেলা চলছিল। চিঠির জবাব পাওয়ার আনন্দ জমছিল। একদিন কী হ'ল, জানো?
একদিন, রাকা তখন খেলার মাঠে। উড়ে এল এক চিঠি। উপরে রাকার নাম লেখা। আর লেখা রাকার বন্ধুদের নাম। কাক, বেড়াল, অরা, ফাইজা, আরিফ। তবে নামগুলো কেমন হিজিবিজি করে লেখা। যেন গাছের পাতা উড়ে যাওয়ার আগে দাগ কেটেছে।
চিঠি খুলতেই উড়ে গেল এক মুঠো বাতাস। টের পায়, ফুলের সুবাস জড়িয়ে আছে চিঠিতে। যেন ফিসফিস করে ডাকল কেউ। যেন কানে কানে গান শোনাল।
রাকা বলে, এ কার চিঠি?
রাকার বন্ধুরাও জানতে চায়। কার চিঠি এ? যার চিঠি, সে কী বাতাসের মতো? কোথাও থাকে না। আবার সবখানে আছে।
চিঠির কাগজ ভিজে গেছে কোথাও কোথাও। লেখাগুলো কোথাও কোথাও ঝাপসা। বৃষ্টি লেখেনি তো চিঠিটা? আকাশ থেকে ঝরতে ঝরতে লিখেছে।
চিঠির ভাঁজে ভাঁজে রং লেগে আছে। বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। যেন কেউ কোনো কলম দিয়ে লেখেনি। যেন আকাশের সাত রং-ই লেখা হয়ে গেছে।
রাকার মনে হলো, রংধনুই লিখেছে চিঠিটা। রাকা বন্ধুদের সাথে নিয়ে পড়ে রংধনুর চিঠি। রংধনু লিখেছে,
"প্রিয় রাকা ও রাকার বন্ধুরা,
তোমরা তো এখন শব্দ লিখতে শিখেছো। আমি লিখি রঙ দিয়ে। লিখি বৃষ্টি, সূর্য, আকাশ, নদীর গল্প।
তোমরা লিখে খুশি হও। আমি খুশি হই কখন? যখন আমাকে তোমরা দেখতে পাও।
কখন তোমরা আমাকে দেখতে পাও?
যখন বন্ধু হয় বৃষ্টি আর সূর্যের আলো।
তখন আমি বাতাসে ভাসি। বৃষ্টির ফোঁটায় হাসি। সূর্যের আলোয় ঝলমল করে উঠি।
আমি সবখানে আছি, আবার কোথাও নেই।
প্রিয় রাকা ও রাকার বন্ধুরা,
তোমরাও বন্ধুদের সাথে মিলে রংধনু হতে পারো। আলো আর বৃষ্টির মতো। তোমাদের বন্ধুত্বেই ফুটে উঠবে জীবনের সব রং।
ইতি,
তোমাদের রংধনু বন্ধু।"