যে কারণে পিঁপড়ারা সঙ্গীদেরও আক্রমণ করে

রবিউল কমল
রবিউল কমল

সাধারণত পিঁপড়া গন্ধের মাধ্যমে একে অন্যকে চিনতে পারে। তবে নতুন গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণের কারণে তারা বিভ্রান্ত হয়। মানে তাদের গন্ধ বদলে যায়। তখন আর পরিচিত পিঁপড়াকে চিনতে পারে না। ফলে একই কলোনির অন্য পিঁপড়াকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে।

বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েনটিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাড়ি ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন ওজোন ও নাইট্রিক অক্সাইড পিঁপড়ার শরীরের গন্ধ বদলে দিতে পারে। এতে একই কলোনির পিঁপড়ারা অন্যকে অনুপ্রবেশকারী ভেবে আক্রমণ করে।

ওজোন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, যা গাড়ি ও শিল্পকারখানা থেকে তৈরি হয়। এই ওজোন অ্যালকেন নামের কিছু রাসায়নিক ভেঙে ফেলে। আবার এই অ্যালকেনই পিঁপড়ার কলোনিভিত্তিক বিশেষ গন্ধের একটি অংশ তৈরি করে।

জার্মানির ইয়েনা শহরের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইকোলজির বিজ্ঞানী মার্কাস নাডেন ও তার সহকর্মীরা আগের গবেষণা থেকেই জানতে পেরেছিলেন, ওজোন গ্যাসের কারণে অ্যালকেন বদলে গেলে পোকামাকড়দের পারস্পরিক যোগাযোগে সমস্যা হয়।

পিঁপড়ার ওপর বায়ুদূষণের ওপর প্রভাব দেখতে নাডেন ও তার দল ৬ প্রজাতির পিঁপড়া নিয়ে কৃত্রিম কলোনি তৈরি করেন।
প্রতিটি কলোনি থেকে একটি করে পিঁপড়াকে বের করে বিভিন্ন মাত্রার ওজোনভরা কাচের পাত্রে রাখা হয়। এই ওজোনের মাত্রার কিছু ছিল গ্রীষ্মকালে ইয়েনা শহরের বাতাসে পাওয়া মাত্রার সমান।

পরে সেই পিঁপড়াকে আবার তার কলোনিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন দেখ গেল, অন্য পিঁপড়ারা তাকে আক্রমণ করছে।

নাডেন বলেন, সত্যি বলতে আমি এটা আশা করিনি। কারণ অ্যালকেন পিঁপড়ার মোট গন্ধের খুব সামান্য অংশ বদলে দিয়েছিল, মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ। আমরা ভেবেছিলাম, এত অল্প পরিবর্তন বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

নাডেন বলেন, পরিবেশের এই আচরণে পিঁপড়া কলোনির কার্যকারিতা কমে যাবে। এমনকি যদি পিঁপড়াগুলো মারা না-ও যায় তবুও কমবে। তবে প্রকৃতিতে কীভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তা পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন।

নিউইয়র্কের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ক্রোনাওয়ার বলেন, অ্যালকেন পিঁপড়ার নিজের সঙ্গীদের চিনতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এই আক্রমণাত্মক আচরণ তাকে অবাক করেনি।

অ্যালকিন পিঁপড়ার পথ চেনা এবং বাচ্চা ও প্রাপ্তবয়স্ক পিঁপড়ার মধ্যে যোগাযোগেও সহায়তা করে।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, ওজোনের সংস্পর্শে এলে প্রাপ্তবয়স্ক ক্লোনাল রেইডার পিঁপড়া তাদের বাচ্চাদের অবহেলা করতে পারে। এর মানে, ওজোনের কারণে গন্ধের পরিবর্তন শুধু আক্রমণ নয়, বরং পিঁপড়ার জীবনের আরও অনেক দিক দিয়ে ও পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ক্রোনাওয়ার বলেন, পরিবেশের জন্য পিঁপড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থলভাগের বেশিরভাগ পরিবেশ থেকে যদি পিঁপড়াদের সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই পরিবেশ ভারসাম্য হারাবে।

কারণ পিঁপড়ারা বিভিন্ন ফল ও ফুলের বীজ ছড়িয়ে দেয়, মাটি নড়াচড়া করে উর্বরতা বাড়ায়, বহু জীবের সঙ্গে পারস্পরিক উপকারমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলে।

নিউ সায়েনটিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বে পোকামাকড়ের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই গবেষণা সেই প্রমাণের তালিকায় আরেকটি কারণ যোগ হলো। যেখানে দেখা গেছে বায়ুদূষণও এই পতনের একটি বড় কারণ।

নাডেন বলেন, আমরা যে মাত্রার দূষণের মধ্যে আছি, তা হয়তো এখনো মানুষের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর নয়। কিন্তু আমাদের কাজের যে মূল্য প্রকৃতিকে দিতে হচ্ছে, তা হয়তো আমরা আগে ভাবিনি।