পড়তে জানা হাঁসদের ছানা!
আদ্যিকালের বুড়ি। থাকেন এক ঝুরঝুরে কুঁড়েঘরে। দু কুলে কেউ নেই তার। শুধু এক নাতি ছাড়া। সেও থাকে কোন সে নদীর ওপার। কী নাকি চাকরি বাকরি করে। সারা বছরেও আসে না একটাবার। শুধু চিঠি দেয়। আর বলে, 'টুকটুকিয়ে কোন রকমে চলে এসো তো দাদি। তোমাকে আনতে গেলেই চাকরিটা যাবে। পারলে একা একাই চলে এসো আমার কাছে!'
তা দাদি হয়েছেন বুড়ো। তার কি আর সে সময় আছে, যে বাকসো প্যাটরা নিয়ে হন হন করে ছুটে যাবেন।
তাই একাই থাকেন। একাই কাঁদেন। দুটো শাকপাতা রেধে এ বেলা ও বেলা খান। চোখে দেখেন কম। হাটতেও হয় ভারি কষ্ট। তার শুধু ইচ্ছে, একটিবার গিয়ে নাতিকে দেখবেন! এভাবে কষ্টে শিষ্টে আছেন দাদি বহুবছর ধরে।
একদিন সকাল বেলা। ঘুম থেকে উঠেছেন দাদি। দোর খুলেছেন। পা বাড়াতেই ঠেকলো তুলতুলে কী একটা জিনিস। মুখ নামিয়ে দেখতে গেলেন। ওমা, এ যে এক হাঁসের ছানা!
'কী রে, কই থেকে এলি?' আপনমনেই বললেন দাদি।
হাঁসটি কুই কুই করে ডেকে উঠলো একবার। তারপর লটপট করে দাদির শাড়ির ভাঁজে গিয়ে লুকালো।
সেদিন থেকেই হাঁসটি দাদির সঙ্গে আছে। আজকাল বেশ বড় হয়েছে। দাদি খুব ভালোবাসেন হাঁসটিকে। তবে হয়েছে এক জ্বালা! হাঁসটা ডিম পাড়ে না। বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে দাদির বড় কষ্ট হয়।
পাড়া পড়শী যত আসে, নথ নাড়িয়ে দাদিকে বকে যায় 'তোমার যে কী হাউস দাদি! নড়তে চড়তে পারো না। ওদিকে হাঁসের জন্য গুগলি শামুক খুঁজতে যাও। কী এমন হাঁস তোমার। ডিম দেবার নামটি নেই। শুধু বসে বসে খাবে!'
দাদি কিছু বলেন না। মনে মনে ভাবেন, 'নাই বা দিলো ডিম!'
ওদিকে হাঁসটি ছিল এতো দিন ফরফরে সাদা। তা হলো কি জানো? আচমকা একদিন পিঠের পালক সব হলদে হয়ে গেল। যে সে হলুদ নয়, একদম চকচকে পলিশ করা! দাদি ভেবে পান না, কী থেকে কী হল!
এরপর সেই হলুদ পালক খসে পড়তে লাগলো। প্রতিদিন মাত্র একটি করে। পালকটি খসে পড়তেই হাঁস সেটা ঠোঁটে তুলে নেয়। তারপর নিয়ে আসে দাদির কাছে। দাদি বলেন, 'ও কী, এ পালক দিয়ে কী করবো আমি? পারলে একটা ডিম পেড়ে দে!'
নাহ, হাঁস ডিম দেয় না। শুধু একটা করে পালক জমা দেয় দাদির কাছে। শেষে হলো এক বোঝা পালক। কী আর করবে দাদি? পালকগুলো দিয়ে মস্ত পাখা বুনতে বসলো। দু বছর ভরে জমানো সব পালক। তাই দিয়ে হলো এক জমকালো পাখা।
এক রাতে পূর্ণমার চাঁদ ওঠেছে। চকচকে আলোর কাঠি যেন তির তির করে ছুটছে। দাদু হলদে পালকের পাখাটা উঠোনে রাখলেন। চাঁদের আলো হুমড়ি খেয়ে পড়লো পাখার উপর। লাখো লাখো ঝিলিমিলিতে ভরে উঠলো দাদির উঠান। আর তখুনি ঝুপ ঝাপ ঝুপ। হাঁসের এক পাল নেমে এলো উঠানে। সবগুলো হাঁস কী ফরফরে! শুধু পিঠের পালক টুকু হলদে। দেখতে ঠিক দাদির হাঁসের মতো!
ঝাকের সবচেয়ে বড় যে হাঁস, কথা বলে উঠলো মানুষের মতো। 'দাদি মা, তোমার ঘরে যে হাঁসটি আছে, ও আমাদেরই হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট মেয়ে। কতদিন ধরে খুঁজছি আকাশটা চষে। আজকে যেই তুমি হলদে পালকের চকচকে পাখাখানি মেললে, ঠিক চিনে ফেললাম। অমন পালক তো আমাদের ছাড়া আর কারো হয় না!'
দাদি মুখ হা করে থম মেরে বসেছেন। হাঁস কথা বলে! তাও আবার মানুষের মতোই। কী আজিব না? দাদির মুখ থেকে আর কোনো কথাই সরে না।
'বুঝেছি তো, অবাক হয়েছ খুব! শোন দাদি, আমরা কিন্তু যেমন তেমন হাঁস নই! আমরা থাকি বড় এক পাহাড়ের আড়ালে। পাশেই তার সাগর। ওখানে শত শত বছর ধরে আছি। কোন ঝুট ঝামেলা ছাড়াই থাকছি তো। তাই একটা শহর গড়ে তুলেছি। হাসদের শহর! কোনো মানুষ কখনো যায়নি সেখানে!'
সেই শহরে কী নেই! খেলার মাঠ, স্কুল, সুইমিং পুল। জানো, বাকি হাঁসেদের মতো অত জলদি ডিম পাড়ি না আমরা। তার বদলে পড়াশুনা করি। কতকিছু শিখি। তাই তো আমাদের বুদ্ধির জুড়ি নেই। এই দেখো না আমি, কেমন কথা বলা শিখে ফেলেছি। এটাও আমাদের স্কুল থেকেই!'
দাদি শুনে তাজ্জব। সুযোগ পেলে তবে হাসেরও বুদ্ধি খোলে! পড়াশুনার কী জোর, দ্যাখো দেখি! আমরা হাঁসদের সুযোগ দিই না বলেই না পড়া শিখতে পারে না!
হাঁস তাড়া দেয়, 'এবার আমাদের হারানো হাঁসটাকে নিয়ে যাব দাদি। তার আগে বলো তো, তোমার কী উপকার করতে পারি?'
দাদি ভাবলেন, কী লাগবে তার। নাহ, সব আছে। ওমনি মনে পড়ল, নাতিকে যদি একটু দেখতে পেত।
হাঁসের দল বলল, 'সে আর কী কঠিন! আমরা শুধু পড়াশুনাই করি না, মানুষের মতো জিমেও যাই। দেখছো না, কেমন শক্তপোক্ত মাসল। উঠে বসো আমাদের পিঠে। তোমায় নিয়ে দিয়ে আসি এক্ষুনি!'
দাদি বসলেন শক্তপোক্ত এক হাঁসের পিঠে। হাঁসেরা উড়ল আকাশে। জীবনে দাদি কোথাও যাননি। তাই আকাশে উঠে দাদির ভারি ফুর্তি লাগল। আর নাতিকে দেখতে পাবে ভেবে, খুশিতে চোখ ভরে টলোটলো জল এলো।
তবে দাদিটা যে কী বোকা! হাঁসদের একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কোথায় সেই পাহাড়, যেখানে আছে মাঠ, স্কুল। আর হাঁসেদের বানানো চমৎকার এক শহর!