খেলোয়াড়রা হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি কখন পরেন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ধরুন দুটি জার্সির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, একই দল, একই লোগো, কিন্তু রং সম্পূর্ণ আলাদা। এর মধ্যে একটি জার্সি প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই দেখেছেন। তাই অন্যটি দেখে হয়তো ভাবছেন, ‘একটি দলের কেন দুইটি জার্সি?’

সত্যি বলতে, বেশিরভাগ সমর্থকই হয়তো এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানেন না।

হোম জার্সি হলো কোনো ক্লাব বা দলের প্রধান জার্সি। সাধারণত খেলোয়াড়রা নিজেদের মাঠে তাদের ঐতিহ্যবাহী রঙের এই জার্সি পরেন। আর অ্যাওয়ে জার্সি হলো এমন একটি জার্সি যার রং ভিন্ন রাখা হয়। যেন মাঠে দুই দলের খেলোয়াড়দের সহজে আলাদা করা যায়। রঙের মিল থাকলে অতিথি দল তাদের জার্সি পরিবর্তন করে। অ্যাওয়ে জার্সির জন্য নির্দিষ্ট কোনো রং নেই। একমাত্র নিয়ম হলো, প্রতিপক্ষ দলের সঙ্গে মিললে হবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে কোন দল কোন জার্সি পরবে?

বিশেষ করে বড় টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো দেশের বাইরে বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়। তখন দুই দলকেই অন্য দেশে খেলতে হয়। যেমন বিশ্বকাপ, ইউরো বা কোপা আমেরিকা। তখন এই প্রশ্ন ওঠে, কোন দল হোম জার্সি পরবে আর কোন দল অ্যাওয়ে জার্সি?

এ ক্ষেত্রে ম্যাচের আয়োজক সংস্থা আগেই একটি দলকে ‘হোম টিম’ এবং অন্য দলকে ‘অ্যাওয়ে টিম’ হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়। সাধারণত ‘হোম টিম’ তাদের প্রধান বা হোম জার্সি পরার সুযোগ পায়। অন্য দলের যদি তাদের জার্সির রংয়ের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে অ্যাওয়ে জার্সি পরে। তবে প্রয়োজন হলে আয়োজক সংস্থা উভয় দলকেই ভিন্ন জার্সি পরার নির্দেশ দিতে পারে। তাই বিশ্বকাপ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে কোনো দল নিজেদের দেশের বাইরে খেললেও হোম জার্সি পরে মাঠে নামতে পারে।

আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

ফুটবলে হোম জার্সি কী

হোম জার্সি হলো একটি দল বা ক্লাবের মূল পরিচয় বহনকারী জার্সি। এতে থাকে দেশ বা ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী রং। আর বছরের পর বছর ধরে সমর্থকরা সেই রঙ দেখে আসছেন।

সাধারণত নিজেদের মাঠে, নিজেদের দর্শকদের সামনে, দলটি এই জার্সি পরে খেলে।

হোম জার্সির নকশা খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না। কারণ এটি দলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। একটি হোম জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ গোলের স্মৃতি, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গল্প, ঐতিহাসিক ম্যাচের আবেগ, প্রজন্মের পর প্রজন্মের সমর্থকদের ভালোবাসা।

তাই অনেক সমর্থকের প্রথম পছন্দ সবসময় হোম জার্সি।

ব্রাজিল ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
ব্রাজিল ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

অ্যাওয়ে জার্সি কী, কেন প্রয়োজন

অ্যাওয়ে জার্সি হলো দলের দ্বিতীয় বা বিকল্প জার্সি। এটি সাধারণত প্রতিপক্ষের মাঠে খেলার সময় ব্যবহৃত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য একটাই, খেলোয়াড়দের সহজে আলাদা করে চেনা।

যদি দুই দলের হোম জার্সির রং কাছাকাছি হয়, তাহলে দর্শক, রেফারি ও খেলোয়াড়দের জন্য সমস্যা হয়। এজন্য অতিথি দলকে ভিন্ন রঙের জার্সি পরতে হয়।

অ্যাওয়ে জার্সির জন্ম কোনো ফ্যাশনের কারণে হয়নি। এটি এসেছে বাস্তব প্রয়োজন থেকে।

পর্তুগাল ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
পর্তুগাল ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাওয়ে জার্সি ডিজাইনারদের জন্য সৃজনশীলতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। হোম জার্সির তুলনায় এখানে রঙ, নকশা ও ধারণা নিয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

অনেক সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্মরণীয় জার্সিগুলো আসলে অ্যাওয়ে জার্সিই হয়।

অ্যাওয়ে জার্সি কি সবসময় সাদা হয়

না। এটি ফুটবল সমর্থকদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি।

অনেকে মনে করেন, অ্যাওয়ে জার্সি মানেই সাদা। বাস্তবে এমন কোনো নিয়ম নেই।

ফ্রান্স ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
ফ্রান্স ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

অ্যাওয়ে জার্সি হতে পারে—কালো, লাল, নীল, গোলাপি, সোনালি, বেগুনি অথবা যেকোনো রং। কেবল একটি শর্ত পূরণ করতে হবে, সেটি যেন প্রতিপক্ষ দলের জার্সির সঙ্গে কোনোভাবে মিলে না যায়।

উদাহরণ হিসেবে—রিয়াল মাদ্রিদ বহু বছর ধরে সাদা জার্সিতে নিজেদের মাঠে খেলেছে। ইংল্যান্ড অনেক সময় লাল অ্যাওয়ে জার্সি ব্যবহার করেছে। জার্মানি ইউরো ২০২৪-এ গোলাপি অ্যাওয়ে জার্সি পরেছিল। জাপানের গোলাপি অ্যাওয়ে জার্সি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজাইন।

অর্থাৎ সাদা রং কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়; আসল নিয়ম হলো মিল না থাকা।

জার্মানি ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
জার্মানি ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

অ্যাওয়ে জার্সির ইতিহাস

অ্যাওয়ে জার্সির ইতিহাস শুরু হয় ১৮৯০ সালে।

১৮৯০
ফুটবল লীগ প্রথম নিয়ম করে যে, প্রতিটি ক্লাব বা দেশকে তাদের প্রধান রঙ নিবন্ধন করতে হবে। দুই দল একই ধরনের জার্সি পরে খেলতে পারবে না।

১৯২১
নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হয়। বলা হয়, রঙ মিলে গেলে অতিথি দল জার্সি পরিবর্তন করবে, স্বাগতিক দল নয়।

১৯৬০-এর দশক
রঙিন টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ফলে সম্প্রচারকারীরা আরও স্পষ্টভাবে রঙের পার্থক্যের দাবি তোলেন।

১৯৯৩–৯৪
তৃতীয় জার্সি (থার্ড কিট) জনপ্রিয় হতে শুরু করে। কখনও কখনও হোম ও অ্যাওয়ে দুটিই মিলে গেলে তৃতীয় জার্সি ব্যবহার করা হয়।

স্পেন ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।
স্পেন ফুটবল দলের হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি।

২০১৩
ইতালির নাপোলি ক্লাব সৌভাগ্যের বিশ্বাস থেকে নিজেদের সাদা অ্যাওয়ে জার্সি ঘরের মাঠেও পরতে শুরু করে।

২০১৫–১৬
উয়েফা এক ম্যাচে দুই দলকেই অ্যাওয়ে জার্সি পরতে নির্দেশ দেয়, কারণ তাদের হোম জার্সি একে অপরের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।

এভাবেই একটি সাধারণ নিয়ম ধীরে ধীরে ফুটবল সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

শেষ কথা, ফুটবলে জার্সি কেবল খেলোয়াড়দের পোশাক নয়, এটি একটি দলের পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। হোম জার্সি একটি ক্লাব বা দেশের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে তুলে ধরে, আর অ্যাওয়ে জার্সি দুই দলের খেলোয়াড়দের আলাদাভাবে শনাক্ত করতে সহায়তা করে।